জামায়াতের ছায়া মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পেলেন যারা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০১:৪৮ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সরকারকে নজরদারি, বিকল্প নীতিপ্রস্তাব তৈরি এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব প্রস্তুতের লক্ষ্যে অনেকটা গোপনে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠন করেছে। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী করে গঠিত এই কাঠামোয় দলের শীর্ষ নেতা, সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতাদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম প্রকাশ করার কথা জানিয়েছে জামায়াত।
রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে সোমবার সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন।
তিনি বলেন, এরই মধ্যে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে এবং সদস্যদের প্রশিক্ষণ চলছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এর সদস্যদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, দলের নির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত মাসে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে। এতে দলের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি সংসদ সদস্য নন—এমন অনেক সিনিয়র নেতাকেও যুক্ত করা হয়েছে।
কোন মন্ত্রণালয়ে কে
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ছায়া মন্ত্রিসভায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন।
এ ছাড়া সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন জামায়াতের নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন।
আর আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।
এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ রাশেদুল ইসলাম।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি সালাহউদ্দিন আইয়ুবী।
কেন এই ছায়া মন্ত্রিসভা
জামায়াতের দাবি, সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ, সরকারি সিদ্ধান্তের বিকল্প নীতিপ্রস্তাব তৈরি এবং সংসদে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে।
দলটির কয়েকজন শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গত মাসে গোপনে এই কাঠামো তৈরি করা হয়। ইতোমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, বাজেট এবং সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার কাজ করেছেন ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যরা।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রাম ডুবলে হাঁটু পানিতে শুটিংয়ের নাটক আর দেখতে চাই না
এর আগে জোটগতভাবে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের চিন্তা থাকলেও শেষ পর্যন্ত দলীয়ভাবেই এই কাঠামো তৈরি করেছে জামায়াত। এতে দলের শীর্ষ নেতা ও সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সাবেক ছাত্রশিবির নেতাদেরও যুক্ত করা হয়েছে।
সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে একজন করে ছায়া মন্ত্রী থাকবেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ভিত্তিক একটি টিমও কাজ করবে। প্রয়োজনে উপমন্ত্রী পর্যায়েও দায়িত্ব বণ্টন করা হতে পারে বলে জানিয়েছে দলটি।
তিনটি লক্ষ্য সামনে রেখে কার্যক্রম
জামায়াতের নেতারা বলছেন, ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের মূল লক্ষ্য তিনটি। এগুলো হলো—সরকারের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা, সরকারের ভুল বা দুর্বলতা চিহ্নিত করে বিকল্প পথ দেখানো এবং ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ নেতৃত্ব ও সম্ভাব্য মন্ত্রী তৈরি করা।
অর্থাৎ, শুধু সরকারের বিরোধিতা নয়; সরকার পরিচালনার বিকল্প প্রস্তুতি নেওয়াও এই কাঠামোর অন্যতম উদ্দেশ্য।
ছায়া মন্ত্রিসভার কার্যক্রম ব্যাখ্যা করে জামায়াতের শীর্ষ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, গঠনমূলক গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা রয়েছে এমন দেশগুলোতে বিরোধী দল সরকারের মন্ত্রিসভার পাশাপাশি একটি সমান্তরাল বা ছায়া মন্ত্রিপরিষদ গঠন করে। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, গঠনমূলক সমালোচনা এবং প্রয়োজনীয় বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে ছায়া মন্ত্রিসভা
ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. স ম আলী রেজার মতে, সংসদীয় গণতন্ত্রে ছায়া মন্ত্রিসভা নতুন কোনো ধারণা নয়। শক্তিশালী রাজনৈতিক ও নাগরিক সংস্কৃতির দেশগুলোতে এটি প্রতিষ্ঠিত চর্চা।
তার মতে, ছায়া মন্ত্রিসভা সরকারের ওপর একধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে বিরোধী দলকে গঠনমূলক সমালোচনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দেয়।
সরকার বাজেট বা বড় কোনো নীতিগত প্রস্তাব দিলে সংশ্লিষ্ট ছায়া মন্ত্রীরাও বিকল্প বাজেট বা নীতিপ্রস্তাব জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেন। এতে সরকার ও বিরোধী দলের নীতির মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা তৈরির সুযোগ থাকে।
জামায়াতের এই ছায়া মন্ত্রিসভা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের পর এর পূর্ণাঙ্গ কাঠামো ও দায়িত্ব বণ্টন আরও স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
