ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত কলম্বিয়া, নিহত বেড়ে ১৩২
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৪ এএম
ছবি : সংগৃহীত
কলম্বিয়ায় ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩২ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৫৭০ জন। স্থানীয় সময় সোমবার (১০ আগস্ট) আঘাত হানা ভূমিকম্পটির পর দেশটির বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক আফটারশক অনুভূত হয়েছে।
ভূমিকম্পে কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি শহরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বহু ভবন ধসে পড়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শত শত স্থাপনা। নিরাপত্তাজনিত কারণে কয়েকটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অনেক মানুষ আটকা বা নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধারকাজে প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতির সংকটও দেখা দিয়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলম্বিয়ায় আঘাত হানা এই ভূমিকম্পকে শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। দেশটির কলম্বিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যাপিটাল সিটিজ হতাহতের তথ্য জানিয়েছে। ভূমিকম্পের পর প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলাবিষয়ক বৈঠকেও সংগঠনটির প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তাদের তথ্য অনুযায়ী, শুধু পেরেইরা শহরেই ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দেশটির পাঁচটি রাজধানী শহরে সর্বোচ্চ সতর্কতা বা রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ৮৬টি ভবন ধসে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে সাতটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্যালি, পেরেইরা, কুইবদো ও মানিজালেস। ভূমিকম্পের কম্পন প্রতিবেশী ইকুয়েডর ও পানামাতেও অনুভূত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল চোকো অঞ্চলের সান হোসে দেল পালমার এলাকায়। রাজধানী বোগোতা থেকে এলাকাটি প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পশ্চিমে। ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০৭ কিলোমিটার গভীরে ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হয়।
আরও পড়ুন: ভারতে আবারও ছাত্র আন্দোলন, এবার উত্তাল ঝাড়খণ্ড
ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ২১টি আফটারশক অনুভূত হয়েছে। দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর ক্যালিতে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও উদ্ধার অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। স্বেচ্ছাসেবকেরা মানবশৃঙ্খল তৈরি করে কংক্রিটের বড় টুকরো ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ সরানোর চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ক্যালিতে অন্তত ২০টি ভবন ধসে পড়েছে এবং আরও ৩৮০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে বেশ কয়েকজন আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, ভবন ধসে পড়ার সময় পুরো শহরজুড়ে ধুলার মেঘ দেখা যায়। তার ভাষায়, এত শক্তিশালী ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা তিনি আগে কখনও পাননি। অন্যদিকে উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া এক স্বেচ্ছাসেবক জানান, একটি ভবন ধসে পড়ার শব্দ বোমা বিস্ফোরণের মতো মনে হয়েছিল। তিনি বলেন, উদ্ধারকাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে ভারী যন্ত্রপাতি প্রয়োজন।
নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা শপথ নেওয়ার মাত্র কয়েক দিন পরই এই ভূমিকম্প আঘাত হানায় এটি তার সরকারের জন্য প্রথম বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সময় দুপুর ১টার দিকে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন।
আরও পড়ুন: ভারতে মুসলিমদের ওপর সহিংসতা, ৭ মাসে নিহত ৪৪
প্রেসিডেন্ট বলেন, মানুষের জীবন রক্ষা, ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে সরকার তার সব সক্ষমতা কাজে লাগাচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধার করাকে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বলেও জানান তিনি।
প্রাথমিক হিসাবে প্রেসিডেন্ট জানিয়েছিলেন, ভূমিকম্পে ১১১ জন নিহত ও ৮৭ জন আহত হয়েছেন। পরে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৩২ এবং আহতের সংখ্যা ৫৭০ জনে পৌঁছায়।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কফি উৎপাদন অঞ্চল হিসেবে পরিচিত রিসারালদা এলাকায় অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। ওই অঞ্চলের রাজধানী পেরেইরাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ধসে পড়া ভবনগুলোর ধ্বংসস্তূপে জীবিতদের সন্ধানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ভায়া দেল কাউকা অঞ্চলে অন্তত ২৭ জন নিহত হয়েছেন। এই অঞ্চলেই ক্যালি শহরের অবস্থান। নিহতদের মধ্যে তিন শিশুও রয়েছে।
আরও পড়ুন: কলম্বিয়ায় ৭.৪ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প
ভূমিকম্পের পর পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পেরেইরা, মানিজালেস, কুইবদো, আরমেনিয়া, কার্তাগো ও বুয়েনাভেনতুরা বিমানবন্দর রয়েছে। এসব স্থাপনার কাঠামোগত নিরাপত্তা পরীক্ষা করছেন প্রকৌশলীরা।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় ভূমিকম্পপ্রবণ ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলের ওপর অবস্থান হওয়ায় কলম্বিয়ায় ছোট মাত্রার ভূমিকম্প প্রায়ই অনুভূত হয়। স্থানীয়ভাবে এসব কম্পন ‘তেমব্লোরেস’ নামে পরিচিত। তবে ৬ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প দেশটিতে তুলনামূলকভাবে বিরল।
এর আগে ১৯৯৯ সালে আরমেনিয়া শহরের কাছে ৬ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পে এক হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন। কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার দাবি, সোমবারের ভূমিকম্পটি একবিংশ শতাব্দীতে দেশটিতে রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।
