চলনবিলে থই থই পানি, বেড়েছে ডিঙি নৌকার কদর
মো. মাজেম আলী মলিন, গুরুদাসপুর (নাটোর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বর্ষার অবিরাম বৃষ্টিতে চলনবিল যেন আবার ফিরে পেয়েছে তার চিরচেনা প্রাণ। যত দূর চোখ যায়, বিস্তীর্ণ বিলজুড়ে থইথই পানি, বাতাসে ঢেউয়ের মৃদু দোলা, আর সেই জলরাশির বুকে ভেসে চলা কাঠের ডিঙি নৌকা— প্রকৃতি যেন নিজেই এঁকেছে বাংলার চিরায়ত এক জলরঙের ছবি। বহুদিনের সঙ্গী এই ডিঙি এখন শুধু যাতায়াতের বাহন নয়, বরং চলনবিলের মানুষের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি ও বর্ষার অনিবার্য অনুষঙ্গ হয়ে আবারও ফিরে এসেছে।
বর্ষার নতুন পানিতে নদী, খাল ও বিল ভরে উঠতেই বদলে গেছে জনজীবনের চিত্র। কোথাও কোথাও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় গ্রামীণ সড়ক ডুবে গেছে পানির নিচে। ফলে নৌকাই হয়ে উঠেছে মানুষের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য যাতায়াতের মাধ্যম। একই সঙ্গে শুরু হয়েছে নতুন পানিতে মাছ ধরার মৌসুম। তাই জেলে, কৃষক ও সাধারণ মানুষের প্রয়োজন মেটাতে হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে কাঠের ডিঙি নৌকার চাহিদা।
এই বাড়তি চাহিদার প্রভাব পড়েছে নাটোরের গুরুদাসপুরসহ চলনবিল অঞ্চলের নৌকা তৈরির কারখানাগুলোতে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কারিগরদের হাতুড়ির টুংটাং শব্দে মুখর হয়ে উঠছে কর্মশালা। কাঠ কাটা, নৌকার গা বাঁকানো, পেরেক বসানো আর প্লেনসিট লাগানোর কাজে ব্যস্ত সময় কাটছে তাঁদের।
চাহিদা মেটাতে চলনবিল অধ্যুষিত নাটোরের গুরুদাসপুর ও সিংড়া, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ এবং পাবনার চাটমোহর উপজেলার বিভিন্ন কারখানায় পুরোদমে চলছে নৌকা নির্মাণ। এর মধ্যে গুরুদাসপুর দীর্ঘদিন ধরেই ডিঙি নৌকার অন্যতম বড় মোকাম হিসেবে পরিচিত। ভৌগোলিক সুবিধা ও কাঠের সহজলভ্যতার কারণে এখানে গড়ে উঠেছে অন্তত ১৫ থেকে ২০টি নৌকা তৈরির কারখানা।
প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার গুরুদাসপুর পৌর শহরের ঐতিহ্যবাহী চাঁচকৈড় হাটে বসে ডিঙি নৌকার বড় বাজার। চলনবিলের বিভিন্ন উপজেলা থেকে ক্রেতারা এখানে এসে পছন্দমতো নৌকা কিনে নিয়ে যান। হাটের একপাশে সারি সারি সাজানো নতুন নৌকা যেন বর্ষা উৎসবেরই এক অনন্য দৃশ্য
সরেজমিনে দেখা গেছে, শিমুল, মেহগনি, কাঁঠাল, আম, বট ও নিমগাছের কাঠ দিয়ে তৈরি হচ্ছে এসব নৌকা। প্রতিটি নৌকা তৈরিতে প্রয়োজন হয় দক্ষ হাতের নিপুণ কারুকাজ। কারও হাতে করাত, কারও হাতে হাতুড়ি, আবার কেউ মনোযোগ দিয়ে নৌকার তলায় প্লেনসিট বসাচ্ছেন। প্রতিটি আঘাত যেন কাঠের গায়ে নয়, বরং চলনবিলের মানুষের জীবন সংগ্রামের গল্পই লিখে দিচ্ছে।
কারখানার সামনে তৈরি নৌকাগুলো সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ক্রেতারা নৌকার গঠন, কাঠের মান ও আকার দেখে দরদাম করে কিনছেন। বর্তমানে সাধারণ কাঠের ডিঙি নৌকা বিক্রি হচ্ছে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকায়। আর প্লেনসিট সংযুক্ত উন্নতমানের নৌকার দাম ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা।
কারখানা মালিক শামীম, ইয়ারুল, জাহাঙ্গীর হোসেন ও আব্দুর রাজ্জাক জানান, কাঠ, লোহা ও কারিগরদের মজুরিসহ প্রায় সব ধরনের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এতে লাভের পরিমাণ কমে গেলেও বর্ষা মৌসুমের চাহিদা পূরণে তারা নিরলসভাবে নৌকা তৈরি করে যাচ্ছেন।
কারিগর আফজল ও শরীফ বলেন, গত বছর চলনবিলে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় নৌকার বাজার ছিল অনেকটাই মন্দা। কিন্তু এবার পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় প্রতিদিন দুটি করে নৌকা তৈরি করছেন তাঁরা। প্রতিটি নৌকা তৈরির জন্য মজুরি পাচ্ছেন এক হাজার টাকা।
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার হামকুরিয়া গ্রামের আসাদ মাঝি এবং পাবনার চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়াল এলাকার দেদার ফকির জানান, কৃষিকাজে এখন তেমন ব্যস্ততা নেই। বর্ষার মৌসুমে মাছ ধরেই তাঁদের সংসারের বড় অংশের খরচ চলে। তাই নতুন পানিতে মাছ ধরার জন্য তাঁরা নতুন ডিঙি নৌকা কিনতে এসেছেন। তাঁদের ভাষায়, বর্ষা এলেই চলনবিলের শত শত পরিবার নৌকা আর জালের ওপর ভর করেই জীবিকার নতুন আশায় বুক বাঁধে।
গুরুদাসপুর উপজেলা ফার্নিচার পট্টি মালিক সমিতির সভাপতি শামীম বলেন, “এখানে উন্নতমানের কাঠ ও দক্ষ কারিগরের মাধ্যমে ডিঙি নৌকা তৈরি করা হয়। প্রতি নৌকার জন্য হাটে মাত্র ২০০ টাকা খাজনা নেওয়া হয়। মালিক সমিতি নিজেই বাজারের ব্যবস্থাপনা করে, তাই কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হয় না।”
বর্ষার জল যেমন চলনবিলের প্রকৃতিকে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে দেয়, তেমনি প্রাণ ফিরে পায় এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকাও। আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক কিছু বদলে গেলেও চলনবিলের বুকে ভেসে চলা কাঠের ডিঙি আজও হারিয়ে যায়নি। বরং বর্ষার প্রতিটি ঢেউয়ের সঙ্গে নতুন করে জেগে ওঠে বাংলার ঐতিহ্য, মানুষের সংগ্রাম আর প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের এক অনন্ত গল্প।
