ফ্যামিলি কার্ডে বড় শর্ত, বাদ পড়বেন কারা?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৩৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
দরিদ্র, অতি দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনতে ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে সরকার। নতুন এই নীতিমালায় আট ধরনের ব্যক্তি বা পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধার বাইরে রাখার বিধান করা হয়েছে।
সম্প্রতি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এ নীতিমালা জারি করে। এর মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বড় পরিসরে বাস্তবায়নের জন্য পূর্ণাঙ্গ কাঠামো তৈরি হলো।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, সরকারের ঘোষিত ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে বৈষম্যহীন ও মানবিক ‘সামাজিক কল্যাণ রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার রয়েছে। এর মূল দর্শন হলো, ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’। এই দর্শনের ভিত্তিতে অতি দরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে সমন্বিত ডিজিটাল সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আনতে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ১১ আসনের সীমানা নিয়ে ইসির নতুন গেজেট
এ কর্মসূচির আওতায় দেশের প্রায় ২ কোটি নারী পরিবার প্রধানকে সরাসরি জিটুপি পদ্ধতিতে মাসিক নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
যেসব ৮ ধরনের ব্যক্তি-পরিবার ফ্যামিলি কার্ড পাবেন না
নীতিমালায় ফ্যামিলি কার্ডের নগদ সহায়তার ক্ষেত্রে একটি ‘নেগেটিভ লিস্ট’ বা বহির্ভূত তালিকা রাখা হয়েছে। নিচের বৈশিষ্ট্যগুলোর যেকোনো একটি থাকলে ব্যক্তি বা পরিবার ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার যোগ্য হবে না।
১. নির্ধারিত পিএমটি স্কোরের বেশি হলে
সরকার নির্ধারিত পিএমটি স্কোরের ঊর্ধ্বসীমার চেয়ে বেশি স্কোর পাওয়া পরিবার ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা পাবে না।
২. নারী পরিবার প্রধান সরকারি চাকরিতে থাকলে
পরিবারের মনোনীত নারী প্রধান সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা পেলে তিনি সুবিধার বাইরে থাকবেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষক বা কর্মচারীরাও এ সুবিধা পাবেন না।
৩. নিয়মিত সরকারি পেনশন পেলে
মনোনীত নারী পরিবার প্রধান নিয়মিত সরকারি পেনশন বা অনুরূপ অবসর সুবিধা গ্রহণ করলে ফ্যামিলি কার্ড পাবেন না। তবে প্রতিবন্ধী সন্তান হিসেবে বিশেষ পেনশন সুবিধা গ্রহণকারী এ শর্তের বাইরে থাকবেন।
৪. ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয় বা বিনিয়োগ থাকলে
পরিবারের কোনো সদস্যের নামে জাতীয় সঞ্চয়পত্রে ৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ থাকলে পরিবারটি সুবিধা পাবে না। একইভাবে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়, ফিক্সড ডিপোজিট বা অন্য কোনো বিনিয়োগ থাকলেও ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া যাবে না।
৫. তিন বা চার চাকার মোটরযান থাকলে
পরিবারের কোনো সদস্যের নামে বিআরটিএ নিবন্ধিত তিন বা চার চাকার মোটরযান থাকলে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে না। এর মধ্যে সিএনজি বা পেট্রোলচালিত ফোর-স্ট্রোক থ্রি-হুইলার, কার, জিপ, পিকআপ, বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লরি ও মাইক্রোবাস রয়েছে।
৬. বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসা থাকলে
পরিবারের কোনো সদস্যের নামে বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে হালনাগাদ লাইসেন্স বা ব্যবসা থাকলে তিনি এ কর্মসূচির সুবিধা পাবেন না।
৭. নিয়মিত করদাতা হলে
পরিবারের কোনো সদস্য নিয়মিত করদাতা এবং তার করযোগ্য আয় থাকলে পরিবারটি ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার জন্য যোগ্য বিবেচিত হবে না।
৮. নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি বা বাণিজ্যিক সম্পদ থাকলে
বসতভিটাসহ পরিবারের মোট আবাদি জমির পরিমাণ শূন্য দশমিক ৫০ একর বা তার বেশি হলে ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া যাবে না। পাশাপাশি কোনো অকৃষি বা বাণিজ্যিক জমি কিংবা স্পেসের বাজারমূল্য ৫ লাখ টাকার বেশি হলেও পরিবারটি সুবিধার বাইরে থাকবে।
এক পরিবারে থাকবে এক ‘ওয়ান-আইডি’
