×

টিপস

আয়ুর্বেদ শুধু চিকিৎসা নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা

Icon

মো. ইব্রাহীম খলিল মোল্লা

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ০৯:৩৬ পিএম

আয়ুর্বেদ শুধু চিকিৎসা নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা

ছবি: এআই নির্মিত

বাংলাদেশে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার বিস্তার যত বেড়েছে, ততই মানুষের ভরসার জায়গা হিসেবে আবারও আলোচনায় এসেছে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা। কারণ মানুষ এখন শুধু রোগের ওষুধ খুঁজছে না, খুঁজছে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার উপায়। দীর্ঘদিন ধরে চলা গ্যাস্ট্রিক, ডায়াবেটিস, চর্মরোগ, বাতব্যথা, অনিদ্রা, হরমোনজনিত সমস্যা কিংবা মানসিক অস্থিরতায় ভোগা অসংখ্য মানুষ আজ বিকল্প নয়, বরং পরিপূর্ণ চিকিৎসা ধারণা হিসেবে আয়ুর্বেদের দিকে ঝুঁকছেন।

অথচ আমাদের সমাজে এখনো একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে আয়ুর্বেদ মানেই শুধু গাছগাছড়া বা লোকজ চিকিৎসা। বাস্তবতা হলো, আয়ুর্বেদ পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসাপদ্ধতি, যার মূল ভিত্তি মানুষকে সামগ্রিকভাবে সুস্থ রাখা।

‘আয়ুর্বেদ’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ভাষা থেকে। ‘আয়ু’ অর্থ জীবন এবং ‘বেদ’ অর্থ জ্ঞান বা বিজ্ঞান। অর্থাৎ আয়ুর্বেদ হলো জীবনের বিজ্ঞান। প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো এই চিকিৎসাব্যবস্থা শুধু রোগ সারানোর জন্য তৈরি হয়নি; বরং মানুষের শরীর, মন, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন, ঘুম, পরিবেশ ও মানসিক অবস্থার মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা নিশ্চিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য।

আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা যেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ের পর ওষুধ প্রয়োগে গুরুত্ব দেয়, সেখানে আয়ুর্বেদ রোগ সৃষ্টির মূল কারণ খুঁজে বের করতে চেষ্টা করে। একজন রোগীর শরীরের প্রকৃতি, খাদ্যাভ্যাস, দৈনন্দিন জীবন, মানসিক চাপ, ঘুমের ধরন এমনকি ঋতু পরিবর্তনের প্রভাবও এখানে বিবেচনায় নেওয়া হয়। এ কারণেই একই রোগে আক্রান্ত দুই ব্যক্তির চিকিৎসাপদ্ধতি এক নাও হতে পারে। আয়ুর্বেদের এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসাধারাই একে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।

আয়ুর্বেদের মূল ভিত্তি হলো ত্রিদোষ তত্ত্ব। বাত, পিত্ত ও কফ এই তিনটি দোষের ভারসাম্যের ওপর মানুষের সুস্থতা নির্ভর করে। যখন এই ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখনই শরীরে রোগ সৃষ্টি হয়। আয়ুর্বেদ সেই ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করে। অনেকেই এটিকে কেবল তাত্ত্বিক ধারণা মনে করলেও বাস্তবে খাদ্যাভ্যাস, হজমশক্তি, শারীরিক গঠন, মানসিক আচরণ ও রোগপ্রবণতার সঙ্গে এই তত্ত্বের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো-বর্তমানে ব্যবহৃত বহু এলোপ্যাথিক ওষুধের মূল উপাদান এসেছে উদ্ভিদ ও প্রাকৃতিক উৎস থেকে, যেগুলোর ব্যবহার হাজার বছর আগে থেকেই আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় প্রচলিত ছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্যথানাশক অ্যাসপিরিন তৈরির ধারণা এসেছে উইলো গাছের ছাল থেকে, হৃদরোগে ব্যবহৃত ডিজিটালিস উদ্ভিদজাত উপাদান থেকে তৈরি, আবার ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু গুরুত্বপূর্ণ ওষুধও উদ্ভিদভিত্তিক গবেষণা থেকেই আবিষ্কৃত হয়েছে। আয়ুর্বেদে ব্যবহৃত হলুদ, নিম, অশ্বগন্ধা, তুলসী, ঘৃতকুমারী কিংবা বাসকের মতো বহু ভেষজ উপাদান নিয়ে আজ বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণাগারে আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা চলছে। অর্থাৎ আধুনিক ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের একটি বড় অংশের ভিত্তিই হলো প্রকৃতি ও ভেষজ জ্ঞান, যা প্রাচীন চিকিৎসাব্যবস্থাগুলোর অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। পার্থক্য শুধু প্রয়োগ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে। আধুনিক চিকিৎসা সেই উপাদানগুলোকে রাসায়নিক বিশ্লেষণ, পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট মাত্রায় ওষুধে রূপান্তর করেছে।

