মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর, স্মৃতিতে সেই বিভীষিকা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৪ এএম
ছবি : সংগৃহীত
উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের মর্মান্তিক ঘটনার এক বছর পূর্ণ হলো আজ (২১ জুলাই)। গত বছরের এই দিনে সেই বিভীষিকাময় দুপুরে প্রাণচঞ্চল ক্যাম্পাস মুহূর্তেই পরিণত হয়েছিল আগুন, মৃত্যু আর আর্তনাদের জনপদে। দুর্ঘটনায় পাইলট, এক শিক্ষিকা এবং ২৮ কোমলমতি শিক্ষার্থীসহ মোট ৩৬ জনের প্রাণহানি ঘটে।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পর পুরো দেশজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। দগ্ধ ও আহত শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং কর্মচারীদের রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গুরুতর আহতদের চিকিৎসা চলে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। দীর্ঘ চিকিৎসার পর অনেকেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও তাদের শরীরে এখনো বহন করতে হচ্ছে আগুনের ক্ষতচিহ্ন, আর মনে রয়ে গেছে সেই ভয়াল দিনের স্মৃতি।
দুর্ঘটনার পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার নয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। কমিশনকে দুর্ঘটনার কারণ, দায়দায়িত্ব, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সুপারিশ তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রায় তিন মাসের তদন্ত শেষে ১৫০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও ১৬৮টি তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ৩৩ দফা সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, উড্ডয়নজনিত ত্রুটির কারণে প্রশিক্ষণের সময় বিমানটি পাইলটের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে বিধ্বস্ত হয়। ভবিষ্যতে জননিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিমানবাহিনীর সব প্রাথমিক উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ ঢাকার বাইরে পরিচালনার সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি বরিশাল ও বগুড়া বিমানঘাঁটির রানওয়ে সম্প্রসারণের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি রাজউকের বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে নির্মাণ করা হয়নি। বিধি অনুযায়ী ভবনে অন্তত তিনটি সিঁড়ি থাকার কথা থাকলেও সেখানে ছিল মাত্র একটি। পর্যাপ্ত সিঁড়ি থাকলে হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম হতে পারত বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আরো পড়ুন : ইরানে মার্কিন হামলা অব্যাহত, পাল্টা জবাব তেহরানের
দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাভিদ নাওয়াজ দীপ্তর চিকিৎসা বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। তার শরীরের প্রায় ৪৫ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। ৯৭ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাকে ৩৬টি অস্ত্রোপচার এবং আটবার স্কিন গ্রাফটিং করতে হয়। কয়েক দফা জীবনসংকটে পড়লেও শেষ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে দীপ্ত। তার সুস্থ হয়ে ওঠা এই শোকাবহ ঘটনার মধ্যেও আশার প্রতীক হয়ে ওঠে।
দুর্ঘটনায় নিহত কয়েকজনের মরদেহ আগুনে এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে প্রথমে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পাঁচজনের পরিচয় নিশ্চিত করে এবং স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।
এক বছর পার হলেও নিহতদের পরিবার, আহত শিক্ষার্থী এবং তাদের স্বজনদের কাছে ২১ জুলাই এখনো এক বেদনাবিধুর দিন। অনেক শিক্ষার্থী শারীরিকভাবে সুস্থ হলেও মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। অনেক পরিবার এখনো হারানো সন্তান ও প্রিয়জনের স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে।
দুই দিনের কর্মসূচি
মর্মান্তিক এই ট্র্যাজেডির প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে নিহতদের স্মরণ ও আহতদের প্রতি সংহতি জানাতে দুই দিনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলম জানান, কর্মসূচির প্রথম দিন সোমবার (২০ জুলাই) দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসসহ সব শাখার বাংলা মাধ্যম ও ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অংশগ্রহণে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে সমাহিত নিহত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কবর জিয়ারত এবং তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া করা হয়েছে।
মঙ্গলবার ট্র্যাজেডির দিনটি উপলক্ষে প্রতিষ্ঠানের সব শাখায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। উত্তরার দিয়াবাড়ির দুর্ঘটনাস্থল ক্যাম্পাসে নিহতদের স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বিএনসিসি, রোভার স্কাউট, গার্লস গাইড, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অংশগ্রহণে শ্রদ্ধা নিবেদন, শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং দোয়া মাহফিল।
