সংসদে ‘লোডশেডিং’ বনাম ‘মেরামতশেডিং’ বিতর্ক, সত্য কোনটি?
মো. নাজমুল হাসান, ভোরের কাগজ
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ১১:৩৮ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বক্তব্য এবং বিরোধী সদস্যদের দাবি ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই, ফলে লোডশেডিংও নেই; থাকলে ‘মেরামতশেডিং’ আছে। তবে বিরোধী পক্ষের দাবি, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে মানুষ প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন অবস্থায় কাটাচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে- বাস্তবতা আসলে কোনটি?
রোববার (৭ জুন) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে কয়েকজন সংসদ সদস্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ উত্থাপন করেন। এর জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার ৫০০ থেকে ১৭ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের মধ্যে ওঠানামা করছে। বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ১৫ হাজার ৫০০ থেকে ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।
মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ‘লোডশেডিং হলো বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ না থাকা। যেহেতু ঘাটতি নেই, সেহেতু লোডশেডিংয়ের প্রশ্নই আসে না।’
তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট’, যা ঝড়বৃষ্টি, গাছ পড়ে লাইন ছিঁড়ে যাওয়া কিংবা সঞ্চালন-বিতরণ লাইনের ত্রুটির কারণে হতে পারে। তিনি এটিকে লোডশেডিং হিসেবে মানতে নারাজ। তিনি ‘মেরামতশেডিং’ পরিভাষাটি ব্যবহার করেন।
রুমিন ফারহানা মন্ত্রীর বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করে সরাসরি সংসদে মাঠে নেমে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমরা লোডশেডিং বলি, মেরামতশেডিং বলি, গ্রামাঞ্চলে ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না -এটাই বাস্তবতা।’ তিনি আরও কটাক্ষ করে মন্ত্রীকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, গত অধিবেশনে মন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে পয়লা মে’র মধ্যে আশুগঞ্জ সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করা হবে। তবে সেটি বাস্তবায়িত হয়নি এবং কবে গ্যাস পাওয়া যাবে, তা জানতে চান তিনি। মন্ত্রী জবাবে দাবির সঙ্গে একমত নন বলে জানিয়ে দেন এবং গ্যাস সংকটের কথা উল্লেখ করেন।
লোডশেডিং নিয়ে কেবল সংসদেই বিতর্ক নয়। দেশের জনগণের ভোগান্তি চরমে উঠেছে। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসে, গরমের মধ্যে চট্টগ্রামের চাষি বা নেত্রকোনার জেলের ঘরেও বিদ্যুৎ থাকে না অনবরত। ‘গরমের মধ্যে যন্ত্রণায় আছি, গভীর রাতেও দুই-তিনবার বিদ্যুৎ যায়, একবার গেলে দেড়-দুই ঘণ্টার কমে আসে না,’ বিবিসি বাংলাকে বলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা নয়ন বড়ুয়া। তাঁর দাবি, চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন ছয় থেকে সাত ঘণ্টার মতো লোডশেডিং হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, দিনে-রাতে নিয়ম করে শহর এলাকায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা এবং গ্রামাঞ্চলে সাত থেকে আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দার বাসিন্দা পলাশ তালুকদার বলেন, ‘এসএসসি পরীক্ষার মধ্যে এমনিতেই তীব্র গরম, আর সঙ্গে কারেন্ট (বিদ্যুৎ) নাই, সব মিলিয়ে খুবই বাজে অবস্থা।’
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে চাহিদা বাড়লেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি থাকায় গত বুধ ও বৃহস্পতিবার দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং দিতে হয়েছে। ঢাকায় প্রতিদিন অন্তত ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেওয়ার সিদ্ধান্ত গত বৃহস্পতিবার সংসদে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঘাটতি মেটাতে যে লোডশেডিং দেওয়া হয়, তার প্রায় পুরোটাই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে গ্রামের মানুষের ওপর। ঢাকা শহরকে পরিকল্পিতভাবেই লোডশেডিংমুক্ত রাখা হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০৬ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে ২ হাজার ২২৯ মেগাওয়াট ছিল আরইবির আওতাধীন গ্রামাঞ্চলে। একই চিত্র আগের বছরেও দেখা গেছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও পাওয়ার গ্রিড পিএলসির তথ্য বলছে, দেশে বিদ্যুতের চাহিদার দ্বিগুণ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও তা কাজে লাগছে না। জ্বালানি সংকট, বকেয়া বিল ও কারিগরি ত্রুটির কারণে সক্ষমতার অর্ধেক বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। বর্তমানে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট, কিন্তু কয়েক দিন ধরে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না। দিনের অধিকাংশ সময় উৎপাদন হচ্ছে ১২ হাজার মেগাওয়াট, যেখানে চাহিদা ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। ফলে দুই থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাসভিত্তিক। মোট সক্ষমতার ৪৩ শতাংশই আসে গ্যাস থেকে। কিন্তু গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ১২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন হচ্ছে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকের কিছু বেশি উৎপাদন হচ্ছে। চারটি বড় কেন্দ্রে উৎপাদন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। গ্যাস ও কয়লার বিকল্প হিসেবে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো রাতে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করে।
‘লোডশেডিং না হলেও কানেক্টিং গ্রিড ফেইল বা লাইন মেইনটেন্যান্স- এসবের নামে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের স্রোতে ভাসছে সাধারণ মানুষ। স্বস্তি নেই কারও’ -বলছিলেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গ্যাস-সংকট আগে থেকেই ছিল। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়ার সময় অনেক আগেই চলে এসেছে। ঝড়বৃষ্টি, গাছপালা, লাইন কাটা- এসব যুক্তি দিয়ে জনগণের অবর্ণনীয় ভোগান্তি এড়ানো যাচ্ছে না।
