ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫ রিপার ধ্বংস, ক্ষতি ২২৫ কোটি ডলার
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৫০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৪৫টি এমকিউ-৯ ‘রিপার’ ড্রোন হারিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট সামরিক রিপার ড্রোনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার কাজে বহুল ব্যবহৃত হয় এমকিউ-৯ রিপার। মার্কিন বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, একটি রিপার ড্রোনে ব্যবহৃত সেন্সর ও অস্ত্রের ধরন অনুযায়ী এর মূল্য প্রায় ৩ কোটি থেকে ৫ কোটি ডলার। সেই হিসাবে ৪৫টি ড্রোন হারানোর আর্থিক ক্ষতি আনুমানিক ১৩৫ কোটি থেকে ২২৫ কোটি ডলার হতে পারে।
আরও পড়ুন: আগামী সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী কি ভারত সফরে যাচ্ছেন?
ইরানের সঙ্গে সংঘাতের সময় হরমুজ প্রণালির আশপাশে এসব ড্রোন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি বর্তমানে সংঘাতের অন্যতম উত্তপ্ত এলাকায় পরিণত হয়েছে।
তবে রিপার তুলনামূলক ধীরগতির এবং অনেক সময় নিচু উচ্চতায় উড্ডয়ন করে। এ কারণে ইরানের সামরিক বাহিনী এবং ইয়েমেন ও ইরাকে থাকা ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের কাছে এগুলো তুলনামূলক সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এর আগেও কয়েক মাসে ইরানি হামলায় একাধিক রিপার ধ্বংস হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য, হারানো সব রিপার ড্রোনই সরাসরি গুলি করে ভূপাতিত করা হয়নি। কয়েকটি ড্রোনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর সেগুলো বিধ্বস্ত হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পাশাপাশি ইউক্রেনকে দীর্ঘদিন ধরে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। দুই দিকের এই সামরিক ব্যয়ের ফলে দেশটির অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
ইরান যুদ্ধের প্রথম পর্যায়েই মার্কিন বাহিনী বিপুলসংখ্যক টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এতে দীর্ঘপাল্লার হামলার অস্ত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অলির নামে দুটি মনোনয়নপত্র, কারণ জানাল জামায়াত
মজুতের ওপর চাপ বাড়ায় আঞ্চলিক মার্কিন কমান্ডাররা সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করছেন। কোনো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের আশঙ্কা তুলনামূলক কম মনে হলে সেটি প্রতিহত না করে ভবিষ্যতের জন্য কিছু প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পেন্টাগন অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা দ্রুত অস্ত্রভান্ডার পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে প্রায় ১৮৫টি রিপার ড্রোন ছিল। এর মধ্যে বিমানবাহিনীর ১৬৫টি এবং মেরিন কোরের ২০টি। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যে রিপার ব্যবহার করে, এই হিসাবের মধ্যে সেগুলো ধরা হয়নি।
মেরিন কোরের কোনো রিপার এখনো হারায়নি বলে জানিয়েছেন বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল জোশুয়া বেনসন।
এর আগে গত মে মাসে বিমানবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডেভিড ট্যাবর সিনেটে জানিয়েছিলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা রিপার ড্রোনের সংখ্যা প্রায় ১৩৫টিতে নেমে এসেছিল। তিনি দ্রুত ড্রোন বহর পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছিলেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে জেনারেল অ্যাটমিকসের তৈরি রিপার ড্রোনের ব্যবহার কমানোর পরিকল্পনা করছে। এর পরিবর্তে তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল নতুন প্রজন্মের সশস্ত্র নজরদারি ড্রোন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এসব ড্রোন একসঙ্গে ‘ঝাঁক’ হিসেবে কাজ করে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম হবে।
আরও পড়ুন: দেশে গণিতচর্চা বাড়াতে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর
এর আগে ভারতের সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়াও জানিয়েছিল, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক ডজন রিপার ড্রোন ধ্বংস হয়েছে। এতে মার্কিন ড্রোন বহরের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
ইরান যুদ্ধের ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি ব্যবহৃত অস্ত্রের মজুত পূরণ করতে ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত অর্থ চেয়েছে। এর মধ্যে পেন্টাগনের জন্য ৬৭ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের আবেদন রয়েছে।
গত জুলাইয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সিনেটে জানিয়েছিলেন, সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ ইরান যুদ্ধের ব্যয় প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই হিসাবে সামরিক সদস্যদের বেতন ও অভিযান পরিচালনার ব্যয় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটিগুলো পুনর্নির্মাণের খরচ ধরা হয়নি।
হোয়াইট হাউস এরই মধ্যে কংগ্রেসের কাছে মোট ৮৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত তহবিল চেয়েছে। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬৭ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। এই অর্থের বড় একটি অংশ অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত পুনরায় পূরণে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
হেগসেথের মতে, দ্রুত অতিরিক্ত অর্থ না পেলে ইরান যুদ্ধের কারণে প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপর তৈরি বাড়তি চাপ সামলাতে সামরিক প্রশিক্ষণ কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
মার্কিন অস্ত্রভান্ডারের অন্যতম বড় উদ্বেগ এখন থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। মার্কিন সেনাবাহিনীর ২০২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে ৮৫৭টি থাড ইন্টারসেপ্টর কেনার জন্য অর্থ চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৮৩০টি বাধ্যতামূলক বা অতিরিক্ত তহবিলের আওতায় এবং ২৭টি নিয়মিত বরাদ্দ থেকে কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে থাডের ব্যাপক ব্যবহার এবং সীমিত উৎপাদনক্ষমতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উৎপাদনক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়ালে বিপুলসংখ্যক থাড ইন্টারসেপ্টরের মজুত পুনরায় পূরণ করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হতে পারে।
তবে মার্কিন সেনাবাহিনীর বাজেট নথিতে থাড উৎপাদন বাড়ানোর বড় পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চপ্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি ও পুনরায় মজুত করা কেবল অর্থের বিষয় নয়। এর সঙ্গে উৎপাদন সক্ষমতা, প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সরবরাহব্যবস্থার সমন্বয়ও জরুরি।
রিপার ড্রোনের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি, টমাহকসহ বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার এবং থাডের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত পুনর্গঠনের প্রয়োজন- সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করেছে।
ওয়াশিংটনের সামনে এখন শুধু চলমান যুদ্ধ পরিচালনার চ্যালেঞ্জই নয়; একই সঙ্গে ব্যবহৃত অস্ত্রের মজুত দ্রুত পূরণ এবং ভবিষ্যৎ সংঘাতের জন্য পর্যাপ্ত সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা।
সূত্র: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, টাইমস অব ইন্ডিয়া
