কেন নোবেলজয়ীদের ছবি এভাবে আঁকা হয়? নেপথ্যে যে কারণ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মৌসুম এলেই বিজয়ীদের নামের পাশাপাশি একটি বিশেষ ধরনের ছবি চোখে পড়ে। কালো রেখায় আঁকা মুখ, সঙ্গে সোনালি আভা নোবেলজয়ীদের এই প্রতিকৃতি এখন পুরস্কার ঘোষণার অন্যতম পরিচিত ভিজ্যুয়াল পরিচয়।
ডিজিটাল যুগে যেখানে কয়েক সেকেন্ডেই বিশ্বের যেকোনো ব্যক্তির অসংখ্য ছবি পাওয়া সম্ভব, সেখানে নোবেলজয়ীদের জন্য কেন হাতে আঁকা এই বিশেষ পোর্ট্রেট ব্যবহার করা হয়? এর পেছনে রয়েছে একদিকে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন, অন্যদিকে শিল্পভাবনা ও ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড পরিচয়।
ছবির সংকট থেকেই শুরু
নোবেলজয়ীদের বিশেষ এই পোর্ট্রেট তৈরির গল্প শুরু হয় একটি বাস্তব সমস্যা থেকে। ২০১২ সালে শিল্পী নিকলাস এলমেহেড নোবেল মিডিয়ার সঙ্গে কাজ শুরু করার পর লক্ষ্য করেন, পুরস্কার ঘোষণার সময় অনেক বিজয়ীরই এমন মানসম্মত ছবি সহজে পাওয়া যায় না, যা দ্রুত সংবাদমাধ্যমে ব্যবহার করা যায়।
নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। বিজয়ীর নাম প্রকাশের পর তার ছবি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আবার ইন্টারনেট থেকে পাওয়া ছোট, অস্পষ্ট বা নিম্নমানের ছবি দিয়েও এমন গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাকে উপস্থাপন করা কঠিন।
এই সমস্যার দ্রুত সমাধান হিসেবেই এলমেহেড হাতে আঁকা প্রতিকৃতি তৈরি শুরু করেন।
সাধারণ ছবির বদলে হাতে আঁকা পোর্ট্রেট কেন?
শুরুতে এটি ছিল প্রয়োজন মেটানোর একটি কার্যকর উপায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই তাৎক্ষণিক সমাধানই নোবেল পুরস্কারের অন্যতম পরিচিত ভিজ্যুয়াল বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।
বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী, চিকিৎসাবিজ্ঞানী, সাহিত্যিক কিংবা অন্য কোনো ক্ষেত্রের গবেষক—সবার প্রতিকৃতি একই ধরনের শিল্পভাষায় তৈরি করা হয়। এতে একদিকে ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য ফুটে ওঠে, অন্যদিকে সব ছবির মধ্যে তৈরি হয় একটি ধারাবাহিকতা।
২০১২ সালে নোবেল মিডিয়ায় আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ শুরু করার পর এলমেহেড কালো মার্কার ব্যবহার করে দ্রুত প্রতিকৃতি আঁকতেন। ২০১২ ও ২০১৩ সালের এসব ছবি সংবাদমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর নোবেল কর্তৃপক্ষ তাকে এ কাজের জন্য একটি নির্দিষ্ট ভিজ্যুয়াল স্টাইল তৈরি করতে বলে।
কালো রেখার বিশেষত্ব
এই পোর্ট্রেটগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য গাঢ় কালো রেখা। অতিরিক্ত রং বা জটিল শেডিংয়ের পরিবর্তে মুখের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো স্পষ্ট রেখার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়।
এর ফলে ছবিগুলো সহজেই নজর কাড়ে। সংবাদ ওয়েবসাইটের ছোট থাম্বনেল থেকে শুরু করে সংবাদপত্রের পাতাতেও এগুলো স্পষ্ট দেখা যায়। একই সঙ্গে একটি স্বতন্ত্র ভিজ্যুয়াল পরিচয় তৈরি হওয়ায় নোবেল পুরস্কারের খবর অন্য সাধারণ ছবির ভিড় থেকেও আলাদা হয়ে ওঠে।
কীভাবে এলো সোনালি আভা?
বর্তমানে নোবেলজয়ীদের প্রতিকৃতির সঙ্গে যে সোনালি আভা দেখা যায়, তা শুরু থেকেই ছিল না। ২০১৭ সালে নোবেল ফাউন্ডেশন তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্র্যান্ড পরিচয়ে পরিবর্তন আনে। নোবেল মেডেলের ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সোনালি রংকে গুরুত্বপূর্ণ ভিজ্যুয়াল উপাদান হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
এর পর ২০১৮ সাল থেকে এলমেহেড তার পোর্ট্রেটে আসল গোল্ড ফয়েল ব্যবহার শুরু করেন। কালো রেখার সঙ্গে ধাতব সোনার পাতের সংযোজন ছবিগুলোকে আরও স্বতন্ত্র করে তোলে। ফলে দূর থেকেই বোঝা যায়, এটি সাধারণ কোনো প্রতিকৃতি নয়; এর সঙ্গে নোবেল পুরস্কারের পরিচয় জড়িয়ে রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও হাতে তৈরি
বর্তমান ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে অনেকের মনে হতে পারে, বিশেষ কোনো সফটওয়্যার ব্যবহার করেই হয়তো এসব ছবি তৈরি করা হয়। কিন্তু এই পোর্ট্রেটগুলোর অন্যতম আকর্ষণই হলো এগুলোর হাতে আঁকা বৈশিষ্ট্য।
কালো অ্যাক্রিলিক রং ও মার্কার ব্যবহার করে প্রতিকৃতির রেখাগুলো তৈরি করা হয়। এরপর বিশেষ আঠার মাধ্যমে বসানো হয় ধাতব সোনার পাত। অর্থাৎ ডিজিটাল দুনিয়ায় দাঁড়িয়েও নোবেলজয়ীদের পরিচিত এই ছবিগুলোতে হাতে তৈরি শিল্পকর্মের স্বতন্ত্র ছাপ রয়ে গেছে।
একসময় দ্রুত বিজয়ীদের ছবি সংগ্রহের সমস্যা সমাধানের জন্য যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেটিই নোবেল পুরস্কারের নিজস্ব ভিজ্যুয়াল ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। তাই প্রতি বছর নোবেলজয়ীদের নাম ঘোষণার সঙ্গে কালো রেখা ও সোনালি পাতের সেই পোর্ট্রেটও সামনে আসে। এখন এটি বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ঘোষণার পরিচিত প্রতীক।
