আইনমন্ত্রী
রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও জাতীয় ঐকমত্য জরুরি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:০৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের পাশাপাশি জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার নিশ্চিত করে তাদের নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে ফেরাতে দেশটির সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (২৩ আগস্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে নীতি গবেষণা কেন্দ্র আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা সংকট: বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সরকার অতীতে যেভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছিল, সেই পথেই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে তারা বিশ্বাস করেন। রোহিঙ্গারা যাতে নিরাপদে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে পারে, সেটিই সরকারের প্রত্যাশা।
আরও পড়ুন: ১০ বছরকে ২০ বছর হতে দেওয়া যাবে না: শামা ওবায়েদ
মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেভাবে রোহিঙ্গা সংকটকে বিবেচনা করছে, বাংলাদেশও একই দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়টি দেখছে। এটি মূলত মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক ও দেশটির জনগোষ্ঠীর অংশ। তাই তাদের মানবাধিকার রক্ষায় মিয়ানমার সরকারকে অবশ্যই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমারকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে রোহিঙ্গারা তাদের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে অতীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেভাবে বিষয়টি তুলে ধরেছিল, পরবর্তী সরকারগুলো সেভাবে তা মোকাবিলা করতে পারেনি।
আরও পড়ুন: চলতি সপ্তাহে টানা ৪ দিনের ছুটি, যেভাবে পাবেন
রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের সঙ্গে আলোচনা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন আইনমন্ত্রী। তবে এর আগে দেশের জনগণের মধ্যে এ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, দল-মত নির্বিশেষে বিভেদ ভুলে দেশের মানুষকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে। দেশের ভূখণ্ড ও জাতীয় স্বার্থকে সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের কোনো বিষয় মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণকে সামনে রাখতে হবে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। তাই দেশের প্রতিটি নাগরিকের রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে। সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদেও নাগরিকদের দায়িত্বের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ে রাষ্ট্রের করণীয় সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদেও নির্ধারণ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে নতুন বার্তা জয়শঙ্করের
আইনমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মূলত মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হলেও বাংলাদেশ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি মোকাবিলা করছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার পেছনে মানবিক মূল্যবোধই কাজ করেছে।
তিনি বলেন, সরকার রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক বিরোধ হিসেবে দেখছে না। এটি মূলত মানবাধিকার ও মানবিক মূল্যবোধের বিষয়। সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদের আলোকে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানো বাংলাদেশের নৈতিক দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি হলে সংকট সমাধানে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন আইনমন্ত্রী। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করেছেন। কমিটি এ বিষয়ে কাজ করছে।
দেশের ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষাকে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার উল্লেখ করে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এ কারণে নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কূটনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার যাতে কোনোভাবেই লঙ্ঘিত না হয়, সেটিও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা কবে? জানা গেল
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাড়তে থাকা হত্যা, আহত হওয়া ও অপরাধের ঘটনাগুলোও মোকাবিলা করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে সামাজিক চাপ সৃষ্টিকারী সংগঠন ও পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান আইনমন্ত্রী।
আয়োজকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তাদের চিন্তা ও সুপারিশ সরকারের কাছে তুলে ধরতে হবে। নিজেদের মতামতকে একমাত্র সঠিক না ধরে জাতীয় কমিটির কাছে এসব প্রস্তাব উপস্থাপনের আহ্বান জানান তিনি। এসব সুপারিশ প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কমিটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে বলে আশা প্রকাশ করেন আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সামাজিক চাপ সৃষ্টিকারী সংগঠনগুলোর সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে রোহিঙ্গা সংকটকে কীভাবে স্থায়ী সমাধানের পথে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে কাজ করতে হবে।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাংলাদেশ হস্তক্ষেপ করতে চায় না বলেও জানান আইনমন্ত্রী। তবে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরানোর দাবি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আরও পড়ুন: গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকারদের জন্য নতুন অধিদপ্তর
তিনি বলেন, বাংলাদেশ শুধু বলতে চায়- রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি নয়, তারা বাংলাদেশের ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীও নয়। তবে তারা মানুষ এবং তাদের মানবাধিকার রয়েছে।
মো. আসাদুজ্জামান আরও বলেন, সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক দিক থেকে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের ওই ভূখণ্ডের অধিবাসী। আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় তাদের নির্দিষ্ট সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা করতে হবে।
আলোচনা সভায় নীতি গবেষণা কেন্দ্রের ট্রাস্টি সদস্য অধ্যাপক এস কে তৌফিক এম হক, প্রতিষ্ঠানটির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ড. শাকিল আহম্মেদ, রোহিঙ্গা নারী অধিকারকর্মী রাজিয়া সুলতানাসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
