হরমুজ প্রণালি কার নিয়ন্ত্রণে, ইরান নাকি যুক্তরাষ্ট্রের?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:২১ পিএম
ফাইল ছবি
বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এখন ইরানের ‘নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায়’ রয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশটির আধা সামরিক বাহিনী বাসিজের নবনিযুক্ত প্রধান হোসেইন তায়েব। বৃহস্পতিবার দেওয়া তাঁর এই বক্তব্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক দাবির সরাসরি বিরোধিতা করছে।
এর এক দিন আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, হরমুজ প্রণালির ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধকে ‘স্টিলের দেয়াল’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, প্রণালির নিয়ন্ত্রণে ইরানের কিছু করার নেই।
তবে তেহরান ট্রাম্পের এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজকে দেওয়া বক্তব্যে হোসেইন তায়েব বলেন, হরমুজ প্রণালি বর্তমানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ‘ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে। তাঁর দাবি, ইরান পূর্ণ নিরাপত্তার সঙ্গে নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
তায়েব আরও বলেন, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন করে যুদ্ধ বাধিয়ে এই অঞ্চলে ইরানের জনপ্রিয়তা নষ্ট করার চেষ্টা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের বিমান ও নৌ সক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: ইরানে হামলায় মোতায়েন মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হাজারো সেনা ‘খাদ্য সংকটে’
তেহরানের অনুমতি ছাড়া জাহাজ চলবে না
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরানের অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছে দেশটির যৌথ সামরিক কমান্ড ‘খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স’। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে তারা জানায়, তেহরানের অনুমতি ছাড়া কোনো নৌযান হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে না।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে মার্কিন পক্ষের ‘স্বাভাবিক নৌ চলাচল’ নিশ্চিত হওয়ার দাবিকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারিও যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের বক্তব্যকে ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি দাবির মধ্যেই জলপথটিতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার প্রণালি দিয়ে মাত্র নয়টি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে। আগস্টে দৈনিক গড় চলাচল যেখানে ছিল প্রায় ১২টি, সেখানে যুদ্ধের আগে এই সংখ্যা ছিল এর চেয়ে বহুগুণ বেশি।
যুদ্ধের পর থেকেই সংকট
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে চলমান সংঘাতের নতুন পর্যায় শুরু হয়। এর পরপরই তেহরান হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল কার্যত সীমিত করে দেয়। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় ধরনের সংকটের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
পরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে নৌ অবরোধ আরোপ করে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইরানমুখী বা ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অন্যান্য দেশের জাহাজের জন্য প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় ধরে এই নৌ অবরোধ বজায় রাখতে পারবে।
আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫ রিপার ধ্বংস, ক্ষতি ২২৫ কোটি ডলার
ভেস্তে গেছে অন্তর্বর্তী চুক্তি
এর আগে জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি হয়েছিল। এর আওতায় যুদ্ধবিরতি এবং পারস্য উপসাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চুক্তিটি ভেঙে পড়ে। উভয় পক্ষই একে অপরকে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করেছে।
চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর হরমুজ প্রণালিতে আবারও উত্তেজনা বাড়ে। ইরানের দাবি, অনুমতি ছাড়া চলাচলকারী জাহাজের বিরুদ্ধে তারা সীমিত আকারে ব্যবস্থা নিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ইরানের নৌ সক্ষমতা ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ক্ষমতা কমাতেই তারা দক্ষিণাঞ্চলে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে।
‘নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা’র প্রস্তাব
এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবার বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে হরমুজকে ঘিরে নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছেন।
ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল সমন্বয়ে সম্ভাব্য একটি চুক্তির ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ‘হরমুজ অর্থনৈতিক নিরাপত্তাব্যবস্থা’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এমন একটি নতুন আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব, যা ওয়াশিংটনের সামরিক নিশ্চয়তার ওপর নির্ভরশীল হবে না।
অন্যদিকে ইরানের জ্যেষ্ঠ সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তা রাসুল সানাই-রাদ বলেছেন, অন্তর্বর্তী চুক্তির আওতায় অপর পক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলবে না। ফার্স নিউজের প্রতিবেদনে তাঁকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে এই জলপথ আবার উন্মুক্ত করতে পারবে না।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই পাল্টাপাল্টি দাবি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন জলপথটিতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে এবং নতুন করে কয়েকটি জাহাজে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। ফলে হরমুজকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্য নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
