সত্য ও ন্যায়ে মানুষের প্রকৃত পরিচয়
তৌফিক সুলতান
প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
মানুষকে চেনার সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো তার প্রকৃত চরিত্র। সুসময়, স্বার্থ কিংবা আবেগের মুহূর্তে অনেকেই ভালো মানুষের মুখোশ পরে থাকতে পারে। কিন্তু যখন সত্য, ন্যায় এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়, তখনই প্রকাশ পায় একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয়। যে ব্যক্তি আপন-পরের হিসাব না কষে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে পারে, ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতে পারে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে- সে-ই প্রকৃতার্থে বিবেকবান মানুষ।
আমাদের সমাজে একটি বড় সংকট হলো ব্যক্তিপূজা ও সম্পর্ককেন্দ্রিক বিচার। কোনো ব্যক্তি যদি আমাদের আত্মীয়, বন্ধু, রাজনৈতিক সহকর্মী, শিক্ষক, নেতা কিংবা পরিবারের সদস্য হন, তাহলে অনেক সময় তার ভুলকে আমরা ভুল বলতে চাই না; বরং বিভিন্ন অজুহাতে সেই অন্যায়কে আড়াল করার চেষ্টা করি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কেবল ন্যায়বিচার নয়, পুরো সমাজের নৈতিক ভিত্তি।
বাস্তবতা হলো, অপরাধের কোনো আত্মীয়তা নেই। দুর্নীতি, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার, সহিংসতা কিংবা অন্য যে কোনো অন্যায়- এসবের বিচার ব্যক্তি পরিচয়ের ভিত্তিতে হতে পারে না। আইন ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিতে সবাই সমান হওয়াই একটি সভ্য রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি। যদি প্রভাবশালী বা আপনজনের জন্য একধরনের বিচার এবং সাধারণ মানুষের জন্য আরেক ধরনের বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সমাজে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেসব জাতি সত্যকে গোপন করেছে এবং আত্মীয়প্রীতিকে ন্যায়ের ওপরে স্থান দিয়েছে, তারা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংকটে পড়েছে। পক্ষপাত, স্বজনপ্রীতি ও অন্যায়ের প্রশ্রয় একটি জাতির প্রশাসন, শিক্ষা, অর্থনীতি এবং বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়। অন্যদিকে যেসব সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে উন্নয়ন, শান্তি ও জনগণের আস্থা তুলনামূলকভাবে বেশি দৃঢ় হয়েছে।
ইসলামের শিক্ষাতেও ন্যায়বিচারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিজের, পিতা-মাতা বা নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধেও সত্য সাক্ষ্য দিতে হবে। এই শিক্ষা কেবল ধর্মীয় নির্দেশ নয়; এটি মানবসভ্যতার একটি সর্বজনীন নৈতিক আদর্শ। একইভাবে বিশ্বের প্রায় সব গণতান্ত্রিক সংবিধান, মানবাধিকার ঘোষণা এবং আধুনিক বিচারব্যবস্থা আইনের দৃষ্টিতে সব মানুষের সমতার কথা বলে।
অনেক সময় দেখা যায়, কোনো ব্যক্তির অসততা, দুর্নীতি বা অনৈতিক আচরণের প্রমাণ স্পষ্ট হওয়ার পরও তার অনুসারীরা সত্যকে অস্বীকার করেন। কারণ তারা মনে করেন, সত্য স্বীকার করলে সম্পর্ক নষ্ট হবে, দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে বা ব্যক্তিগত সুবিধা হারাতে হবে। কিন্তু এ ধরনের অবস্থান প্রকৃতপক্ষে অন্যায়কে আরো শক্তিশালী করে এবং ভবিষ্যতে বড় ক্ষতির পথ তৈরি করে। সত্যকে অস্বীকার করা মানে বাস্তবতাকে বদলে দেয়া নয়; বরং নিজের বিবেককে দুর্বল করে দেয়া।
একটি পরিবারেও একই নীতি প্রযোজ্য। সন্তান ভুল করলে তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা যেমন দায়িত্ব, তেমনি পিতা-মাতা, ভাইবোন বা আত্মীয় অন্যায় করলে সেটিকে অন্যায় বলার নৈতিক সাহসও থাকতে হবে। অন্ধ সমর্থন কখনো ভালোবাসার পরিচয় নয়; বরং ভুলকে প্রশ্রয় দেয়ার মাধ্যমে প্রিয় মানুষকেই আরো বড় বিপদের দিকে ঠেলে দেয়া। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে গুজব, বিভ্রান্তি এবং অন্ধ পক্ষপাত আরো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাই কোনো ঘটনার সত্যতা যাচাই না করে কেবল সম্পর্ক, রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত আবেগের কারণে পক্ষ নেয়া সমাজের জন্য ক্ষতিকর। দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিত তথ্য যাচাই করা, যুক্তিকে গুরুত্ব দেয়া এবং ন্যায়ের প্রশ্নে নিরপেক্ষ থাকা।
সত্যের পথে চলা কখনো সহজ নয়। এতে সম্পর্কের টানাপড়েন, সমালোচনা কিংবা সাময়িক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সত্য ও ন্যায়ের অবস্থানই ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সত্যবাদী ও ন্যায়পরায়ণ মানুষদেরই সম্মান দিয়েছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন মানুষের মহত্ত্ব তার ক্ষমতা, সম্পদ কিংবা জনপ্রিয়তায় নয়; বরং তার ন্যায়পরায়ণতা, সততা এবং সত্যকে গ্রহণ করার সাহসে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সত্য ও ন্যায় তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সম্পর্ক মানুষকে কাছাকাছি আনে, আর সত্য ও ন্যায় একটি সভ্য সমাজকে টিকিয়ে রাখে।
শেষকথা হলো- প্রকৃত মানুষ সেই, যে নিজের প্রিয়জনের অন্যায়কেও অন্যায় বলতে পারে, সত্যকে কখনো সম্পর্কের কাছে বিকিয়ে দেয় না এবং বিবেকের নির্দেশনাকেই জীবনের সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে।
তৌফিক সুলতান : প্রভাষক, ব্রেভ জুবিলেন্ট স্কলার্স অব মনোহরদী মডেল কলেজ, নরসিংদী।
