ফারাক্কা নিয়ে বিহারের আপত্তিতে প্রশ্নের মুখে গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩০ এএম
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে চলতি বছরের ১২ ডিসেম্বর। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন করে চুক্তি নবায়ন বা সংশোধনের আলোচনা সামনে আসতেই ভারতের বিহারে ফারাক্কা ব্যারাজ ও পানিবণ্টন নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বিহারের ক্ষমতাসীন জনতা দল-ইউনাইটেডের (জেডিইউ) জাতীয় কার্যকরী সভাপতি ও রাজ্যসভার সদস্য সঞ্জয় কুমার ঝা বিদ্যমান কাঠামোয় গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের বিরোধিতা করেছেন। তার দাবি, ১৯৯৬ সালে চুক্তি করার সময় বিহারের স্বার্থ যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। গত ৩০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিহারের পানি, কৃষি, সেচ ও বন্যা ব্যবস্থাপনার ওপর চুক্তির প্রভাব মূল্যায়নেরও দাবি জানিয়েছেন তিনি।
বিহারের অভিযোগ কী?
বিহারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভিযোগ, ফারাক্কা ব্যারাজ ও গঙ্গার পানি ব্যবস্থাপনার কারণে রাজ্যটি একদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকটে পড়ে, অন্যদিকে বর্ষায় বন্যা ও নদীতে পলি জমার সমস্যায় ভোগে। গঙ্গার পানি পানীয় জল, কৃষি, সেচ ও শিল্পের জন্য বিহারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় নতুন চুক্তিতে রাজ্যের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পানির চাহিদা বিবেচনার দাবি উঠেছে।
আরও পড়ুন: ৪৮তম বিশেষ বিসিএসে ১৮৪ জনের নিয়োগ
সঞ্জয় ঝার দাবি, ১৯৯৬ সালের পরিস্থিতির ভিত্তিতে ২০২৬ সালের পানির প্রয়োজন নির্ধারণ করা বাস্তবসম্মত নয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষি ও শিল্পের সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গঙ্গা অববাহিকায় পানির চাহিদার ধরনও বদলেছে। তাই নতুন চুক্তির আগে গঙ্গা অববাহিকার সংশ্লিষ্ট সব রাজ্যের পানির প্রয়োজন বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা উচিত।
ফারাক্কায় কীভাবে পানি ভাগ হয়?
১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ফারাক্কায় গঙ্গার প্রবাহের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানি ভাগ করা হয়। প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে দুই দেশ সমান ভাগে পানি পায়। প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে হলে বাংলাদেশ ৩৫ হাজার কিউসেক পায় এবং অবশিষ্ট পানি ভারত পায়। আর প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেক বা তার বেশি হলে ভারত ৪০ হাজার কিউসেক পায় এবং বাকি পানি বাংলাদেশে যায়।
চুক্তিতে ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত বিশেষ ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এ সময় নির্দিষ্ট ১০ দিনের পালাক্রমে দুই দেশকে ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। বাংলাদেশের জন্য শুষ্ক মৌসুমে এই পানি কৃষি, মৎস্য, নৌ চলাচল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বন্যা ও পলি নিয়েও আপত্তি
বিহারের আপত্তি শুধু শুষ্ক মৌসুমের পানির হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজ্যটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি অংশের দাবি, ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে গঙ্গায় পলি জমার সমস্যা বেড়েছে। এর ফলে নদীর পানি ধারণক্ষমতা কমে বর্ষায় বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।

জেডিইউ নেতা সঞ্জয় ঝাও ফারাক্কা ও গঙ্গা ব্যবস্থাপনার কারণে বিহারে পলি জমা, বন্যা এবং পানির সংকটের বিষয়টি সামনে এনেছেন। তিনি নতুন ব্যবস্থায় বিহারের সেচ, কৃষি, পানীয় জল, শিল্প ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
বিহারের উদ্বেগ আমলে নিচ্ছে দিল্লি
বিহারের এই দাবির মধ্যে বিষয়টি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছেও গুরুত্ব পাচ্ছে। গত ২০ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী, উপমুখ্যমন্ত্রী ও পানি সম্পদমন্ত্রী বিজয় কুমার চৌধুরী এবং জেডিইউ নেতা সঞ্জয় ঝা।
বৈঠকের পর বিজয় কুমার চৌধুরী জানান, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের আলোচনায় ফারাক্কা ও বিহারের দীর্ঘদিনের উদ্বেগগুলো উত্থাপনের বিষয়ে কেন্দ্র ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গঙ্গার নিম্ন অববাহিকায় অবস্থিত বাংলাদেশ শুষ্ক মৌসুমে এই নদীর পানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। গঙ্গার প্রবাহ কমে গেলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌ চলাচল ও পরিবেশে এর প্রভাব পড়ে।

তাই ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজ্য বিহারের পানি চাহিদা ও ফারাক্কা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে। ফলে চুক্তির নবায়ন শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যু।
৩০ বছরের পুরোনো হিসাব নিয়ে প্রশ্ন
১৯৯৬ সালের চুক্তি তৈরির সময় ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত গঙ্গার প্রবাহসংক্রান্ত তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। এরপর জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা ও বন্যার প্রবণতা এবং জনসংখ্যা ও কৃষির পানির চাহিদায় পরিবর্তন এসেছে। ফলে পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতে বর্তমান ও ভবিষ্যতের পানি বণ্টন নির্ধারণ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ভারতের একটি সংসদীয় কমিটির নথিতেও নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে হালনাগাদ জলবিদ্যাগত তথ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর সঙ্গে পরামর্শের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।
নতুন চুক্তিতে কী চাইছে বিহার?
বিহারের দাবিগুলো মূলত তিনটি বিষয়ে কেন্দ্রীভূত- পানির ন্যায্য হিস্যা, বন্যা ও পলি ব্যবস্থাপনা এবং গঙ্গার পানির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার।
রাজ্যটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব চায়, নতুন কোনো চুক্তি করার আগে গঙ্গা অববাহিকার ভারতীয় রাজ্যগুলোর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পানির চাহিদা নির্ধারণ করা হোক। পাশাপাশি ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে পলি জমা, নদীভাঙন, বন্যা ও নৌ চলাচলের ওপর প্রভাবও নতুন করে মূল্যায়ন করা হোক।
দিল্লির সামনে বড় সমীকরণ
গঙ্গা চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে ভারতকে একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক, বিহারের পানি চাহিদা এবং গঙ্গা অববাহিকার অন্যান্য রাজ্যের স্বার্থ বিবেচনা করতে হবে। ফলে ২০২৬ সালের চুক্তি নবায়ন কেবল পানি ভাগাভাগির হিসাবের বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হবে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নদী ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক কূটনীতি।
অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো- নতুন কোনো কাঠামো হলে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানির পূর্বানুমানযোগ্য ও ন্যায্য প্রবাহ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।
ফলে ১২ ডিসেম্বর চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ঢাকা ও দিল্লির আলোচনায় বিহারের নতুন দাবিগুলো কতটা প্রভাব ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালের কাঠামোই নবায়ন হয়, নাকি নতুন কোনো পানি বণ্টন ব্যবস্থা তৈরি হয়- এখন সেদিকেই নজর দুই দেশের।
তথ্যসূত্র: নিউজ১৮, ভারতীয় ও সরকারি সূত্র।
