×

আন্তর্জাতিক

ড্রোন হামলার পর গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইন বন্ধ করলো সৌদি আরব

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৯ পিএম

ড্রোন হামলার পর গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইন বন্ধ করলো সৌদি আরব

সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন (পেট্রোলাইন) যে পথ ধরে গেছে, স্যাটেলাইট ছবিতে তার কাছাকাছি মদিনার দক্ষিণ-পূর্বের মরুভূমি থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার মধ্যেই ইরাক থেকে চালানো ড্রোন হামলার পর গুরুত্বপূর্ণ একটি তেল পাইপলাইন বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব। হামলার পর ইরাকের একটি সামরিক কমান্ডারকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং ঘটনাটি তদন্তে কমিটি গঠন করেছে দেশটির সরকার।

ইরাক সরকার স্বীকার করেছে, সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে চালানো ড্রোন হামলাটি ইরানের সীমান্তবর্তী মাইসান প্রদেশ থেকে পরিচালিত হয়েছিল। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর ওই প্রদেশের অপারেশনস কমান্ডারকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

সৌদি আরব জানিয়েছে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তারা পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে। হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং স্থাপনাটিতে কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ মাত্রা এখনও নিরূপণ করা হচ্ছে।

রয়টার্স জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশ্লেষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি আরবের প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের আনুমানিক ৪ থেকে ৫ শতাংশ পরিবহন করে। গুরুত্বপূর্ণ এই পাইপলাইন সৌদি আরবকে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগর হয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ দেয়। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় এর কৌশলগত গুরুত্ব অনেক।

ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া গেছে যে সৌদি তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলাটি ইরানের সীমান্তবর্তী মাইসান প্রদেশ থেকে পরিচালিত হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রদেশটির অপারেশনস কমান্ডারকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এর আগে সৌদি আরব একাধিকবার ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে দেশটির তেল স্থাপনায় হামলার অভিযোগ তুলেছিল। এমনকি সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানও চালিয়েছে।

সর্বশেষ হামলার পরও তাৎক্ষণিক পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রিয়াদ। ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপের পর সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করে পরিচালিত হামলা প্রতিরোধে বাগদাদের প্রচেষ্টাকে তারা সমর্থন করবে।

তবে একই সঙ্গে সৌদি আরব সতর্ক করে বলেছে, নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষিত রাখা এবং নাগরিক ও বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।


নিন্দা জিসিসির

সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি)। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, ওমান, কাতার ও কুয়েত নিয়ে গঠিত এই জোট হামলাটিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে।

জিসিসির মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আলবুদাইউই বলেন, হামলাটি সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর জন্য বিপজ্জনক উত্তেজনা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক আইনের নীতিমালারও লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রগতি

সৌদি তেল পাইপলাইনে হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। চলতি সপ্তাহে দেশটির লোহিত সাগর উপকূলের বিশাল অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে তারা।

আরও পড়ুন: ২২ বছর ধরে রেখে দেওয়া ভ্রূণ থেকে সন্তানের জন্ম!

হুথিরা বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ারও দাবি করেছে। লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের প্রবেশপথ হওয়ায় এই প্রণালি বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হুথিরা জানিয়েছে, সৌদি জাহাজ ছাড়া অন্যান্য কোম্পানির জাহাজের জন্য এই সমুদ্রপথ নিরাপদ থাকবে। তবে তাদের এই দাবির পরই ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী পাল্টা অভিযান শুরু করেছে।

শুক্রবার সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র মাজিদ আল-নুজাইলি জানান, লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত কৌশলগত মোকা শহর ও এর আশপাশে হুথিদের অবস্থানে হামলা চালানো হয়েছে। এতে বেশ কয়েকটি যানবাহন ও অস্ত্র ধ্বংস এবং কয়েকজন হুথি যোদ্ধা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