বর্তমান সময়ে মানুষ দ্রুত ফল চায়। ফলে অ্যান্টিবায়োটিক, ব্যথানাশক কিংবা স্টেরয়েডনির্ভর চিকিৎসার ব্যবহার বাড়ছে। এতে তাৎক্ষণিক উপকার মিললেও দীর্ঘমেয়াদে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। কিডনি জটিলতা, লিভারের সমস্যা, গ্যাস্ট্রিক আলসার, অনিদ্রা কিংবা হরমোনের ভারসাম্যহীনতার মতো সমস্যা এখন অনেক সাধারণ হয়ে উঠেছে। সেখানে আয়ুর্বেদ ধীরে হলেও শরীরের ভেতরের ভারসাম্য পুনর্গঠনের মাধ্যমে কাজ করে। তাই অনেক দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রোগে মানুষ আয়ুর্বেদে স্থায়ী স্বস্তি খুঁজে পান।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাব্যবস্থার গুরুত্ব নিয়ে কাজ করছে। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আয়ুর্বেদ নিয়ে গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এমনকি উন্নত দেশগুলোতেও এখন হারবাল ও ন্যাচারাল মেডিসিনের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। কারণ মানুষ বুঝতে শুরু করেছে, সুস্থতা শুধু রোগ না থাকার নাম নয়; বরং শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক প্রশান্তির সমন্বিত অবস্থাই প্রকৃত সুস্থতা।

বাংলাদেশেও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার সম্ভাবনা অত্যন্ত বড়। আমাদের দেশে প্রাকৃতিক ভেষজ সম্পদের অভাব নেই। গ্রামবাংলার বহু গাছগাছড়া, ভেষজ উদ্ভিদ ও প্রাকৃতিক উপাদান যুগ যুগ ধরে চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই খাত এখনো যথাযথ রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব পায়নি। প্রয়োজনীয় গবেষণা, মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা দেশের স্বাস্থ্যখাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে, আয়ুর্বেদ আধুনিক চিকিৎসার প্রতিপক্ষ নয়। বরং এটি একটি পরিপূরক ও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাব্যবস্থা। জরুরি অস্ত্রোপচার, দুর্ঘটনা বা সংকটময় পরিস্থিতিতে আধুনিক চিকিৎসার বিকল্প নেই। আবার দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসুরক্ষা, রোগ প্রতিরোধ, জীবনযাত্রার ভারসাম্য ও প্রাকৃতিক নিরাময়ের ক্ষেত্রে আয়ুর্বেদের গুরুত্বও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দুটি ব্যবস্থার সমন্বিত প্রয়োগই মানুষের জন্য আরও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারে।

বর্তমান সমাজে ভেজাল, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ, রাতজাগা জীবন ও প্রযুক্তিনির্ভর স্থবিরতার কারণে মানুষ অল্প বয়সেই নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় আয়ুর্বেদের জীবনধারাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। নিয়মিত ঘুম, সুষম খাদ্য, শরীরচর্চা, মানসিক প্রশান্তি ও প্রাকৃতিক জীবনযাপনের যে শিক্ষা আয়ুর্বেদ দেয়, তা কেবল রোগ কমায় না; মানুষকে সুস্থ জীবনের পথও দেখায়।

আয়ুর্বেদকে কুসংস্কার বা অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা বলে অবহেলা করার আগে এর ইতিহাস, দর্শন, গবেষণা ও বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে জানার প্রয়োজন রয়েছে। হাজার বছরের অভিজ্ঞতা, প্রাকৃতিক উপাদানের ব্যবহার এবং মানুষকেন্দ্রিক চিকিৎসাদর্শন আয়ুর্বেদকে আজও প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে। একই সঙ্গে এটিও বাস্তব সত্য যে আধুনিক এলোপ্যাথিক চিকিৎসাব্যবস্থার বহু ওষুধের উৎপত্তি প্রকৃতি ও ভেষজ উৎসভিত্তিক গবেষণা থেকে। তাই সময় এসেছে আয়ুর্বেদকে শুধুই বিকল্প চিকিৎসা হিসেবে নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা ও মানবকল্যাণমূলক চিকিৎসাবিজ্ঞান হিসেবে মূল্যায়ন করার।

লেখক: মো. ইব্রাহীম খলিল মোল্লা, সাংবাদিক ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ভেনিজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পের ৮৫ ঘণ্টা পর দুই শিশু জীবিত উদ্ধার

ভেনিজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পের ৮৫ ঘণ্টা পর দুই শিশু জীবিত উদ্ধার

গোল্ডেন বুটের দৌড়েও এগিয়ে মেসি

গোল্ডেন বুটের দৌড়েও এগিয়ে মেসি

জুলাই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড একক কেউ নন

বিরোধীদলীয় নেতা জুলাই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড একক কেউ নন

আর্জেন্টিনা-জর্ডানের খেলা দেখতে উট বিক্রি

আর্জেন্টিনা-জর্ডানের খেলা দেখতে উট বিক্রি

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App