সাবেক ২ সেনা কর্মকর্তার রিমান্ড আবেদনে যা বলা হয়েছে
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৬ এএম
ছবি : সংগৃহীত
সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের পর তাদের বিরুদ্ধে করা রিমান্ড আবেদনে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক কনটেন্ট প্রচার এবং সরকারকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
গ্রেপ্তার দুই কর্মকর্তা হলেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেবাশীষ কুমার বড়ুয়া (৪৭) এবং লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরা (৪৩)। রোববার দিবাগত রাত ১২টা থেকে সোমবার রাত ৩টা পর্যন্ত পরিচালিত বিশেষ অভিযানে রাজধানীর পল্লবী ও বনানী ডিওএইচএস এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।
সোমবার শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক দিদারুল আলম তাদের চার দিনের জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।
রিমান্ড আবেদনে যেসব অভিযোগ
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও তাদের সহযোগীরা নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা, তহবিল সংগ্রহ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারের সঙ্গে জড়িত। বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ফেসবুক পেজ ব্যবহার করে সরকারবিরোধী প্রচার চালিয়ে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে আরও অভিযোগ করা হয়, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারা সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। এসব যোগাযোগের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগও আনা হয়েছে।
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর পর্যন্ত তারা সহযোগীদের নিয়ে সরকার ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং কুৎসামূলক প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
মামলার অন্য আসামিদের শনাক্ত ও তাদের অবস্থান নির্ণয়, ডিজিটাল আলামত উদ্ধার, আসামিদের পরিচালিত বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজের তথ্য সংগ্রহ এবং ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য তাদের সাত দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়।
রিমান্ড বাতিল চেয়ে আসামিপক্ষের যুক্তি
শুনানিতে দেবাশীষ কুমার বড়ুয়ার পক্ষে আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মনসুর রিপন রিমান্ড বাতিল ও জামিনের আবেদন করেন। তিনি বলেন, তার মক্কেলের বিরুদ্ধে দেশে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি বা দেশ ধ্বংসের মতো কোনো বক্তব্য নেই। দেশকে অস্থিতিশীল করতে তিনি কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। এ যুক্তিতে রিমান্ড বাতিল করে জামিন দেওয়ার আবেদন জানান আইনজীবী।
অন্যদিকে কাজী গুলশান আরার পক্ষে আইনজীবী মশিউর রহমান রিমান্ড বাতিল ও জামিন চেয়ে বলেন, তার মক্কেলের বিরুদ্ধে সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ আনা হয়েছে। সেনাবাহিনীতে চাকরি করার কারণে সাবেক সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা স্বাভাবিক। একইভাবে ফেসবুক পেজ খোলা বা কনটেন্ট তৈরি করাও অপরাধ নয় বলে যুক্তি দেন তিনি।
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য
রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর হারুন-অর-রশীদ রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, দুই আসামি সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যেও তারা যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
এ ছাড়া দেশি-বিদেশি গুপ্তচরদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ তথ্য তাদের কাছে পাচারের অভিযোগ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। তার দাবি, আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে রাষ্ট্রদ্রোহিতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট দেশি-বিদেশি গুপ্তচরদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হতে পারে। এ কারণে তিনি সর্বোচ্চ মেয়াদে রিমান্ড মঞ্জুরের আবেদন জানান।
ডিবির নজরদারিতে ছিলেন দুই কর্মকর্তা
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন জানান, সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা ডিবির নজরদারিতে ছিলেন।
প্রাথমিক তদন্তের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন কনটেন্ট তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করে আসছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সাইবার অপরাধের মাধ্যমে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পর তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান ডিএমপির এই কর্মকর্তা। তবে রিমান্ড আবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তদন্তাধীন; আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এগুলো অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।