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় তালিকাভুক্ত প্রতিটি যোগ্য পরিবারকে একটি স্থায়ী ও অনন্য পরিচিতি নম্বর দেওয়া হবে। ‘ওয়ান-আইডি’ নামে এই নম্বর ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট পরিবারের কেন্দ্রীয় পরিচিতি হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
আরও পড়ুন: সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত
নীতিমালায় বলা হয়েছে, ওয়ান-আইডি কেবল পরিচিতি নম্বর হিসেবে কাজ করবে না; এটি রাষ্ট্রীয় তথ্য ব্যবস্থাপনায় একটি সমন্বিত ও সুসংহত ডেটা গভর্ন্যান্স কাঠামো হিসেবেও ব্যবহৃত হবে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে জাতীয় স্বার্থে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এই তথ্য ব্যবহারের সুযোগ পাবে।
একসঙ্গে একাধিক সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা নয়
ফ্যামিলি কার্ডধারী মনোনীত নারী পরিবার প্রধান একই সময়ে অন্য কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সমজাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আর্থিক, খাদ্য বা অন্য কোনো সুবিধা নিতে পারবেন না।
কোনো নারী পরিবার প্রধান আগে থেকেই টিসিবির স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট বা ভিডব্লিউবি কর্মসূচির সুবিধা নিয়ে থাকলে কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ যাচাইয়ের মাধ্যমে আগের সুবিধা বাতিল বা স্থগিত করা হবে।
আরও পড়ুন: ডিএমপিতে বড় রদবদল
একইভাবে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা বা এ ধরনের সরকারি নগদ সহায়তা নেওয়া নারী পরিবার প্রধান ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা পাওয়ার সময় আগের সুবিধা বহাল রাখতে পারবেন না।
তবে মনোনীত নারী পরিবার প্রধান ছাড়া পরিবারের অন্য সদস্যরা প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী অন্যান্য সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।
এনআইডি থেকে ব্যাংক-বিআরটিএ, ভূমির তথ্য যাচাই
ফ্যামিলি কার্ডের আবেদনকারীর তথ্যের সত্যতা ও নির্ভুলতা যাচাইয়ে বিভিন্ন সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ডেটাবেজের সঙ্গে এপিআই সংযোগ স্থাপন করা হবে।
আরও পড়ুন: এনবিআরে বড় রদবদল
জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্ট্রার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বিআরটিএ, ভূমি মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগের আওতাধীন সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি এমআইএস এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ডেটাবেজের সঙ্গে এই সংযোগ স্থাপন করা হবে।
কারিগরি প্রয়োজন অনুযায়ী সরকার যেকোনো সময় এ তালিকার পরিধি কিংবা এপিআই সংযোগ পুনর্বিন্যাস করতে পারবে।
জালিয়াতি শনাক্তে ব্যবহার হবে এআই
ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রিতে থাকা তথ্যে অসঙ্গতি বা জালিয়াতি প্রতিরোধে প্রয়োজনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা মেশিন লার্নিংভিত্তিক অসঙ্গতি শনাক্তকরণ প্রযুক্তি যুক্ত করতে পারবে সরকার।
এর ফলে কোনো আবেদনকারীর আয়, সঞ্চয়, জমি, যানবাহন, কর প্রদান বা অন্য সরকারি সুবিধা গ্রহণের তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে প্রযুক্তির মাধ্যমে তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
আরও পড়ুন: স্থানীয় সরকার বিভাগে বড় রদবদল, ২৭ জেলায় নতুন উপ-পরিচালক
ফ্যামিলি কার্ড চালু করা বর্তমান বিএনপি সরকারের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। সরকার গঠনের পর প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে কর্মসূচিটি চালু করা হয়। পাইলট পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য পৃথক গাইডলাইনও করা হয়েছিল।
সেই পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এবার দেশের বড় পরিসরে কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে।
নতুন নীতিমালায় প্রায় ২ কোটি নারী পরিবার প্রধানকে জিটুপি পদ্ধতিতে নগদ সহায়তার আওতায় আনার পাশাপাশি প্রকৃত দরিদ্র পরিবার শনাক্ত, একই ব্যক্তির একাধিক সরকারি সুবিধা গ্রহণ বন্ধ, আয় ও সম্পদ যাচাই এবং তথ্যের অসঙ্গতি শনাক্তে একটি সমন্বিত ডিজিটাল কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
