দিল্লিতে বিক্ষোভ
সিজেপির অভিজিৎ, মমতা, কেজরিওয়ালসহ হাজারেরও বেশি আটক
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩৬ পিএম
পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী-সহ একাধিক মমতাপন্থী তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্যদের আটক করে প্রিজন ভ্যানে ঘোরানোর অভিযোগ করা হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জী, দিল্লির অরবিন্দ কেজরিওয়াল, কেরালার পিনারাই বিজয়ন এবং ত্রিপুরার মানিক সরকার — শনিবারের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দিতে গিয়ে চারজন সাবেক মুখ্যমন্ত্রীকে সকাল থেকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ককরোচ জনতা পার্টি ও বামপন্থীদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে শনিবার সকাল থেকে অন্তত হাজার খানেক বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। বিক্ষোভে যোগ দিতে দিল্লিতে পৌঁছনো মাত্রই আটক করা হয়েছে ককরোচ জনতা পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বকে। আটক হয়েছেন বামপন্থী ছাত্র নেত্রী নেহা বোরাও।
বিকেল চারটার দিকে জানা যায়, মমতা ব্যানার্জীসহ তার দলীয় সতীর্থদের হরিয়ানার কাছে উত্তর দ্বারকা থানায় নিয়ে গেছে পুলিশ। এর কিছুক্ষণ আগে, বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ পুলিশের হাতে আটক হন দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল।
এদিকে গত রাত থেকে দিল্লির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত শিখ গুরুদোয়ারা বাংলা সাহিবে আশ্রয় নিয়েছিলেন যে কয়েক শো বিক্ষোভকারী, তারা যন্তর মন্তরের দিকে এগোতে গেলে সেখানে লাঠিচার্জ করা হয় বলে জানা যাচ্ছে।
এর আগে, সিজেপির শীর্ষ নেতা অভিজিৎ দীপকে, আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাসকে নাটকীয়ভাবে বিমান থেকেই আটক করেছে পুলিশ। পরিচিত ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে তার বাড়ি থেকেই আটক করে পুলিশ।
সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন আইনজীবীকেও আটক করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
একাধিক জায়গায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি শুরু হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
বিক্ষোভের ঘোষিত এলাকা হিসাবে যন্তর মন্তরকে একরকম দুর্গ বানিয়ে ফেলা হলেও দুপুরে হঠাৎই বামপন্থী ছাত্র-নেত্রী নেহা বোরা রাজধানীর কেন্দ্রস্থল থেকে দূরে দিল্লি হাট এলাকায় জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান। সেখানে জড়ো হওয়া নেতা-কর্মীদেরও আটক করা হয়েছে।
মমতা ব্যানার্জী-সহ আটক হওয়া মমতাপন্থী তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাদের পুলিশ হরিয়ানার কাছে উত্তর দ্বারকা থানায় নিয়ে গেছে বলে দলের দাবি।
দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এবং আম আদমি পার্টি নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে আটক করেছে পুলিশ। আটক করার সময় তিনি তার পার্টির সদস্যদের সঙ্গে যন্তর মন্তরের দিকে এগোচ্ছিলেন।
আরও পড়ুন: ‘পুলিশ যেখানে আটকাবে, সেখানেই হবে যন্তর মন্তর’
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এএনআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকের ঠাকুমা প্রয়াত হয়েছেন। দিল্লি পুলিশের সূত্রের মাধ্যমে সংবাদ সংস্থা এএনআই জানাচ্ছে, দিল্লি পুলিশ দীপকেকে তার ঠাকুমার মৃত্যুর খবর দিয়েছে, এবং তাকে জানাতে বলছে যে তিনি আটক অবস্থায় প্রতিবাদ চালিয়ে যাবেন না শেষকৃত্যে যোগ দিতে বাড়ি ফিরে যাবেন।
গুরদোয়ারা বাংলা সাহিব থেকে যন্তর মন্তরের দিকে মিছিল করে যাওয়ার সময় বিক্ষোভকারীদের আটক ও তাদের উপর লাঠিচার্জের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, শুক্রবার দিল্লিতে আসা অনেকেই গুরদোয়ারা বাংলা সাহিবে আশ্রয় নিয়েছিলেন। শনিবার সকালে সেখানে প্রায় ৬০০ জন বিক্ষোভকারী জড়ো হন, যাদের মধ্যে প্রায় ৩০০ জনকে আটক করা হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।
