সচিবসহ ৮ কর্মকর্তাকে নোটিশ
চলনবিলের নৌপথে বাধা হতে পারে এলজিইডির নির্মানাধীন ব্রিজ
চাটমোহর (পাবনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২২ পিএম
পাবনার চাটমোহরে কাটা নদীর ওপর চলছে ব্রিজ নির্মাণের কাজ। ছবি: ভোরের কাগজ
দেশের সর্ববৃহৎ বিলাঞ্চল চলনবিল। বর্ষায় বিস্তীর্ণ এই বিল হয়ে ওঠে নদী-খাল ও জলপথের বিশাল নেটওয়ার্ক। কৃষিপণ্য পরিবহন, মাছ ধরা, মানুষের যাতায়াত থেকে শুরু করে পর্যটন সব ক্ষেত্রেই এখানকার নৌপথের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কিন্তু পাবনার চাটমোহর উপজেলার কাটা নদীর ওপর নির্মাণাধীন একটি ব্রিজের উচ্চতা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের জোর অভিযোগ, ব্রিজটি নিচু হওয়ায় বর্ষায় বড় নৌকা ও পণ্যবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কাটা নদীর ওপর নির্মাণাধীন ব্রিজটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে এরই মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, ব্রিজ নির্মাণ হোক, তবে এমন উচ্চতায় নির্মাণ করতে হবে যাতে সারা বছর নৌযান চলাচল স্বাভাবিক থাকে। নৌপথ বন্ধ করে কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে ব্রিজের নির্মাণকাজ স্থগিত রেখে নকশা পর্যালোচনা ও উচ্চতা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট ৮ জন কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আব্দুল লতিফ। গত ১০ আগস্ট তিনি স্থানীয় সরকার সচিব, পানি সম্পদ সচিব, এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী, বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান, পাবনা জেলা প্রশাসক ও চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের এ নোটিশ দেন।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বোয়িং বিমান কিনবে বাংলাদেশ
জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বৃহত্তর পাবনা ও বগুড়া জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২ এর আওতায় ছাইকোলা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে হান্ডিয়াল ইউনিয়ন পরিষদ অফিস সড়কের মুনিয়াদিঘী কৃষি কলেজের কাছে কাটা নদীর ওপর ব্রিজটি নির্মাণ করা হচ্ছে। ৮৮ দশমিক ১০ মিটার দীর্ঘ পিএসবি গার্ডার ব্রিজটির নির্মাণ ব্যয় ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার বেশি। কাজটি বাস্তবায়ন করছে আইসিএল প্রাইভেট লিমিটেড ওসি (জেভি)।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্রিজের নিচ দিয়ে পর্যাপ্ত উচ্চতার নৌপথ রাখা হচ্ছে না। বর্ষায় পানি বাড়লে ছৈওয়ালা নৌকা, খড় বোঝাই নৌকা, বাল্কহেড, পণ্যবাহী ট্রলার এবং পর্যটকবাহী বড় নৌযান ব্রিজের নিচ দিয়ে চলাচল করতে পারবে না। চলনবিল শুধু একটি জলাভূমি নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ জলরাশি, বর্ষাকালে বিলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে প্লাবিত হলে অনেক গ্রামের মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে নৌকা। কৃষকরা ধান, খড়সহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য নৌপথে হাট-বাজারে নিয়ে যান। একইভাবে বালু-পাথর, গবাদিপশুর খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যও নৌযানে পরিবহন করা হয়।
এ ছাড়া চলনবিলের বিভিন্ন প্রান্তে বর্ষাকালে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ে। বড় নৌকা ও ট্রলারে করে পর্যটকেরা বিলের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। ফলে এখানকার নৌপথ শুধু স্থানীয় যোগাযোগের মাধ্যম নয়, পর্যটন অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, কাটা নদীর ওপর নিচু ব্রিজ নির্মাণ করা হলে একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে। এর প্রভাব শুধু নৌযান চলাচলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা ইলিয়াস উদ্দিন বলেন, এ অঞ্চলের কৃষকরা মাঠের ধান ও গবাদিপশুর খাবার খড় নৌকায় করে বিভিন্ন হাট-বাজারে নিয়ে যান। বিশেষ করে খড় বোঝাই নৌকা তুলনামূলক উঁচু হয়। ব্রিজের উচ্চতা কম হলে এসব নৌকা আর চলাচল করতে পারবে না। তখন সড়কপথে পণ্য পরিবহন করতে হবে, এতে কৃষকদের খরচ বেড়ে যাবে।
নৌকার মাঝি নবীর উদ্দিন বলেন, বর্ষায় কাটা নদী দিয়ে নাটোরের সিংড়া, সিরাজগঞ্জের তাড়াশসহ চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় নৌকায় যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করা হয়। নৌপথে চলাচল করলে সময় ও খরচ দুটোই কম লাগে। কিন্তু ব্রিজটি নিচু হলে পানির উচ্চতা বাড়ার পর বড় নৌকা চলাচল করতে পারবে না।
হান্ডিয়ালের বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, তারা ব্রিজ নির্মাণের বিপক্ষে নন। বরং দীর্ঘদিন ধরেই এই এলাকায় একটি ব্রিজের প্রয়োজন ছিল। নদীর ওপারে থাকা ফসলি জমি থেকে উৎপাদিত পণ্য আনা-নেওয়া এবং আশপাশের গ্রামের মানুষের যাতায়াত সহজ করতে ব্রিজটি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে তিনি বলেন, বর্ষায় নৌকায় চলাচল করা গেলেও পানি নেমে গেলে কাদা মাটির রাস্তা দিয়ে রোগী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ হয়। তাই সড়ক যোগাযোগের জন্য ব্রিজটি প্রয়োজন। কিন্তু সেই ব্রিজ নির্মাণ করতে গিয়ে নৌপথ বন্ধ করে দেওয়া হলে তা হবে এক ধরনের নতুন সংকট।
নোটিশদাতা আইনজীবী মো. আব্দুল লতিফ বলেন, এলাকার সন্তান হিসেবে নাগরিক দায়িত্ব থেকেই তিনি নোটিশটি দিয়েছেন। তার মতে, ব্রিজটি এমনভাবে নির্মাণ করা উচিত যাতে সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নৌ যোগাযোগও বজায় থাকে। দ্রুত নকশা সংশোধন না হলে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাইড ইঞ্জিনিয়ার হৃদয় হোসেন বলেন, অনুমোদিত নকশা অনুযায়ীই ব্রিজের কাজ চলছে। নির্মাণের পর দুই বছর ব্রিজটি নজরদারির মধ্যে থাকবে। ভবিষ্যতে নৌযান চলাচলে সমস্যা হলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্রিজের উচ্চতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুসা নাসের চৌধুরী বলেন, “এলজিইডির উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি দল ইতোমধ্যে সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এ বিষয়ে আমিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। এরপরও প্রয়োজন হলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করতে পুনরায় সরেজমিনে পরিদর্শন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের চেষ্টা করা হবে।”
এ বিষয়ে পাবনা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, “কাটা নদীর এ অংশটি বিআইডব্লিউটিএর স্বীকৃত কোনো নৌ চ্যানেল নয়। এলজিইডির নির্ধারিত পরিমাপ ও নীতিমালা অনুসরণ করেই ব্রিজটি নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের দাবির বিষয়টি আমরা বিবেচনায় রেখেছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন মনে করলে পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
