কণ্ঠশিল্পী সালমার বাবা ফজলুল হকের মৃত্যু, দাফন সম্পন্ন
এস আর সেলিম, দৌলতপুর (কুষ্টিয়া)
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০২ পিএম
বাবা ফজলুল হকের সঙ্গে সালমা। ছবি : ভোরের কাগজ
এনটিভির ক্লোজআপ ওয়ান সংগীত প্রতিযোগিতা থেকে উঠে আসা জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মৌসুমী আক্তার সালমার বাবা ফজলুল হক (৫৮) মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি হার্ট অপারেশনের পর মোটামুটি সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। সবকিছুই চলছিল স্বাভাবিক। কিন্তু একদিন আগে দ্বিতীয় দফায় অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরলেও অনেকটা আকস্মিকভাবেই তাকে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হলো।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ঢাকায় মেয়ে সালমার বাসায় ফজলুল হক মারা যান। রাতেই সালমা নিজের ফেসবুকের মাধ্যমে বাবার মৃত্যুর খবর জানান। চার শব্দের সংক্ষিপ্ত ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, 'আমার আব্বা আর নেই।' সালমাদের বাড়ি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের তারাগুনিয়া গঙ্গারামপুর গ্রামে। ফজলুল হকের মৃত্যুতে সালমার সহকর্মী, পরিবার, স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, এর আগে ফজলুল হকের হার্টে কয়েকটি ব্লক ধরা পড়ায় অপারেশন করা হয়। অপারেশনের পর মোটামুটি সুস্থ হয়ে অনেকটা স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিলেন তিনি। গত ১ সেপ্টেম্বর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে ঢাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছিলেন ফজলুল হক। চিকিৎসা শেষে রাজধানীর মতিঝিলে মেয়ে সালমার বাসায় ছিলেন। আগেরদিন (মঙ্গলবার) তিনি আবারও অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেওয়া হয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর আশঙ্কামুক্ত দেখে চিকিৎসকরা তাকে বাসায় নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে বাসায় ফেরার পরদিনই (বুধবার) সন্ধ্যায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় গঙ্গারামপুর গোরস্থান মাঠে ফজলুল হকের জানাজা শেষে সেখানে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে বুধবার দিবাগত রাত ২টার দিকে ঢাকা থেকে তার মরদেহ গ্রামের বাড়ি গঙ্গারামপুরে পৌঁছায়। এ সময় স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। তিনি স্ত্রী, দুই কন্যা, এক ছেলে ও সালমার দুই পক্ষের দুই নাতনি রেখে গেছেন।
স্থানীয়রা জানান, অনেক কষ্টের পর বহু মানুষের দোয়া ও ভালোবাসায় মেয়ে সংগীতশিল্পী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ফজলুল হক পরিবারের সবাইকে নিয়ে বেশ সুখে, শান্তিতে ছিলেন। তবে পরপর দুইবার মেয়ে সালমার সংসার ভেঙে যাওয়ায় মানসিক কষ্টে ভুগছিলেন তিনি। ফজলুল হক একজন ভালো মনের মানুষ ছিলেন। পরিচিত কাউকে দেখা মাত্রই তিনি আগে সালাম দিয়ে কথা শুরু করতেন। কম কথা বললেও সবার সঙ্গে হাসি মুখে কথা বলতেন।
২০০৬ সালে এনটিভির সংগীত প্রতিভা অন্বেষণের অনুষ্ঠান 'ক্লোজআপ ওয়ান- তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ' এর প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে তারকাখ্যাতি অর্জন করেন মৌসুমী আক্তার সালমা। ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওয়ার জন্য ফজলুল হকের নতুন পোশাক ছিল না। তারাগুনিয়ার ধনাঢ্য সাংবাদিক খন্দকার আবুল কালাম আজাদ তাকে পাঞ্জাবি ও তার স্ত্রীর জন্য শাড়ি কিনে দিয়েছিলেন। সালমা রাতারাতি তারকাশিল্পী হয়ে ওঠার পর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাদের। মেয়ে সালমা সংগীততারকা হয়ে ওঠার আগে ফজলুল হক কৃষিকাজ করতেন, কখনো কখনো পান বিক্রি করেও জীবিকা নির্বাহ করতেন। পরে তাকে আর কোনো কাজকর্ম করতে হয়নি। সময় কাটাতে ফজলুল হক তারাগুনিয়া শাহী মসজিদ বাজারে তার ছোট ভাইয়ের জামাতার তৈরি পোশাকের ব্যবসা দেখাশোনা করতেন।
জানা যায়, জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী সালমার সংগীতজীবনের শুরুর সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে বাবা ফজলুল হকের নাম। ছোটবেলা থেকেই বাবার কাছ থেকে লোকগানের পরিবেশ পেয়েছেন সালমা। ফজলুল হক নিজেও লালনগানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং স্থানীয় বিভিন্ন গানের আসরে অংশ নিতেন। বাবার সঙ্গে এসব আসরে যাওয়ার সুযোগ থেকেই শৈশবে লালনগীতি ও পল্লীগীতির প্রতি সালমার আগ্রহ তৈরি হয়।
বাবার কণ্ঠে লালনের গান শুনতে শুনতেই গানের প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেয় সালমার। পরবর্তী সময়ে সেই ভালোবাসাই তাকে দেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পীদের একজন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে। ফলে সালমার সংগীতজীবনের পেছনে তার বাবা ফজলুল হকের অবদান ও অনুপ্রেরণার কথা বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। এছাড়া দৌলতপুর উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির তখনকার গানের শিক্ষক বাউলশিল্পী ওস্তাদ শফি মণ্ডলের কাছ থেকেও দীক্ষা নিয়েছেন সালমা।
ক্লোজআপ ওয়ান প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার মাধ্যমে দেশজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি পান সালমা। প্রতিযোগিতার সময় তার গাওয়া ‘ও মোর বানিয়া বন্ধুরে একটা তাবিজ বানাইয়া দে’ গানটি শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এরপর অন্যান্য মৌলিক গানের পাশাপাশি মূলত লালনের গানকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ দুই দশকের সংগীতজীবনে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন সালমা। আধুনিক গান গেয়েও মঞ্চ মাতান তিনি। তার এই পথচলার একেবারে শুরুর দিনগুলোর অনুপ্রেরণার উৎস ছিলেন বাবা ফজলুল হক। তার আকস্মিক মৃত্যুতে সালমা শুধু বাবাকে নয়, হারালেন সংগীতজীবন শুরুর দিকের অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণাদাতাকেও।
এদিকে কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহম্মেদ বাচ্চু মোল্লা ত্রাণ দিতে পদ্মার ওপারে চিলমারী ইউনিয়নে যাওয়ায় নিজ গ্রামের বাসিন্দা ফজলুল হকের জানাজায় অংশ নিতে না পারলেও তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন।
