×

ময়মনসিংহ

গারো পাহাড়

সংরক্ষিত বনভূমিতে ৩ হাজার ঘরবাড়ি, সরকারি হিসাবেই ২ হাজার একর বেহাত

Icon

খোরশেদ আলম, শেরপুর

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১৮ পিএম

সংরক্ষিত বনভূমিতে ৩ হাজার ঘরবাড়ি, সরকারি হিসাবেই ২ হাজার একর বেহাত

ছবি: ভোরের কাগজ

শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ে সংরক্ষিত বনভূমি দখলের প্রতিযোগিতা চলছে। বন বিভাগের কার্যকর নজরদারির অভাবে বছরের পর বছর ধরে বনজমি দখল করে গড়ে উঠছে বসতি, রাবার বাগান ও কৃষিজমি। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্র ভুয়া মালিক সাজিয়ে জাল কাগজপত্র তৈরি করে বন বিভাগের জমি নিজেদের দখলে নিচ্ছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গারো পাহাড় এলাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রায় ২১ হাজার একর জমির মধ্যে প্রায় ২ হাজার একর বর্তমানে বেদখলে রয়েছে। এসব জমিতে গড়ে উঠেছে প্রায় ৩ হাজার ঘরবাড়ি। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় বনভূমি দখল করে কৃষিকাজ ও বাগান করা হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে বেদখল হওয়া বনভূমির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি।

আরও পড়ুন: জামায়াতের তুলনায় আওয়ামী লীগের অপরাধ লঘুই বলা যায়: রাশেদ খান

চিঠি চালাচালিতেই সীমাবদ্ধ উদ্ধার কার্যক্রম

স্থানীয় বাসিন্দা ও বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় প্রতিবছর বন বিভাগ জবরদখল হওয়া জমির তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠায়। কিন্তু তালিকা তৈরি ও চিঠি চালাচালির বাইরে বেদখল বনভূমি উদ্ধারে দৃশ্যমান কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায় না।

ছবি: ভোরের কাগজ

ফলে একের পর এক বনজমি দখল হয়ে যাচ্ছে। দখল করা জমিতে স্থায়ী বসতি গড়ে ওঠায় পরবর্তীতে উচ্ছেদ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন জমি আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে।

একসময় ছিল ঘন শাল-গজারির বন

একসময় গারো পাহাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় শাল, গজারি, অর্জুন, বহেড়া, হরীতকীসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির গাছের ঘন বন ছিল। বনাঞ্চলে অবাধ বিচরণ করত নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও পাখি। গাছপালা ও লতাগুল্ম ছিল বন্যপ্রাণীর অন্যতম প্রধান খাদ্যের উৎস।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নির্বিচারে গাছ কাটার পাশাপাশি বনভূমি দখল ও বসতি স্থাপনের কারণে সেই চিত্র বদলে গেছে। কমেছে গাছপালা, সংকুচিত হয়েছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। হারিয়ে যাচ্ছে অনেক দেশীয় বৃক্ষ ও পশুপাখির প্রজাতি।

জাল কাগজপত্রে দখলের অভিযোগ

স্থানীয়দের অভিযোগ, বনাঞ্চলের ভেতরে থাকা কিছু জমি অতীতে ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ডভুক্ত ছিল। এসব জমির কোনো কোনো মালিক বহু বছর আগে ভারতে চলে গেছেন। আবার অনেক মালিক মারা গেছেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র ভুয়া মালিক তৈরি করে জাল কাগজপত্র প্রস্তুত করছে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব কাগজপত্র ব্যবহার করে প্রথমে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি দাবি করা হলেও পরবর্তী সময়ে বন বিভাগের জমিও দখল করা হচ্ছে। দখল করা জমিতে কোথাও রাবার বাগান, কোথাও কৃষিজমি, আবার কোথাও স্থায়ী বসতি গড়ে উঠেছে।

স্থানীয়রা বলছেন, বনভূমির ভেতরে এভাবে নতুন নতুন বসতি গড়ে ওঠায় ধীরে ধীরে বনাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও প্রতিবেশব্যবস্থা নষ্ট হচ্ছে।

বন্যহাতির আবাসস্থল সংকুচিত গারো পাহাড়ে বনভূমি সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও খাদ্যের উৎসও কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে বন্যহাতির বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ায় লোকালয়ে হাতির চলে আসার প্রবণতা বাড়ছে বলে স্থানীয়দের অভিমত।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বন ধ্বংস ও দখলের কারণে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত ক্রমেই বাড়ছে। বনভূমি অক্ষুণ্ন রাখা না গেলে ভবিষ্যতে এই সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

এক বছরে উদ্ধার ১৫০ একর বনজমি

শ্রীবরদী উপজেলার বালিজুরি ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সুমন মিয়া এবং ঝিনাইগাতী উপজেলার রাংটিয়া ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল করিম বলেন, গত এক বছরে দুই রেঞ্জে প্রায় ১৫০ একর বনজমি উদ্ধার করে সেখানে বাগান সৃজন করা হয়েছে। তারা বলেন, বনজমি উদ্ধারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সদিচ্ছার অভাব। তবে বনজমি উদ্ধারে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং শিগগিরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ডিজিটাল জরিপ ও সীমানা নির্ধারণের দাবি

পরিবেশসচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, গারো পাহাড়ের বন শুধু শেরপুরের সম্পদ নয়; এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। তাই বনভূমি রক্ষায় অবৈধ দখল দ্রুত শনাক্ত করে উচ্ছেদ, বনজমির সীমানা নির্ধারণ এবং নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে জাল কাগজপত্র তৈরির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয়দের দাবি, বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন জমির পূর্ণাঙ্গ জরিপ করে ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি ও সীমানা চিহ্নিত করা গেলে দখলদারদের দৌরাত্ম্য অনেকটাই কমানো সম্ভব। পাশাপাশি বনভূমিতে নতুন করে বসতি স্থাপন বন্ধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

গারো পাহাড়ের বন রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আগামী দিনে বনভূমির পরিমাণ আরও কমে যাওয়ার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, কাজি মো নুরুল করিমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। 

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

‘খুন’ নিয়ে গান পোস্ট, দুই ঘণ্টার মধ্যেই গায়ককে গুলি করে হত্যা

‘খুন’ নিয়ে গান পোস্ট, দুই ঘণ্টার মধ্যেই গায়ককে গুলি করে হত্যা

গাবখান নদীর তীব্র ভাঙন, হুমকিতে অর্ধশত পরিবার ও মসজিদ

গাবখান নদীর তীব্র ভাঙন, হুমকিতে অর্ধশত পরিবার ও মসজিদ

সংরক্ষিত বনভূমিতে ৩ হাজার ঘরবাড়ি, সরকারি হিসাবেই ২ হাজার একর বেহাত

গারো পাহাড় সংরক্ষিত বনভূমিতে ৩ হাজার ঘরবাড়ি, সরকারি হিসাবেই ২ হাজার একর বেহাত

সরকারি দপ্তরের সামনে কর্মকর্তার ব্যক্তিগত চেম্বার, অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ

সরকারি দপ্তরের সামনে কর্মকর্তার ব্যক্তিগত চেম্বার, অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App