ফিলিস্তিনিদের বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৪ পিএম
কুসরা গ্রামে ইসরায়েলি সেনারা। ছবি: সংগৃহীত
অধিকৃত পশ্চিম তীরের কুসরা গ্রামে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে দিতে অভিযান চালানোর সময় প্রায় এক ডজন ফিলিস্তিনি পরিবারকে নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রোববার থেকে তিনটি ফিলিস্তিনি বাড়ি ঘিরে রেখেছিল ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। এ সময় তারা বাড়িগুলোর পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পরে তাদের সরিয়ে দিতে অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী।
কুসরার মেয়র আবদেল আজিম ওয়াদি বিবিসিকে বলেন, ইসরায়েলি বাহিনী গ্রামটিকে ‘বন্ধ সামরিক এলাকা’ ঘোষণা করেছে। খালি করে দেওয়া কয়েকটি ফিলিস্তিনি বাড়ি সেনারা সামরিক ব্যারাক হিসেবে ব্যবহার করছে বলেও জানান তিনি।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই অভিযান চালানো হয়েছে। দেশটির সরকারের মুখপাত্র ডেভিড মেনসার বসতি স্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ডকে ‘দুঃখজনক’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেছেন। ঘটনায় জড়িতদের তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনার কথাও বলেছেন তিনি।
আরও পড়ুন: বিভক্তির গভীর সংকটে মুসলিম ব্রাদারহুড
একের পর এক বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ
বসতি স্থাপনকারীদের অবরোধে থাকা আবু রিদি ও হাসান পরিবারের তিনটি বাড়ির মধ্যে দুটির বাসিন্দাদের বৃহস্পতিবার বাড়ি ছেড়ে যেতে বলা হয়। পরে তাঁরা তৃতীয় একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন বলে বিবিসিকে জানান।
এ ছাড়া গ্রামের আরও ১১টি বাড়ির বাসিন্দাকেও সেনাবাহিনী বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কুসরায় ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় এক ডজন যান দেখা যায়। এসব যানের মধ্যে একটি বুলডোজারও ছিল।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, কুসরা ও জালুদ এলাকার কাছে তারা দুটি ‘অবৈধ ফাঁড়ি’ সরিয়ে দিয়েছে। এ সময় একজন ইসরায়েলিকে আটক এবং কিছু সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে বলেও জানায় তারা।
বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ পাওয়া বাসিন্দাদের একজন কাহের ওদেহ। তাঁর ভাষ্য, বৃহস্পতিবার সকালে ২০ জনের বেশি ইসরায়েলি সেনা তাঁর বাড়িতে প্রবেশ করে। কিছুক্ষণ পর তারা চলে গেলেও আবার ফিরে এসে বাড়িটিকে সামরিক অবস্থান হিসেবে ঘোষণা করে তাঁকে ও তাঁর ভাইকে সরে যেতে বলে।
ওদেহ জানান, তাঁরা বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর ইসরায়েলি বাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। এ সময় অনেক বাসিন্দাকে নিজেদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।
বাড়ি তছনছ, অর্থ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ
প্রায় ১০ ঘণ্টা পর কয়েকটি পরিবারকে বাড়িতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে ফিরে তাঁরা দেখতে পান, ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র তছনছ করা হয়েছে।
এক বাসিন্দার অভিযোগ, সেনারা তাঁর ফ্রিজের খাবার বাইরে ফেলে দেয় এবং ঘর থেকে ১ হাজার ৫০০ ডলার নগদ নিয়ে যায়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বিবিসি আইডিএফের কাছে জানতে চাইলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি। তবে আইডিএফ জানিয়েছে, কুসরার বাসিন্দাদের নিজ নিজ বাড়িতে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
আরও পড়ুন: হরমুজ প্রণালি কার নিয়ন্ত্রণে, ইরান নাকি যুক্তরাষ্ট্রের?
আইডিএফ আরও বলেছে, বসতি স্থাপনকারীদের অবরোধের শিকার ফিলিস্তিনি বাড়িগুলোতে সেনারা অভিযান চালাবে না। তাদের দাবি, ইসরায়েলি ‘লিয়াজোঁ কর্মকর্তারা’ কুসরার স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনে বিঘ্ন কমানোর চেষ্টা করছেন।
তবে অবরুদ্ধ পরিবারের সদস্য আবু রিদি বিবিসিকে বলেন, বুধবার রাতেও তাঁদের বাড়িতে আবার হামলা হয়েছে। কয়েকজন বসতি স্থাপনকারী সেনাদের চোখ এড়িয়ে এখনও এলাকায় অবস্থান করছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
‘ভয়াবহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’
আবু রিদির ভাই ওই বাড়ির মালিক। তিনি একজন ফিলিস্তিনি-আমেরিকান ব্যবসায়ী এবং ঘটনাটি নিয়ে মার্কিন দূতাবাসে অভিযোগ করেছেন।
কুসরার পরিবারগুলোকে বসতি স্থাপনকারীদের ভয় দেখানোর ঘটনাকে ‘ভয়াবহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি।
রোববার ঘটনার শুরুতে বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর বাড়ির প্রবেশপথ আটকে দিয়ে পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ঘটনাস্থলে যাওয়া প্রথম দিকের কয়েকজন ইসরায়েলি সেনাকে বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে প্রার্থনা করতেও দেখা যায়।
পরে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, ওই ঘটনায় জড়িত সেনাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আবু রিদি ও হাসান পরিবারের সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছিলেন।
বুধবার বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয় ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী। এ সময় বড় একটি দল বসতি স্থাপনকারীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাস ও শব্দবোমা ব্যবহার করে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ বলে বিবেচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব বসতির সম্প্রসারণের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার ঘটনাও বেড়েছে।
