×

জাতীয়

গ্যাস সংকটের যাঁতাকূপে সারের বাজার, বিপাকে চাষিরা

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪৯ এএম

গ্যাস সংকটের যাঁতাকূপে সারের বাজার, বিপাকে চাষিরা

ছবি : সংগৃহীত

গ্যাস সংকটের প্রভাব এবার সরাসরি দেশের সারের বাজারে পড়েছে। গ্যাসের অভাবে দেশীয় ইউরিয়া সার কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজার ও আমদানিনির্ভরতার কারণে সরবরাহব্যবস্থায়ও তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি, ডিলারদের পর্যাপ্ত বরাদ্দ না পাওয়া এবং দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও কৃষকের সার না পাওয়ার অভিযোগ বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সার মজুত নিরাপদ মাত্রার নিচে নেমে গেছে। বিভিন্ন ধরনের সারের সম্মিলিত মজুত নিরাপদ প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৩ লাখ ৩৪ হাজার টন কম। তবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দাবি, সার আমদানি অব্যাহত রয়েছে এবং সরবরাহ ও বিতরণও স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে।

গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ইউরিয়া

সারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ ইউরিয়া নিয়ে। কারণ ইউরিয়া উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল অ্যামোনিয়া এবং অ্যামোনিয়া উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস প্রয়োজন। ফলে গ্যাস সরবরাহে সংকট দেখা দিলে ইউরিয়া কারখানাগুলোই প্রথমে সমস্যায় পড়ে।

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার বেলা ২টায় দেশে গ্যাসের চাহিদা ছিল ৩ হাজার ৮ এমএমসিএফডি। বিপরীতে সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৩৫৫ এমএমসিএফডি। বিকেল ৪টায় সরবরাহ আরও কমে যায়। এর আগের দিন সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৪১০ এমএমসিএফডি।

বন্ধ দেশীয় সার কারখানা

২০২৬ সালের মার্চে গ্যাস সরবরাহ সীমিত করার পর দেশের ছয়টি ইউরিয়া কারখানার মধ্যে পাঁচটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) এবং কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো) ছিল।

পরে কাফকো আংশিক গ্যাস সরবরাহ পেয়ে উৎপাদনে ফিরলেও রাষ্ট্রায়ত্ত সিইউএফএল দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস বন্ধ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কাফকোর সঙ্গে প্রতিষ্ঠাকালীন চুক্তিতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা থাকায় গ্যাস সংকটের মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে সার কারখানায় গ্যাস বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সক্ষমতা থাকলেও উৎপাদন কম

দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সাতটি সার কারখানার সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৩৭ লাখ টনের বেশি। অথচ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসব কারখানায় উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ৬ হাজার টন।

ওই অর্থবছরে দেশে সারের চাহিদা ছিল প্রায় ৬৬ লাখ টন। অর্থাৎ মোট চাহিদার তুলনায় দেশীয় উৎপাদন ছিল এক-পঞ্চমাংশেরও কম। ফলে চাহিদার বড় অংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়েছে।

আমদানিনির্ভরতা দেশের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম, জ্বালানি মূল্য, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, পরিবহন ব্যয় এবং কাঁচামালের বাজার—সবকিছুর ওপর আমদানি ব্যয় নির্ভর করছে।

আমন মৌসুমে বাড়ছে উদ্বেগ

বর্তমানে সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হয়েছে আমন মৌসুম ঘিরে। ধানের জমিতে ইউরিয়া ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ সময় সামনে থাকায় বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সারের ব্যবহার কমে গেলে ফলনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিস্থিতি এ উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। সেখানে সিইউএফএল দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সংকটে বন্ধ। অন্যদিকে ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড কাঁচামালের সংকটে উৎপাদন করতে পারছে না এবং কাফকোও সীমিত গ্যাস সরবরাহের মধ্যে উৎপাদন করছে।

চলতি আমন মৌসুমে শুধু চট্টগ্রাম জেলাতেই ইউরিয়ার চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৭ হাজার ৩৬৬ টন। পাশাপাশি টিএসপি, ডিএপি ও এমওপিরও উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে।

কাগজে মজুত, মাঠে সংকট

গত ১৬ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, দেশে সারের কোনো সংকট নেই এবং পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কিন্তু এর কয়েক দিনের মধ্যেই মাঠপর্যায়ে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়।