হায়দরাবাদের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অজয় জিঙ্গাদের অভিযোগ, সকাল থেকেই বিক্ষোভকারীরা যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলেও বিপুল সংখ্যক পুলিশ তাদের বাধা দেয়। তাদের উপর লাঠিচার্জ করা হয় এবং অনেককে বাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বলেও দাবি তার।
আটক হওয়া বাম ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা সামাজিক মাধ্যমে জানাচ্ছেন, "লোকজন এই মুহূর্তে সফদারজং ফ্লাইওভারের কাছে জমায়েত করছেন।"
বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলছেন, "যদি আপনাকে থামানো হয়, আপনি যেখানে আছেন সেখানে বসে পড়ুন এবং ওখানে আন্দোলন চালু রাখুন।"
ককরোচ জনতা পার্টির নেতা আজিঙ্ক্য শিন্ডেও সামাজিক মাধ্যমে একই বার্তা দিয়েছেন। "সকল দেশবাসীর কাছে আমার অনুরোধ, আপনারা যেখানেই আছেন, যেখানেই আপনাদের থামানো হচ্ছে, আপনারা সেখানেই নিজেদের যন্তর মন্তর তৈরী করে নিন।"
দুপুর সেয়া দুইটায় দিল্লিতে বাড়ির সামনে ধর্নায় বসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। মমতাপন্থী তৃণমূল কংগ্রেস দাবি করেছে তাকে পুলিশ আটক করে নিয়ে গেছে। পুলিশের গাড়িতে বসে থাকা মমতা ব্যানার্জীর একটি ছবিও তারা শেয়ার করেছে সামাজিক মাধ্যমে।
বাম ছাত্র নেত্রী নেহা বোরা, সিপিআইএমএল লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, সামাজিক কর্মকর্তা যোগেন্দ্র ইয়াদভ সহ একাধিক নেতা আটক। বিবিসি সংবাদদাতা দিলনাওয়াজ পাশা জানাচ্ছেন এদের সফদারজং ফ্লাইওভারের কাছে আটক করা হয়। অনেক জায়গায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি হয়।
দুপুর ১টায় সিজেপির এক্স একাউন্টে অভিজিৎ দীপকের একটি ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, "আপনারা এই ভিডিও দেখছেন মানে আমি, সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কা তিনজনেই গ্রেপ্তার হয়েছি। এবার এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন আজিঙ্ক্য শিন্ডে।"
সিপিআই(এম) সংসদ সদস্য জন ব্রিটাসের অভিযোগ, দিল্লি পুলিশ প্রায় এক ঘণ্টা ধরে শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরানোর পর তাদের ছত্রসাল স্টেডিয়ামে নিয়ে যায়। সেখানে ৩০-৪৫ মিনিট রাখার পর ফের তাদের জিপে তুলে অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তা তাদের জানানো হয়নি বলে অভিযোগ তার। পিনারাই বিজয়নের মতো একজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেই যদি এমন আচরণ করা হয়, তাহলে দেশের সাধারণ মানুষের কী পরিস্থিতি হবে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন ব্রিটাস।
আরও পড়ুন: দিল্লির আন্দোলনে তরুণদের মুখপাত্র নেহা বোরা আটক
বিবিসি সংবাদদাতা প্রত্যুষ রায় জানান, দিল্লির বিভিন্ন জায়গা থেকে সাংবাদিকদেরও একে একে আটক করেছে পুলিশ। জনপথ এলাকার রিগাল হোটেলের কাছে আন্দোলনকারীদের উপর লাঠিচার্জ করা হয়। বিক্ষোভকারীরা যন্তর মন্তরের কাছে বাংলা সাহিব গুরুদ্বারে আশ্রয় নেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে, ভারতে ককরোচ জনতা পার্টির একাধিক সদস্যের সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেওয়া হয়েছে বলে সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
বামপন্থী যুব ও ছাত্র সংগঠনগুলির অভিযোগ, সকালে তাদের একাধিক আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছে।
বিক্ষোভ শুরুর আগেই সিপিআই(এম)-এর একাধিক শীর্ষ নেতাকে আটক করা হয়েছে বলে দলের তরফে সামাজিক মাধ্যমে দাবি করা হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, কেরালার বিরোধী দলনেতা পিনারাই বিজয়ন, বৃন্দা কারাট, এম ভি গোবিন্দন এবং পি কে শ্রীমতী।
এর আগে সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে ইউটিউবার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ধ্রুব রাঠিকে গুরুগ্রামের বাড়ি থেকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল রাতে নিজের এক্স অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিও পোস্ট করে শনিবারের বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন তিনি।
নরেন্দ্র মোদী সরকারের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত ধ্রুব রাঠি চলতি সপ্তাহের গোড়াতেই জার্মানি থেকে ভারতে এসেছিলেন। বেঙ্গালুরুতে আটই অক্টোবর ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
সূত্র: বিবিসি।
