স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে ইসিকে জামায়াতের ৯ দাবি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৩ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও সর্বজনগ্রাহ্য করার দাবিতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে ৯ দফা প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে দলটি।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ পুরো নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সচিবালয় ও নির্বাচন পরিচালনা-সংক্রান্ত প্রতিনিধিদল। বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন দাবি ও উদ্বেগ তুলে ধরা হয়।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে তাদের মধ্যে কিছু প্রশ্ন ও সংশয় তৈরি হয়েছে।
গোলাম পরওয়ারের দাবি, বৈঠকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের অসহায়ত্বের চিত্রও সামনে এসেছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কোনো বিশেষ দলীয় সরকারের চাপের মুখে কমিশন কাজ করছে কি না। যদিও জনগণের প্রত্যাশা ও নাগরিক সমাজের মতামত বিবেচনায় নিয়ে কমিশন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দাবি
জামায়াতের অন্যতম দাবি হলো, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা-সংক্রান্ত নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত বাতিল করা।
দলটির দাবি, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকরা জাতীয় ও স্থানীয় উভয় ধরনের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছেন। সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও শিক্ষকরা প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছেন।
জামায়াতের মতে, শুধু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ বৈষম্যমূলক। এ ধরনের সিদ্ধান্ত সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে বর্ণিত সমতা ও বৈষম্যহীনতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলেও দাবি করেছে দলটি।
নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতাদের অযোগ্য ঘোষণার দাবি
বৈঠকে জামায়াত দাবি করেছে, যেসব রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম সরকার নিষিদ্ধ করেছে, সেসব দলের পদ-পদবিধারী নেতাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
তবে কোনো দলের সাধারণ সমর্থক হওয়ার কারণে কাউকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার দাবি করেনি দলটি। তাদের মতে, নির্বাচনি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জনআস্থা বজায় রাখতে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান প্রয়োজন।
ইসি সচিবালয়ে নিয়োগ নিয়ে আপত্তি
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে সম্প্রতি অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পাওয়া শামসুল আলমের নিয়োগ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে জামায়াত।
গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, ওই কর্মকর্তা সরাসরি বিএনপির নির্বাচনবিষয়ক সাব-কমিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একটি সাংবিধানিক ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা ব্যক্তির নিয়োগ নির্বাচনি নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে বলে দাবি করেন তিনি।
জামায়াতের পক্ষ থেকে এ ধরনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা নিয়োগ বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে।
প্রশাসকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ বন্ধের দাবি
উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রশাসক নিয়োগ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে জামায়াত।
দলটির অভিযোগ, এসব পদে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হলে সরকারি অর্থ, উন্নয়ন বরাদ্দ ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে নির্বাচনে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ কারণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকারী প্রশাসকদের সংশ্লিষ্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ স্থায়ীভাবে বাতিল করার দাবি জানিয়েছে দলটি। একই সঙ্গে তফসিল ঘোষণার পর পদত্যাগ করলেও তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
কঠোর আচরণবিধির দাবি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ব্যক্তিদের প্রচারণায় অংশগ্রহণ ঠেকাতে কঠোর আচরণবিধি প্রণয়নের দাবিও জানিয়েছে জামায়াত।
দলটির মতে, ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নির্বাচনি প্রচারণায় অংশগ্রহণ প্রার্থীদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। তাই আচরণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী দেবে না জামায়াত
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করবে না বলেও জানিয়েছেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত না হওয়ায় দলের আগ্রহী ব্যক্তিরা নিজ নিজ এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।
এ সময় ১১ দলীয় রাজনৈতিক ঐক্যের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ওই জোট জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়েছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে এ জোটের কোনো বাধ্যবাধকতা বা সমঝোতা প্রযোজ্য হবে না।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা, প্রশাসনিক নিয়োগ, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও আচরণবিধি নিয়ে জামায়াতের উত্থাপিত ৯ দফা দাবি এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এসব দাবির বিষয়ে নির্বাচন কমিশন কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের।
