জুমার নামাজ পড়লে কত বছরের গুনাহ মাফ হয়
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৮ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
জুমার নামাজ মুসলমানদের জন্য সপ্তাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। প্রতি শুক্রবার মসজিদে সমবেত হয়ে নামাজ আদায় ও খুতবা শোনার মাধ্যমে মুমিনরা আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ পান।
জুমার নামাজের ফজিলত নিয়ে সমাজে নানা ধরনের কথা প্রচলিত রয়েছে কেউ বলেন এক জুমা থেকে আরেক জুমা পর্যন্ত গুনাহ মাফ হয়, আবার কোথাও ৪০, ৮০ বা ৯০ বছরের গুনাহ মাফের কথাও শোনা যায়। কিন্তু এসব দাবির কোনটি সহিহ হাদিসসম্মত?
তবে ‘জুমার নামাজ পড়লে ঠিক কত বছরের গুনাহ মাফ হয়’ এ প্রশ্নের উত্তর হিসেবে নির্দিষ্ট বছর বা সংখ্যার কথা সহিহ হাদিসে নেই।
বিশেষ করে ‘জুমার নামাজ পড়লে কত বছরের গুনাহ মাফ হয়’এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর কী? ইসলামী শরিয়তের নির্ভরযোগ্য দলিলের আলোকে বিষয়টি জেনে নেওয়া জরুরি।
দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মাফ
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা এবং এক রমজান থেকে পরবর্তী রমজান মাঝখানের গুনাহের জন্য কাফফারা হয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা হয়।
অর্থাৎ, একজন মুসলমান নিয়মিত নামাজ আদায় করেন, জুমার নামাজ যথাযথভাবে পালন করেন এবং বড় গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করেন তাহলে আল্লাহর রহমতে দুই জুমার মধ্যবর্তী ছোটখাটো গুনাহ মাফ হতে পারে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন হাদিসে ‘এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা’ বলা হয়েছে। এটিকে নিজের ইচ্ছামতো নির্দিষ্ট ‘কত বছরের গুনাহ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।
জুমার দিন উত্তমভাবে প্রস্তুতির গুরুত্ব
জুমার নামাজের ফজিলত শুধু নামাজ আদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জুমার দিনের জন্য পরিচ্ছন্ন হওয়া, গোসল করা, ভালো পোশাক পরা, সুগন্ধি ব্যবহার করা এবং আগে মসজিদে যাওয়ার ব্যাপারেও হাদিসে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
সহিহ বুখারিতে জুমার দিনের গোসল, যথাসম্ভব পরিচ্ছন্নতা, সুগন্ধি ব্যবহার এবং মসজিদে আগে যাওয়ার ফজিলত সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
আরও পড়ুন: পবিত্র জুমার নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত
এ ছাড়া মসজিদে গিয়ে খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনাও জুমার গুরুত্বপূর্ণ আদব। খুতবার সময় অপ্রয়োজনীয় কথা বলা, অন্যকে বিরক্ত করা বা মনোযোগ নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
১০ দিনের গুনাহ মাফের কথা কোথা থেকে এসেছে?
জুমার দিনের আমল নিয়ে প্রচলিত কিছু আলোচনায় বলা হয়, ভালোভাবে অজু করে জুমার নামাজ আদায় এবং খুতবা মনোযোগ দিয়ে শুনলে ‘১০ দিনের গুনাহ’ মাফ হয়। এই হিসাবটি একটি হাদিসের ব্যাখ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি উত্তমভাবে অজু করে জুমার নামাজে আসে, মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনে ও নীরব থাকে, তার এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত এবং অতিরিক্ত তিন দিনের গুনাহ ক্ষমা করা হয়।
অর্থাৎ, এখানে দুই জুমার মধ্যবর্তী সাত দিন এবং অতিরিক্ত তিন দিন মোট ১০ দিনের কথা বোঝানো হয়। তবে এখানেও শর্ত রয়েছে কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা।
৮০ বছরের গুনাহ মাফের আমল কি সহিহ?
জুমার দিন আসরের নামাজের পর ৮০ বার একটি নির্দিষ্ট দরুদ পড়লে ৮০ বছরের গুনাহ মাফ হয়—এমন একটি কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রচলিত।
প্রচলিত বর্ণনায় যে দরুদটি উল্লেখ করা হয় তা হলো, ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন্নিন নাবিয়্যিল উম্মিয়্যি ওয়া আলা আলিহি ওয়া সাল্লিম।’
বর্ণনাটি অনুযায়ী, জুমার দিন আসরের নামাজের পর স্থান পরিবর্তন না করে ৮০ বার এই দরুদ পড়ার কথা বলা হয় এবং এর বিনিময়ে ৮০ বছরের গুনাহ মাফের দাবি করা হয়।
আরও পড়ুন: আখেরি চাহার শোম্বা কী, কেন পালন করা হয়?
কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই নির্দিষ্ট ফজিলতের বর্ণনাটি সহিহ হাদিস হিসেবে নির্ভরযোগ্য নয়। ইসলামি গবেষকদের অনেকে এর সনদকে দুর্বল বা অত্যন্ত দুর্বল হিসেবে উল্লেখ করেছেন; কেউ কেউ এটিকে মওজু বা জাল বর্ণনা হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন।
তাই ‘শুক্রবার ৮০ বার দরুদ পড়লে ৮০ বছরের গুনাহ মাফ’ এ কথাকে সহিহ হাদিসের নিশ্চিত ফজিলত হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।
তাহলে কি জুমার দিন দরুদ পড়া যাবে?
অবশ্যই দরুদ শরিফ পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। জুমার দিন ও রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠের ব্যাপারে হাদিসে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা যেমন ৮০ বার পড়লে নির্দিষ্টভাবে ৮০ বছরের গুনাহ মাফ হবে, এমন দাবি করার জন্য সহিহ দলিল প্রয়োজন।
অর্থাৎ, কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জুমার দিনে বেশি বেশি দরুদ পড়তে পারেন। কিন্তু ৮০ বার পড়ার সঙ্গে ৮০ বছরের গুনাহ মাফের নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি যুক্ত করা ঠিক হবে না।
৪০ বা ৯০ বছরের গুনাহ মাফের কোনো আমল আছে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘৪০ বছরের গুনাহ মাফের দোয়া’, ‘৯০ বছরের গুনাহ মাফের আমল’ কিংবা ‘আশি বছরের গুনাহ মাফের দোয়া’ এ ধরনের নানা পোস্ট দেখা যায়। কিন্তু কোনো আমলের ফজিলত হিসেবে নির্দিষ্ট সংখ্যক বছরের গুনাহ মাফের দাবি করা হলে তার উৎস ও হাদিসের মান যাচাই করা জরুরি।
শুধু ফেসবুক পোস্ট, ইউটিউব ভিডিও বা কোনো অনির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইটে লেখা আছে বলেই সেটিকে হাদিস হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। বিশেষ করে ইবাদতের ফজিলত ও গুনাহ মাফের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সহিহ দলিলের ওপর নির্ভর করাই নিরাপদ।
বড় গুনাহ কি শুধু জুমার নামাজে মাফ হয়ে যায়?
এখানেও সতর্ক থাকা জরুরি। দুই জুমার মধ্যবর্তী ছোট গুনাহ মাফের যে সুসংবাদ হাদিসে এসেছে, তার সঙ্গে কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার শর্ত উল্লেখ রয়েছে।
আরও পড়ুন: ঈদে মিলাদুন্নবীর তারিখ জানাল ইসলামিক ফাউন্ডেশন
বড় গুনাহের ক্ষেত্রে শুধু নিয়মিত জুমার নামাজ আদায় করলেই সব দায় শেষ হয়ে যায় এমন ধারণা সঠিক নয়। কবিরা গুনাহ হয়ে গেলে আন্তরিক তওবা করতে হবে, গুনাহ পরিত্যাগ করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। কারও অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা যথাসম্ভব ফিরিয়ে দেওয়া বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাওয়াও জরুরি।
জুমার দিনের আমল কী হওয়া উচিত?
জুমার দিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল গুলো হলো: ১. যথাসময়ে গোসল ও পরিচ্ছন্নতা সম্পন্ন করা। ২. পরিষ্কার ও ভালো পোশাক পরা। ৩. সুগন্ধি ব্যবহার করা। ৪. আগে মসজিদে পৌঁছানোর চেষ্টা করা। ৫.মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা। ৬. জুমার নামাজ আদায় করা। ৭. বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা। ৮. দোয়া ও ইস্তিগফার করা। ৯. কোরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য নেক আমল করা। ১০. কবিরা গুনাহ থেকে নিজেকে দূরে রাখা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জুমার নামাজকে শুধু ‘গুনাহ মাফের হিসাব’ হিসেবে না দেখে আল্লাহর আনুগত্য ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা।
‘জুমার নামাজ পড়লে কত বছরের গুনাহ মাফ হয়’ এর সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, সহিহ হাদিসে নির্দিষ্ট কোনো বছরের সংখ্যা উল্লেখ নেই। বরং এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমার মধ্যবর্তী ছোট গুনাহ মাফ হওয়ার সুসংবাদ রয়েছে এবং অন্য একটি সহিহ বর্ণনায় খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনাসহ উত্তমভাবে জুমার নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তিন দিনের কথা এসেছে।
অন্যদিকে, জুমার দিন আসরের পর ৮০ বার নির্দিষ্ট দরুদ পড়লে ৮০ বছরের গুনাহ মাফ এই বর্ণনাটি সহিহ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই ৪০, ৮০ বা ৯০ বছরের গুনাহ মাফের নির্দিষ্ট আমল প্রচারের আগে অবশ্যই নির্ভরযোগ্য হাদিসের সূত্র যাচাই করা উচিত।
জুমার প্রকৃত শিক্ষা হলো: নামাজ, তওবা, ইস্তিগফার, দরুদ, খুতবা শ্রবণ এবং নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহিহ জ্ঞান অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
