চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি মারা গেছেন
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি মারা গেছেন। দেশটির অর্থনীতিতে ব্যাপক সংস্কার এবং চীনকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই নেতার বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর।
সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানায়, বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে বেইজিংয়ে অসুস্থতাজনিত কারণে ঝু রংজির মৃত্যু হয়। তিনি স্ত্রী ও দুই সন্তান রেখে গেছেন।
১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চীনের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ঝু। ‘অর্থনৈতিক সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত এই নেতা বাজার উদারীকরণ ও বিশ্বায়নের পথে দেশকে এগিয়ে নিতে বড় ভূমিকা রাখেন। তার নেতৃত্বে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি ধীরে ধীরে আরও উন্মুক্ত ও বাজারবান্ধব কাঠামোয় রূপ নেয়।
ঝু রংজির মৃত্যু অনেক চীনার কাছে অর্থনৈতিক আশাবাদের একটি যুগের অবসান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তার সময়কার সংস্কারের ফলে চীনে দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে, দ্রুত সম্প্রসারিত হয় মধ্যবিত্ত শ্রেণি। পাশাপাশি দেশটির বিশাল বাজারে প্রবেশে বিদেশি কোম্পানিগুলোর আগ্রহও ব্যাপকভাবে বাড়ে।
আরও পড়ুন: চাকরি গেল বিপ্লব কুমার ও রুহানীসহ ৬ পুলিশ কর্মকর্তা
তবে কয়েক দশকের নজিরবিহীন প্রবৃদ্ধির পর বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা কমেছে। ঝু ছিলেন সেই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা, যারা তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা দেং শিয়াওপিংয়ের ‘সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ’ নীতি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশিত শোকবার্তায় পরিকল্পিত অর্থনীতি থেকে সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতিতে রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ঝুর অবদানের প্রশংসা করা হয়েছে। একই সঙ্গে জনগণের প্রতি তার গভীর মমতার কথাও উল্লেখ করা হয়।
শোকবার্তায় বলা হয়েছে, ঝু কর্মকর্তাদের সব সময় মনে করিয়ে দিতেন যে তারা জনগণের সেবক। সত্য কথা বলতে ভয় না পাওয়া, বিশেষ সুবিধা প্রত্যাখ্যান করা এবং জনগণের জন্য বাস্তব ও দৃশ্যমান ফল নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দিতেন।
১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে এক দশকেরও বেশি সময় চীনের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ঝু রংজি। প্রথমে উপপ্রধানমন্ত্রী এবং পরে প্রয়াত নেতা জিয়াং জেমিনের অধীনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। জিয়াং জেমিন ২০২২ সালের শেষ দিকে মারা যান।
দক্ষ ও দৃঢ়চেতা এই অর্থনীতিবিদ চীনের অর্থনীতিকে উদারীকরণের জন্য বেশ কিছু কঠিন সংস্কার বাস্তবায়ন করেন। এর মধ্যে রাজস্ব ও করব্যবস্থার বড় পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় খাতের অতিরিক্ত বিস্তার কমিয়ে আনার উদ্যোগ ছিল উল্লেখযোগ্য।
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যে প্রথমবার মৃত্যুদণ্ড বাতিল করল লেবানন
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঝু সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে আছেন ২০০১ সালে চীনকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যুক্ত করার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চীনের প্রবেশ আরও সহজ হয় এবং পরবর্তী সময়ে দেশটির দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি হয়।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, বাস্তববাদী নীতি ও আপসহীন নেতৃত্বের কারণে দলের ভেতরে ঝুর যেমন সমর্থক ছিলেন, তেমনি বিরোধীও ছিল। কঠোর নেতৃত্বের কারণে তিনি ‘লোহার মুষ্টির প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবেও পরিচিতি পান।
তার তীক্ষ্ণ বক্তব্য, রসবোধ এবং দ্রুত রেগে যাওয়ার স্বভাবও তাকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে। চীনা কর্মকর্তাদের প্রচলিত লিখিত ও পূর্বনির্ধারিত বক্তব্যের তুলনায় ঝুর বক্তব্য ছিল অনেক বেশি সরাসরি।
১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার সামনে মাইনফিল্ড থাকুক বা গভীর খাদ, আমি বিনা দ্বিধায় এগিয়ে যাব এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাব।’
চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় হুনান প্রদেশে জন্ম নেওয়া ঝু রংজি সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িৎ প্রকৌশলে পড়াশোনা করেন। পরে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা সংস্থায় কর্মজীবন শুরু করেন।
তার প্রজন্মের অনেকের মতো ঝুর কর্মজীবনও মাও সে তুংয়ের সময়কার রাজনৈতিক অস্থিরতায় বাধাগ্রস্ত হয়। ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে সরকারের অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করায় তাকে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়। প্রায় এক দশক পর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়ও তিনি রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হন।
মাও সে তুংয়ের মৃত্যুর পর ঝু রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হন এবং আবার কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান। এরপর বিভিন্ন অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালন করে ১৯৮৮ সালে সাংহাইয়ের মেয়র হন। সেখানে তার কর্মকাণ্ড দেং শিয়াওপিংয়ের নজরে আসে।
১৯৯১ সালে তাকে উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের অর্থনীতি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। সাত বছর পর তিনি প্রধানমন্ত্রী হন।
ঝুর নেতৃত্বে চীনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা, মুদ্রাব্যবস্থায় সংস্কার এবং ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের মধ্যেও অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: কলম্বিয়ায় ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২২৪
তবে ঝু রংজির আক্রমণাত্মক সংস্কারনীতি সব সময় জনপ্রিয় ছিল না। অদক্ষ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের ফলে বিপুলসংখ্যক কর্মী চাকরি হারান। ধারণা করা হয়, এর ফলে প্রায় ৪ কোটি মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছিলেন।
চীনকে ডব্লিউটিওতে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েও দেশটির কর্মকর্তাদের একাংশ তার সমালোচনা করেছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, এ ক্ষেত্রে ঝু অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছেন। কেউ কেউ তাকে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়ার অভিযোগও তুলেছিলেন।
শেষ পর্যন্ত ঝুর নীতিই সফল হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ডব্লিউটিওতে চীনের যোগদান বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে দেশটির একীভূত হওয়ার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য চীনের বাজার আরও উন্মুক্ত হয় এবং পরবর্তী সময়ে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথ তৈরি হয়।
ঝুর লেখা ও বক্তব্যের সংকলনের ভূমিকায় প্রয়াত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার তাকে ‘তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কিসিঞ্জারের মতে, ঝু আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে সরাসরি লড়াই করেছিলেন।
