শাপলা চত্বর গণহত্যা
শেখ হাসিনাসহ পলাতকদের ফেরাতে ইন্টারপোলের রেড নোটিশের উদ্যোগ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বর গণহত্যার মামলাটিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত নিষ্পত্তির ঘোষণা দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম।
একই সঙ্গে মামলার পলাতক আসামি শেখ হাসিনা,সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) প্রসিকিউশন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব তথ্য জানান।
শেখ হাসিনাসহ পলাতক ৩০ আসামিকে হাজির হতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশের পর তিনি মামলার অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘এই মামলায় ১১ জন আসামি বর্তমানে জেলে আছেন এবং ৩০ জন পলাতক। আমরা সকল মামলাকেই প্রাধান্য দিই, তবে শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের মামলাটিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যত দ্রুত সম্ভব শেষ করার চেষ্টা করব। এটি জনগণের দাবি এবং মানুষের সেন্টিমেন্টের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আমরা এই উদ্যোগ নিয়েছি।’
২০১৩ সালের ৫ মের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার প্রচার করেছিল যে তারা (হেফাজত কর্মীরা) রঙ মেখে অভিনয় করেছে। অথচ সেদিন ৬১ জন আলেম-ওলামা ও নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। বিগত সরকার মিথ্যা প্রচারণা দিয়ে এই বিচারকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছে। যেভাবে মানুষ সাগর-রুনি হত্যার বিচার চায়, তেমনি শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের বিচারও এ দেশের মানুষের একটি গণদাবি।’
আরো পড়ুন: পে-স্কেলের খসড়া বিজি প্রেসে, দ্রুত প্রজ্ঞাপন
পলাতক আসামিদের ধরতে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া প্রসঙ্গে আমিনুল ইসলাম বলেন, `আমরা ইতিমধ্যে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ব্যবস্থা করেছি। অন্যান্য আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করা গেলে তাদের বিরুদ্ধেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দিল্লিতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং ভারত সরকার তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আশ্রয় দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে তাকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি হবে কূটনৈতিক পর্যায়ের। বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে তাকে হস্তান্তরের জন্য ভারতকে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে। অন্যান্য আসামিরা হয়তো বিদেশে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে আছেন, কিন্তু শেখ হাসিনার বিষয়টি ভিন্ন। রাষ্ট্র যেভাবে তাকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে, ট্রাইব্যুনালের আপাতত এর বাইরে কিছু করার নেই।’
আসামিপক্ষের আইনজীবীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আসামিপক্ষ এখনই নথিপত্র বা জবানবন্দির কপি পাবেন না। পলাতক আসামিদের হাজির হওয়ার জন্য পেপার পাবলিকেশনের প্রক্রিয়া চলছে। মামলাটি যখন বিচারের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হবে এবং চার্জ গঠনের সময় আসবে, তখন আইন অনুযায়ী আসামিপক্ষকে সব কাগজপত্র সরবরাহ করা হবে। বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে আমরা অফিশিয়ালি সব কপি জমা দিয়ে দিয়েছি।’
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, যদি পেপার পাবলিকেশনের পরেও আসামিরা হাজির না হয়, তবে তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার কার্যক্রম শুরু হবে এবং ট্রাইব্যুনাল তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় আইনজীবী নিয়োগ করবেন।
এর আগে গত ২৭ জুলাই এ মামলার অভিযোগ আমলে নিয়ে পলাতকদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। আজ শেখ হাসিনাসহ ৩০ আসামিকে হাজির হতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
আরো পড়ুন: নাটোরে হোমিও চিকিৎসককে কুপিয়ে হত্যা
শেখ হাসিনা ছাড়া এ মামলার অন্য পলাতক আসামিরা হলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন মাহমুদ, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার।
পলাতক পুলিশ ও সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী ও বেনজীর আহমেদ; তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, তৎকালীন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান, মাহবুব হোসেন ও মনিরুল ইসলাম।
অন্যান্য পলাতক কর্মকর্তাদের মধ্যে আছেন তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (সদর দফতর) মো. আনোয়ার হোসেন, ডিসি (ট্রাফিক-দক্ষিণ) আশরাফুজ্জামান, এডিসি (মতিঝিল) এস এম মেহেদী হাসান, সাবেক ডিআইজি হারুন-অর-রশীদ, বিপ্লব কুমার সরকার ও সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল) মো. আসাদুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম শিবলী নোমান এবং তৎকালীন মতিঝিল থানার ওসি বিএম ফরমান আলী।
মামলার অভিযোগে ৫ মে শাপলা চত্বরে ৩২ জন এবং ৬ মে ঢাকার বাইরে আরও ২০ জনসহ মোট ৫২ জনের বেশি মানুষকে হত্যার তথ্য আনা হয়েছে। তবে প্রসিকিউটরের বক্তব্যে এদিন নিহতের সংখ্যা ৬১ জন বলে উল্লেখ করা হয়।