বাব আল-মান্দাব প্রণালি থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত মোকা শহরটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বৃহস্পতিবার হুথিরা শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সেখান থেকে বহু মানুষ পালিয়ে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর এডেনে আশ্রয় নিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল ও সরকার এডেনেই অবস্থান করছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, সরকারি বাহিনী লোহিত সাগর উপকূলীয় তাইজ গভর্নরেট এবং এর কাছের ইব্ব গভর্নরেটে হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলাও চালিয়েছে।


এক সপ্তাহে বাস্তুচ্যুত ৭৬ হাজার

ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত বাড়ায় মানবিক পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতি হচ্ছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, জুলাই থেকে দেশটিতে অন্তত ৭৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহেই বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় চারগুণ বেড়েছে।

জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, ইয়েমেনে প্রতি ঘণ্টায় পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে এবং দ্রুত একটি বড় ধরনের বাস্তুচ্যুতি সংকট তৈরি হচ্ছে।

সংস্থাটি জানায়, অনেক পরিবার রাতের অন্ধকারে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছে। তাদের সামনে নিরাপদ আশ্রয়ের পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। দীর্ঘদিনের সংঘাতে সম্পদ হারিয়ে অনেক মানুষ কার্যত নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।

তেলের বাজারে বড় ধাক্কার আশঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের বিস্তার এবং তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে বাড়তে থাকা ঝুঁকি ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। আরব উপদ্বীপের দুই প্রান্তে একসঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় অপরিশোধিত তেলের দাম গত জুলাইয়ের পর প্রথমবারের মতো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।

জ্বালানির দাম বাড়ায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারগুলোর ঋণ নেওয়ার ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।

এনার্জি অ্যাসপেক্টসের বিশ্লেষক রিচার্ড ব্রোঞ্জ বিবিসিকে বলেন, সাম্প্রতিক উত্তেজনা শুরুর আগেই সৌদি তেল সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগরে এবং পরে আফ্রিকা ঘুরিয়ে পরিবহন করতে গিয়ে জাহাজ চলাচলের সময় প্রায় ৩০ দিন বেড়ে গিয়েছিল। এতে তেল পরিবহনের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তার মতে, তেলের বাজারকে এতদিন সংকট সামাল দিতে সাহায্য করা মজুত ও অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ ইতোমধ্যে ব্যবহার হয়ে গেছে। ফলে সৌদি তেল সরবরাহে বিঘ্ন এবং ইয়েমেনে সমুদ্রপথে অস্থিরতা—দুই সংকট একই সঙ্গে চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।

আরও পড়ুন: ব্রিকসের যৌথ ঘোষণায় ‘সব ধরনের আগ্রাসনের’ নিন্দা

সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হতে পারে ডিজেলের বাজারে। ইতোমধ্যে ডিজেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। উৎপাদন ও পণ্য পরিবহনে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার থাকায় এর দাম বাড়লে খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রিচার্ড ব্রোঞ্জের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। এমনকি সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে দাম এর চেয়েও বেশি হতে পারে।

ফলে ইরাক থেকে সৌদি তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা, ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রগতি এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে বাড়তে থাকা নিরাপত্তাঝুঁকি—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি ও অর্থনীতির জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।

সূত্র: বিবিসি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

কুমিল্লায় যুবলীগ নেতাকে পিটিয়ে হত্যা

কুমিল্লায় যুবলীগ নেতাকে পিটিয়ে হত্যা

মেসির গোলেও জয়বঞ্চিত মায়ামি, পয়েন্ট খোয়াল শেষ মুহূর্তে

মেসির গোলেও জয়বঞ্চিত মায়ামি, পয়েন্ট খোয়াল শেষ মুহূর্তে

পে স্কেলে কী চলছে?

পে স্কেলে কী চলছে?

কারা দেশপ্রেমিক, মীর জাফর, জানালেন ওসমান হাদির বোন

কারা দেশপ্রেমিক, মীর জাফর, জানালেন ওসমান হাদির বোন

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App