×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

থার্ড আই

বঙ্গভবনের চিঠি : রাজনৈতিক দাবার চালচিত্র

Icon

ঝর্ণা মনি

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গভবনের চিঠি : রাজনৈতিক দাবার চালচিত্র

মহান মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহীদের রক্তে কেনা বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে চাইলে তাকে স্পিকারের কাছে লিখিত ও স্বাক্ষরযুক্ত চিঠি জমা দিতে হয়। এটি একটি আপাত সরল আইনি প্রক্রিয়া মনে হলেও, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপ্রধানের পদত্যাগের ঘটনাগুলো কখনই সাধারণ ছিল না। বরং প্রতিটি পদত্যাগের পেছনে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক দাবা খেলা, গণ-আকাক্সক্ষা কিংবা ক্ষমতার মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের দীর্ঘ ইতিহাস।

বাংলাদেশের শুরুর দিকের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ অনেক সময় পর্দার আড়ালের সামরিক ও রাজনৈতিক সমীকরণের পাশা খেলা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দেশের সবচেয়ে স্বল্প সময়ের জন্য বঙ্গভবনের বাসিন্দা ছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ৩ নভেম্বর জেলহত্যার পর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটলে ৬ নভেম্বর মাত্র ৮৩ দিনের মাথায় পদ ছাড়তে বাধ্য হন খন্দকার। খন্দকার মোশতাক আহমদের পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। কিন্তু সামরিক শাসন চলাকালীন এক জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনিও পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। যদিও সরকারিভাবে তার পদত্যাগের কারণ হিসেবে ‘অসুস্থতা’ দেখানো হয়েছিল, তবে ইতিহাস গবেষকদের মতে এটি ছিল তৎকালীন সামরিক ও বেসামরিক ক্ষমতার ভারসাম্যেরই একটি অংশ।

অন্যদিকে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে স্বৈরাচারবিরোধী তীব্র গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি ছিল একটি নিরপেক্ষ নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই সংকট দূর করতে তখন রাজনৈতিক দলগুলো এক অভিনব আইনি পথ বেছে নেয়। ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ বা প্রয়োজনীয়তার নীতি মেনে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে প্রথমে উপ-রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ দেয়া হয়। এরপর এইচ এম এরশাদ তার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন।

আর ২০০২ সালে অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটের। কোনো রাজপথের আন্দোলন নয়, বরং ক্ষমতাসীন দলের নিজস্ব রাজনৈতিক চাপ ও সংসদীয় অনাস্থার মুখে পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন বি চৌধুরী।

বিএনপি-জামায়াতের জোট সরকারের আমলে অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দীন আহম্মেদকেও রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে কম জল ঘোলা হয়নি। পরে তাকে প্রধান উপদেষ্টাও করা হয়েছিল।

আবার ভিন্ন কারণেও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের নজির রয়েছে দেশে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরে ব্যক্তিগত কারণে এবং বিদেশে বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছিলেন প্রথম নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। এছাড়া ১৯৯১ সালে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে তার পূর্ব শর্তানুযায়ী প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যাওয়ার লক্ষ্যে পদত্যাগ করেন বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ।

২.

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপ্রধান সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, তবে পদটি মূলত আলংকারিক। দেশের নির্বাহী ক্ষমতা মূলত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের হাতেই। সংবিধানের ৪৮(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপ্রধান দেশের অন্য সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া তার স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মাত্র দুটি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি কোনো পরামর্শ ছাড়া সম্পূর্ণ একক সিদ্ধান্তে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন- সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়া এবং দেশের প্রধান বিচারপতিকে সরাসরি নিয়োগ দেয়া।

সাধারণ ক্ষমতা ও কার্যাবলির মধ্যে রয়েছে- সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি যে কোনো দণ্ডিত ব্যক্তির সাজা মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করতে পারেন। জাতীয় সংসদে কোনো বিল পাস হওয়ার পর তা রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য পাঠানো হয়। তিনি চাইলে বিলটি পুনর্বিবেচনার জন্য একবার সংসদে ফেরত পাঠাতে পারেন। তবে সংসদ পুনরায় বিলটি পাস করলে তিনি তাতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য থাকেন। সরকারের শাসন বিভাগীয় সমস্ত সিদ্ধান্ত ও নির্বাহী কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির নামেই সম্পাদিত হয়। এছাড়া সংবিধানের ৪৮(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি চাইলে রাষ্ট্রীয় বা পররাষ্ট্রনীতিসংক্রান্ত যে কোনো বিষয় মন্ত্রিসভায় আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করতে পারেন।

৩.

সম্প্রতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সাক্ষাৎকারে ঘোষণা দেন যে, আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। এই খবরের পর মাঠপর্যায়ে এবং রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। আর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মে মাসে সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থানকালে শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। সরকারের উচ্চমহল বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে নেয়নি।

গোপনে পুরনো যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছেন- এমন সন্দেহে সরকারের তরফ থেকে তাকে সরে দাঁড়ানোর বার্তা দেয়া হয় বলে গুঞ্জন রয়েছে। অবশ্য সাহাবুদ্দিন নিজে এই ফোনালাপের দাবিকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। অবশ্য ৫ আগস্টের পর সাবেক রাষ্ট্রপতির সঙ্গে শেখ হাসিনা কথা বলবেন, এটি মনে করারও খুব একটা কারণ নেই।

এদিকে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন নিজেও এর আগে (গত ডিসেম্বর ও ফেব্রুয়ারিতে) ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে নানা ঘটনা ও তার পোর্ট্রেট সরিয়ে ফেলার মতো বিষয়ে অপমানিত বোধ করেছেন। নতুন নির্বাচিত সরকার এলে পরিস্থিতি বুঝে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে পারেন। স¤প্রতি তার প্রেস সেক্রেটারি সারওয়ার আলমও জানিয়েছেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে রাষ্ট্রপতির পক্ষে দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে পড়েছে এবং তার বিশ্রাম প্রয়োজন।

সংবিধান অনুযায়ী, পদত্যাগপত্র স্পিকার বরাবর পাঠানোর মধ্য দিয়েই শেষ হবে বঙ্গবভনে সাহাবুদ্দিন অধ্যায়। দেশের ২২তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি তিন বছর তিন মাস এই ভবনে ছিলেন। সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে। তবে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণার পর রাজনৈতিক মাঠের নতুন সমীকরণ এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের অনড় অবস্থানের কারণেই রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের বিষয়টি এই মুহূর্তে টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে।

দেখা যাক, কে হচ্ছেন বঙ্গভবনের নতুন বাসিন্দা আর কাকে বরণ করতে প্রস্তুত হচ্ছে বঙ্গভবন।

ঝর্ণা মনি : কবি ও সাংবাদিক

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স খাদে, আহত এক

রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স খাদে, আহত এক

‘দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হবে’

‘দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হবে’

জ্বালানি সংকটে বন্ধ সার কারখানা, ক্ষতি ১৩৫ কোটি টাকা

জ্বালানি সংকটে বন্ধ সার কারখানা, ক্ষতি ১৩৫ কোটি টাকা

মালদ্বীপের সামরিক প্যারেডে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

মালদ্বীপের সামরিক প্যারেডে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App