বিভিন্ন এলাকায় কৃষকেরা সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ করেছেন। কোথাও কোথাও ডিলারদের কাছে পর্যাপ্ত সার না থাকায় কৃষকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সার না পেয়ে দুই শতাধিক কৃষক ডিলারের গুদামে ঢুকে প্রায় ১০ হাজার কেজি ইউরিয়া নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এর আগে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে কৃষকেরা সড়ক অবরোধ করে সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ করেন।

অভিযোগ রয়েছে, কোথাও টিএসপির বস্তা ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং ইউরিয়া ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

সার সংকটকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক মহলেও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও গ্যাস সরবরাহ না থাকায় কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

অন্যদিকে প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলের একাংশের অভিযোগ, কিছু ডিলার ও ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সার মজুত করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

কৃষকদের প্রশ্ন, দেশে যদি পর্যাপ্ত সার মজুত থাকে, তাহলে তারা সরকারি দামে সার পাচ্ছেন না কেন? অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন, মাঠে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকলে শুধু ডিলারদের দায়ী করা হচ্ছে কেন?

আমদানির উদ্যোগ সরকারের

সংকট মোকাবিলায় সরকার সার আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে ৩০ হাজার টন ইউরিয়া আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। পাশাপাশি সরকারি মজুত বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু আমদানি বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। বন্দরে সার পৌঁছানোর পর সেটি দ্রুত কৃষকের হাতে পৌঁছানোও জরুরি। এজন্য পরিবহন, গুদামজাতকরণ, ডিলার নেটওয়ার্ক ও উপজেলা পর্যায়ে বিতরণব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।

ঘোড়াশাল-পলাশেও উৎপাদন ঘাটতি

দেশীয় উৎপাদন সংকটের আরেকটি উদাহরণ নরসিংদীর ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা। সেখানে ৮ লাখ ৫০ হাজার টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৭ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৫ টন। অর্থাৎ উৎপাদন ঘাটতি হয়েছে প্রায় ৮৫ হাজার টন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু কারখানা চালু থাকলেই হবে না। পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ, নিরবচ্ছিন্ন কাঁচামাল সরবরাহ, কারখানার সক্ষমতা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

খাদ্যনিরাপত্তায় প্রভাবের আশঙ্কা

সারের সংকট কৃষকের ওপর তিন ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

তার মতে, প্রথমত, কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়বে। সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হলে প্রতি বিঘায় বাড়তি ব্যয় হবে।

দ্বিতীয়ত, দাম বেড়ে গেলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের অনেকে প্রয়োজনীয় মাত্রায় সার ব্যবহার কমিয়ে দিতে পারেন। এতে জমির উৎপাদনশীলতা কমার ঝুঁকি রয়েছে।

তৃতীয়ত, খাদ্যপণ্যের বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে। উৎপাদন খরচ বাড়লে কৃষককে বেশি দামে ফসল বিক্রি করতে হবে। আবার সার সংকটে ফলন কমে গেলে বাজারে সরবরাহও কমতে পারে।

এ কারণে সারের সংকটকে শুধু কৃষি খাতের সমস্যা হিসেবে না দেখে খাদ্যনিরাপত্তার বিষয় হিসেবেও বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ দাবি করেছেন, গ্যাস সংকটের কিছুটা প্রভাব পড়লেও চলতি মৌসুমে সার নিয়ে কৃষকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। তিনি জানান, সার আমদানির প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে এবং চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

নেপালে বন্যা-ভূমিধসে নিহত বেড়ে প্রায় ৪৬৯, নিখোঁজ অন্তত ১৫০০

নেপালে বন্যা-ভূমিধসে নিহত বেড়ে প্রায় ৪৬৯, নিখোঁজ অন্তত ১৫০০

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশকে ঘিরে যা বলল পাকিস্তান

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশকে ঘিরে যা বলল পাকিস্তান

বিএনপি কোনোদিন পোষ্য বিরোধী দল পাবে না

সারজিস আলম বিএনপি কোনোদিন পোষ্য বিরোধী দল পাবে না

সরকারের বিশেষ নজরদারিতে রয়েছে যেসব জেলা

সরকারের বিশেষ নজরদারিতে রয়েছে যেসব জেলা

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App