ভোট দিতে না গেলে আক্রান্ত হওয়ার ভয় আওয়ামী লীগের তৃণমূলে
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:১০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন কারাগারে মারা যান গত শনিবার সকালে। এই খবর জানার পর ঠাকুরগাঁওয়ে তাঁর বাসায় ছুটে যান জেলার সদর আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কিছুক্ষণ পরই রমেশ চন্দ্র সেনের বাসভবনে সমবেদনা জানাতে দেখা যায় জামায়াতের প্রার্থী দেলোয়ার হোসেনকেও।
আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে বিএনপি ও জামায়াত দুই দলের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর উপস্থিতি রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে দুই দলই আওয়ামী লীগের ভোটারদের টার্গেট করছে।
শুধু ঠাকুরগাঁও নয়, সারাদেশেই বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা আওয়ামী লীগের ভোট টানার চেষ্টা করছেন। যদিও আওয়ামী লীগ নির্বাচনে ভোট বর্জনের কথা বলছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটাররা নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না, আর অংশ নিলে তাঁদের সমর্থন কোন দিকে যাবে। আওয়ামী লীগের ভোটাররা ভোট দিতে গেলে ভোটার উপস্থিতি বাড়তে পারে, আবার না গেলে ভোটের হার কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আওয়ামী লীগের ভোট কত হতে পারে
বর্তমানে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং দলটির নেতারা ছত্রভঙ্গ অবস্থায় আছেন। তবে দলটির বড় সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে বলে দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হয়। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং শীর্ষ নেতৃত্ব দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর সেই সমর্থন কতটা অবশিষ্ট আছে তা স্পষ্ট নয়।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, নির্বাচন কমিশনের হিসাবে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ ভোট ছিল ১৯৭৩ সালে ৭৩ শতাংশ। এরপর ১৯৭৯ সালে তা নেমে আসে ২৪ শতাংশে, যা দলটির সর্বনিম্ন। পরে ১৯৮৬ সালে ২৬ শতাংশ, ১৯৯১ সালে ৩০ শতাংশ, ১৯৯৬ সালে ৩৭ শতাংশ, ২০০১ সালে ৪০ শতাংশ এবং ২০০৮ সালে ৪৮ শতাংশ ভোট পায় আওয়ামী লীগ।
আরো পড়ুন : সবাইকে জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার আহ্বান সিইসির
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের ভোট ২০ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন বলেন, আওয়ামী লীগের জনসমর্থন কমেছে নাকি বেড়েছে তা নিয়ে নানা জরিপ হয়েছে। কিন্তু এই সংখ্যাটা জরিপের উপর নির্ভর করছে না। আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হতো। তাদের ভোট ৩০ শতাংশও হলে এই ভোটারদের নির্বাচনের বাইরে রাখা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে না।
ভোট বর্জনের আহ্বান ও ভোটারদের প্রতিক্রিয়া
নির্বাচনের বাইরে থাকা আওয়ামী লীগ সামাজিক মাধ্যমে ভোট বর্জনের প্রচারণা চালাচ্ছে। দলীয় পেইজ ও সমর্থকদের আইডিতে “নো বোট, নো ভোট”—এমন বার্তা দেওয়া হচ্ছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় তিন দিন আগে এক ফেসবুক পোস্টে নির্বাচনকে “সাজানো নির্বাচন” উল্লেখ করে ভোট বর্জনের আহ্বান জানান।
তবে মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতা-সমর্থকদের মধ্যে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ঢাকার বাইরে একটি জেলার উপজেলা কমিটির সদস্য আহসান হাবিব (ছদ্মনাম) বলেন,
“আমি তো ভোট দিতে যাবোই না। আমার পরিবারের কেউই যাবে না। নেত্রীর নির্দেশ আছে। আমরা ভোট দিতে না গেলে ভোটের হার কম হবে, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না।”
অন্যদিকে দলটির কিছু সাধারণ সমর্থক ভোট দিতে যাওয়ার কথাও বলছেন। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভোটার বলেন, “আমরা যদি ভোট দিতে না যাই, তাহলে আক্রান্ত হওয়ার ভয় আছে। আমাদের চিহ্নিত করে রাখা হতে পারে। ভয় থেকেই ভোট দিতে যেতে হবে।”
আরেকজন উপজেলা পর্যায়ের নেতা বলেন, আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে কি না তা নিয়ে সংশয় এবং ব্যবসা-বাণিজ্য বা এলাকায় টিকে থাকার প্রয়োজনেও অনেক সমর্থক অন্য দলে ভিড়তে পারেন। বিভিন্ন দল থেকেও ভোট দিতে যাওয়ার চাপ রয়েছে বলে তিনি জানান।
‘গেইম চেঞ্জার’ হতে পারে আওয়ামী লীগের ভোট
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট তিনটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ—
আওয়ামী লীগের ভোটারদের অংশগ্রহণ ভোটার উপস্থিতির হারকে প্রভাবিত করবে
তাদের ভোট নির্দিষ্ট কোনো দলের দিকে গেলে ফলাফলে বড় প্রভাব পড়তে পারে
আওয়ামী ভোটাররা অংশ না নিয়েও যদি ভোটের হার বেশি হয়, তা দলটির জন্য নতুন রাজনৈতিক বিপর্যয় হতে পারে
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সাব্বির আহমেদ বলেন, “আওয়ামী লীগের প্রায় ৩০ শতাংশ ভোট থাকলে তার বড় অংশ ভোট দিতে যাবে না। পাঁচ থেকে ১০ শতাংশ যেতে পারে। তবে এই ভোট যদি কোনো নির্দিষ্ট দলের দিকে যায়, তাহলে সেটি সেই দলের বিজয় নিশ্চিত করতে পারে।”
তিনি আরো বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে নির্দেশ না দিলে আওয়ামী লীগের ভোটাররা দলবদ্ধভাবে কোনো নির্দিষ্ট দলকে ভোট দেবেন—এমন সম্ভাবনা কম।
আওয়ামী লীগ বলছে, তাদের ছাড়া নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে না। অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াতসহ অভ্যুত্থানের পক্ষে থাকা দলগুলো বলছে, ভোটারদের অংশগ্রহণই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের হার সন্তোষজনক না হলে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে নৈতিক প্রশ্ন উঠতে পারে। আবার ভোটের হার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বা তার বেশি হলে আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে এবং অভ্যুত্থানের প্রতি জনসমর্থনও স্পষ্ট হতে পারে।
ফলে বৃহস্পতিবারের নির্বাচন শুধু বিএনপি-জামায়াতের প্রতিদ্বন্দ্বিতাই নয়, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
