গ্যাস সংকটে বন্ধ শত শত কারখানা, বাড়ছে অর্থনৈতিক ঝুঁকি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৫ এএম
ছবি : সংগৃহীত
দেশজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট এবার শিল্প খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনছে। তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা সংকটের মধ্যে গত বুধবার থেকে গ্যাস সরবরাহ আরও কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের শত শত কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বিপাকে পড়েছেন শিল্পোদ্যোক্তা ও শ্রমিক-কর্মচারীরা। পাশাপাশি রপ্তানি আদেশ ও নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
শিল্পকারখানার জন্য বরাদ্দ গ্যাসের বড় অংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করায় শিল্প খাতে সংকট আরও তীব্র হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এর ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত হবিগঞ্জে গ্যাস সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে। গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে গ্যাসের চাপ কমতে শুরু করলেও বুধবার থেকে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে জেলার ছোট-বড় ১৭১টি কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কারখানা বন্ধ থাকায় প্রায় দুই লাখ শ্রমিক-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন উদ্যোক্তারা।
নারায়ণগঞ্জেও গ্যাস সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে যাওয়ায় প্রায় ৪৫০টি ডায়িং কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এসব কারখানা থেকে প্রয়োজনীয় কাপড় না পাওয়ায় শতাধিক পোশাক কারখানাও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামে গ্যাস না পেয়ে চালকদের সড়ক অবরোধ
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে যাওয়ায় ডায়িং কারখানা থেকে প্রয়োজনীয় ফ্যাব্রিক্স পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি জানান, তার নিজের কারখানাতেও ফ্যাব্রিক্সের সংকটে কয়েক দিন উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আগামী দিনগুলোতেও পরিস্থিতির উন্নতি হবে না বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
গ্যাস সংকটে সাভার-আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলেও উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এই অঞ্চলের গ্যাসনির্ভর পোশাক কারখানাগুলোর বয়লার, ডায়িং, ওয়াশিং, ফিনিশিং ও আয়রনিং বিভাগ স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, চলতি মাসে সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানা থেকে তিন থেকে চার হাজার শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় রপ্তানি পণ্য নির্ধারিত সময়ে পাঠানো নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল গাজীপুরেও গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিশেষ করে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে।
আরও পড়ুন: গরিবের টেসলায় মধ্যরাতেও ১৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা
উদ্যোক্তারা বলছেন, সংকট দ্রুত সমাধান না হলে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার বাতিল হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
শুধু শিল্প খাত নয়, গ্যাসের সংকটে সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকরাও সমস্যায় পড়েছেন। নারায়ণগঞ্জের ৩৩টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের প্রায় সবগুলোতেই গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। ফলে গ্যাস নিতে চালকদের দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট এবং সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট।
গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়। পরে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালের একটি বয়লার থেকে ৬ আগস্ট পুনরায় গ্যাস সরবরাহ শুরু করা হলেও অন্য বয়লারটি চালুর আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
আরও পড়ুন: যে দুই ধাপে বাস্তবায়ন হবে পে-স্কেল
পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি চালুর আগে পরীক্ষার জন্য টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখতে হবে। এ কারণে প্রায় ৭২ ঘণ্টা সরবরাহ বন্ধ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ঠিক কখন এ কার্যক্রম শুরু হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শিল্প খাত বর্তমানে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। দ্রুত সমাধান না হলে সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
শিল্পোদ্যোক্তাদের মতে, গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু কারখানার উৎপাদন নয়, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধ ও অন্যান্য আর্থিক দায় মেটানোও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তাদের দাবি, সংকট মোকাবিলায় দ্রুত স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা নিতে হবে। অন্যথায় শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
