দেশে ফিরলে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কী হতে পারে আইনি প্রক্রিয়া?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম
শেখ হাসিনা। ছবি: সংগৃহীত
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে যান ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর থেকে তিনি দিল্লিতেই অবস্থান করছেন। তবে সম্প্রতি ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চলতি বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ইচ্ছার কথাও জানিয়েছিলেন হাসিনা। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশে ফিরলে তার ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া কী হবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বিস্তর।
জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি হত্যারও শিকার হতে পারেন— এমন আশঙ্কা জেনেও তিনি দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এদিকে, ভারতে পলাতক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে দেশে বসে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেন কি না, সে বিষয়ে ভারত সরকারকেই তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ সরকার ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নিতে চায় এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড যেন সেই সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সেটিই প্রত্যাশা।
আরো পড়ুন: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ঢাকা কলেজে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা
আজ সোমবার (৩ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। এ বিষয়ে আয়োজক ক্লাবের সভাপতি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে এতে ভারত সরকারের কোনো আপত্তি নেই— এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, শেখ হাসিনা একজন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি এবং কার্যক্রম-নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রধান। তিনি কোথায় কী বলছেন, সেটির জবাব দেওয়া বাংলাদেশ সরকারের কাজ নয়।
এদিকে, ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ওই মামলায় ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। বিচার চলাকালে তিনি অনুপস্থিত থাকায় তার পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল। প্রচলিত আইন অনুযায়ী, ওই রায় বহাল রাখা বা পরিবর্তনের ক্ষমতা রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের। তবে রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের তামাদি মেয়াদও অতিক্রান্ত হয়েছে। ফলে দেশে ফিরে তিনি আদালতে আত্মসমর্পণের সুযোগ পাবেন কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর আইনগত দিক নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি বলতে চাই, এখানে কিছু বিষয় রয়েছে। তিনি মূলত ৫ আগস্ট ভারত চলে গিয়েছেন এবং সেখানেই আছেন বলে আমরা জানি। তিনি আগামী ডিসেম্বরে নেতাদের নিয়ে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করবেন বলে একটি বিদেশি সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। বিষয় হচ্ছে, তিনি যেহেতু ভারতে আছেন, সেখানে আশ্রয় পেয়েছেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের একটি ট্রাইব্যুনালে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন এবং এরপর আমরা তাকে ফেরত চেয়ে ভারত সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছি। সুতরাং ভারত সরকার চাইলে সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে বাংলাদেশে বন্দিবিনিময় চুক্তির অধীনে ফেরত পাঠাতে পারে, পুশব্যাক করতে পারে অথবা রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে পারে।’
আরো পড়ুন: অবশেষে জনসম্মুখে আসছেন শেখ হাসিনা
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘শেখ হাসিনা নিজে নিজে দেশে আসবেন— এটি বলার সুযোগ কোথায়? কোনও সুযোগ নেই। আইনগতভাবেও কোনও সুযোগ নেই। রয়টার্সকে যে বক্তব্য তিনি দিয়েছেন, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। বিষয়টি যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। আর যদি তিনি বলেও থাকেন, তাহলে মনে হয় এটি মানুষকে বোকা বানানোর জন্য বা চাতুর্যপূর্ণ বক্তব্য।’
আমিনুল ইসলাম বলেন, তিনি যদি স্বেচ্ছায়ও দেশে আসেন, তাহলে তাকে আইনের আওতায় আসতে হবে এবং অবশ্যই কারাগারে যেতে হবে। ‘তিনি আদালতে আত্মসমর্পণের কথা বলেছেন। কিন্তু তার আগেই তিনি পুলিশের হেফাজতে চলে যাবেন। এরপর কারাগারে গিয়ে তিনি কী করবেন, সেটি তাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘তিনি দেশে ফিরে আসতে চান, এটা খুবই ভালো কথা। আমি তাকে স্বাগত জানাই। তিনি দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হতে চেয়েছেন, এটিও ভালো দিক। তবে একটি বিষয় থেকে যায়। তিনি কোন প্রক্রিয়ায় দেশে আসবেন, সেটির ওপরই নির্ভর করবে কীভাবে তিনি বিচারের মুখোমুখি হবেন।’
এদিকে, আজ সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ভারত সরকার সম্প্রতি জানিয়েছে, তারা আশা করে না যে ভারতে অবস্থানরত কোনো পলাতক আসামি রাজনৈতিক বক্তব্য দেবে এবং এমন কর্মকাণ্ডকে তারা সমর্থন করে না। এখন আলোচিত অনলাইন অনুষ্ঠান বা অন্য কোনো কর্মসূচিকে ভারত সরকার সমর্থন করে কি না, সেটি ভারত সরকারকেই স্পষ্ট করতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে জানিয়ে আসছে, ভারতে অবস্থানরত পলাতক আসামিরা যদি রাজনৈতিক বক্তব্য দেন বা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার কোনো ষড়যন্ত্রে জড়ান, তাহলে তা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনারের সঙ্গে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক হয়েছে এবং দুই দেশ ভবিষ্যতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে কাজ করছে। সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হোক, তা আমরা চাই না এবং আমার গভীল বিশ্বাস, ভারতও তা চায় না।
এ বিষয়ে ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবারও ব্যাখ্যা চাওয়া হবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, অনুষ্ঠানটি ভারত সরকার আয়োজন করছে না। তবে প্রয়োজন মনে করলে সরকার কূটনৈতিক মাধ্যমে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করবে।
তিনি আরও জানান, অতীতেও বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও যোগাযোগে বাংলাদেশ এ বিষয়টি একাধিকবার ভারতের কাছে লিখিত ও মৌখিকভাবে তুলে ধরেছে। তাদের সঙ্গে যখনই আমাদের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা, মতবিনিময় হচ্ছে, বিষয়টি আমরা আমাদের তরফ থেকে পরিষ্কার করছি। সুতরাং যেহেতু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভারতে আশ্রিত, তাই এ বিষয়ে ভারত সরকারকেই নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে।
