বিএনপি ও সরকারের তিন পদে মির্জা ফখরুলের সম্ভাব্য উত্তরসূরি কারা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৭ পিএম
মির্জা ফখরুল। ফাইল ছবি
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভা শেষে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেন বলে জানা গেছে।
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র আজ বিকেলের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে তিনি বিএনপির মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রাথমিক সদস্যসহ দলীয় সব পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। মন্ত্রিসভা থেকেও তাঁর পদত্যাগের কথা রয়েছে।
সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তিনি রাষ্ট্রপতি হলে একই সঙ্গে দল ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদে পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি তাঁর ঠাকুরগাঁও-১ সংসদীয় আসনটিও শূন্য হবে।
কে হচ্ছেন বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব?
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদ মহাসচিবের দায়িত্ব কে নেবেন, তা নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত কয়েক দিনে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে তিন নেতার নাম বেশি আলোচনায় এসেছে।
তাঁরা হলেন— দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
আরও পড়ুন: মন্ত্রিত্ব থেকে মির্জা ফখরুলের পদত্যাগ
দলীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, জাতীয় কাউন্সিলের আগে বা কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে বিএনপি আপাতত একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগ করতে পারে। পরে জাতীয় কাউন্সিল কিংবা এর কাছাকাছি সময়ে মহাসচিব পদে স্থায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
রুহুল কবির রিজভী এবার সংসদ নির্বাচন করেননি এবং তাঁকে মন্ত্রিসভাতেও রাখা হয়নি। এ কারণে মহাসচিব পদ শূন্য হলে তাঁকেই ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন দলের অনেক নেতা।
বিএনপির অতীত রীতিতেও এর নজির রয়েছে। মির্জা ফখরুল একসময় দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন। পরে তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি ভারমুক্ত হয়ে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হন।
তবে দলের একটি অংশ স্থায়ী কমিটির কোনো সদস্যকে মহাসচিব করার পক্ষে। সে ক্ষেত্রে সালাহউদ্দিন আহমদ ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নাম সামনে আসছে। যদিও তাঁরা দুজনই বর্তমানে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। ফলে তাঁদের কাউকে মহাসচিব করা হবে কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
মন্ত্রণালয়েও আসতে পারে পরিবর্তন
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তাঁর বর্তমান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে কে আসবেন, সেটিও এখন আলোচনায়। মন্ত্রণালয়ে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, নাকি বর্তমান মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হবে—এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকেল চারটা পর্যন্ত প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় নির্ধারিত রয়েছে। এরপর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে। ১৮ আগস্ট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। প্রত্যাহারের পর একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট সংসদের সভাকক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। জাতীয় সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে কে?
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে সংবিধান অনুযায়ী তাঁর ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) আসনটি শূন্য হবে। এরপর নির্বাচন কমিশন ওই আসনে উপনির্বাচনের আয়োজন করবে।
আরও পড়ুন: ইসিতে মনোনয়ন জমা দিলো জামায়াত জোট
এখন থেকেই সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে স্থানীয় বিএনপিতে আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলের বড় মেয়ে ড. শামারুহ মির্জার নামও আলোচনায় রয়েছে। তিনি গত নির্বাচনে বাবার পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে সক্রিয় ছিলেন। পেশায় চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও গবেষক শামারুহ দীর্ঘদিন অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন। সেখানে সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমীনের নামও আলোচনায় রয়েছে। তিনি এর আগে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন। স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় এই নেতা মির্জা ফখরুলের ভাই।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে সাংবিধানিক বিষয়
গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত মো. সাহাবুদ্দিন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলটির কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ। সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করতে হয়। রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর এবং কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার পর সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হয়ে যায়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মন্ত্রিত্বেও থাকা সম্ভব নয়। ফলে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তাঁর সংসদীয় আসন, মন্ত্রিত্ব এবং বিএনপির মহাসচিবসহ দলীয় পদগুলোতে নতুন করে দায়িত্ব বণ্টন করতে হবে।
সব মিলিয়ে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন শুধু দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন, সেই প্রশ্নেরই উত্তর দিচ্ছে না; একই সঙ্গে বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব, তাঁর মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন নিয়েও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করছে।
