×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

ফাংশনাল ড্রিংক : বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনা

Icon

ড. শহীদুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ফাংশনাল ড্রিংক : বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনা

বর্তমান বিশ্বে খাদ্য ও পানীয় শিল্পে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। একসময় মানুষ পানীয় নির্বাচন করত মূলত স্বাদ, দাম এবং সহজলভ্যতার ভিত্তিতে। কিন্তু এখন বিশ্বজুড়ে ভোক্তাদের চিন্তাভাবনায় বড় পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক মানুষ শুধু তৃষ্ণা মেটাতে পানীয় খুঁজছে না; তারা এমন পানীয় চাইছে যা শরীরকে সুস্থ রাখবে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবে, শক্তি দেবে, মানসিক চাপ কমাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ভালো জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। এই পরিবর্তিত জীবনধারা ও স্বাস্থ্য সচেতনতার ফলেই বিশ্বব্যাপী দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘ফাংশনাল ড্রিংক’ বা কার্যকরী পানীয়।

ফাংশনাল ড্রিংক বলতে এমন পানীয়কে বোঝায়, যা সাধারণ পুষ্টির বাইরে অতিরিক্ত স্বাস্থ্য উপকারিতা প্রদান করে। সাধারণ কোমল পানীয় যেখানে মূলত স্বাদ ও বিনোদনের জন্য তৈরি হয়, সেখানে কার্যকরী পানীয়ের লক্ষ্য হলো শরীরের নির্দিষ্ট কিছু কার্যক্রমে সহায়তা করা। এসব পানীয়ে সাধারণত ভিটামিন, মিনারেল, প্রোবায়োটিক, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভেষজ উপাদান, প্রোটিন, ইলেকট্রোলাইট বা প্রাকৃতিক নির্যাস যোগ করা হয়। বর্তমানে হলুদ পানীয়, আদার শরবত, কম্বুচা, প্রোবায়োটিক ড্রিংক, প্রোটিন শেক, হারবাল চা, ভিটামিন ওয়াটার, ইলেকট্রোলাইট ড্রিংক এবং বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ পানীয় বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

তবে কার্যকরী পানীয়ের ধারণা একেবারে আধুনিক নয়। মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ভেষজ পানীয় দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। দক্ষিণ এশিয়ায় হলুদ, দুধ, আদা চা, তুলসি পানীয় কিংবা লেবু-মধুর শরবত বহু পুরনো ঐতিহ্য। চীনে জিনসেং ও হারবাল চা, জাপানে ফারমেন্টেড পানীয়, মধ্যপ্রাচ্যে খেজুরভিত্তিক পানীয় এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাকৃতিক টনিকের ব্যবহার শত শত বছরের পুরনো। অর্থাৎ আধুনিক ফাংশনাল ড্রিংক শিল্প মূলত ঐতিহ্যবাহী স্বাস্থ্যজ্ঞান ও আধুনিক খাদ্যপ্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি একটি নতুন বাণিজ্যিক রূপ।

বিশ্ববাজারে ফাংশনাল ড্রিংকের জনপ্রিয়তা গত এক দশকে বিস্ময়কর হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক ফাংশনাল বেভারেজ বাজারের আকার প্রায় ১৫০ থেকে ১৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। কিছু গবেষণায় আবার এই বাজারকে ২৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় হিসাব করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৮ লাখ কোটি থেকে ৩০ লাখ কোটি টাকারও বেশি। এই বিশাল বাজার প্রমাণ করে যে, কার্যকরী পানীয় এখন আর ক্ষুদ্র কোনো স্বাস্থ্যপণ্য নয়; বরং এটি বৈশ্বিক খাদ্য ও পানীয় শিল্পের অন্যতম প্রধান খাতে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র এই বাজারের সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে আছে। দেশটিতে ফিটনেস সংস্কৃতি, জিম-নির্ভর জীবনধারা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির কারণে কার্যকরী পানীয়ের চাহিদা দ্রুত বেড়েছে। সেখানে এনার্জি ড্রিংক, প্রোটিন ড্রিংক, ইলেকট্রোলাইট ওয়াটার, গাট-হেলথ সোডা, কোলাজেন ড্রিংক এবং মাশরুম কফি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এখন পানীয়কে ‘লাইফস্টাইল পণ্য’ হিসেবেও দেখছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার ও ফিটনেস বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যপানীয়কে জনপ্রিয় করে তুলছেন।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে কার্যকরী পানীয়ের বাজার কিছুটা ভিন্নভাবে বিকশিত হয়েছে। সেখানে মানুষ এখন মানসিক সুস্থতা, স্ট্রেস কমানো, ভালো ঘুম এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য নিয়ে বেশি সচেতন। ফলে কম্বুচা, প্রোবায়োটিক পানীয়, অ্যাডাপ্টোজেন ড্রিংক এবং কম চিনিযুক্ত ভেষজ পানীয় দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। ইউরোপীয় ভোক্তারা পণ্যের স্বাস্থ্য উপকারিতার পাশাপাশি এর উপাদান, উৎপাদন পদ্ধতি এবং পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কেও সচেতন। ফলে অর্গানিক ও পরিবেশবান্ধব কার্যকরী পানীয়ের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয় কার্যকরী উপাদানের মধ্যে রয়েছে হলুদ, আদা, গ্রিন টি, অ্যাপল সাইডার ভিনেগার, প্রোবায়োটিক, কোলাজেন এবং বিভিন্ন ভেষজ নির্যাস। হলুদে থাকা কারকিউমিন প্রদাহ কমাতে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করতে পারে বলে ধারণা করা হয়। আদা হজমে সহায়তা, বমিভাব কমানো এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে গ্রিন টি ও প্রোবায়োটিক অন্ত্রের স্বাস্থ্য ও বিপাকক্রিয়া উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, অনেক বাণিজ্যিক কার্যকরী পানীয়ে এসব উপাদানের পরিমাণ খুব কম থাকে এবং অনেক সময় অতিরঞ্জিত স্বাস্থ্য দাবি করা হয়। ফলে এসব পানীয়কে কখনই ওষুধের বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এগুলোকে একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার সহায়ক অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

বাংলাদেশে ফাংশনাল ড্রিংকের বাজার এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও এর সম্ভাবনা অত্যন্ত বড়। বর্তমানে দেশীয় বাজারে আদার পানীয়, হারবাল শরবত, অ্যালোভেরা ড্রিংক, ভিটামিনসমৃদ্ধ পানীয় এবং বিভিন্ন ভেষজ পানীয় দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাও তুলসি, মধু-লেবু, তেঁতুল, তোকমা, ডাবের পানি, আমলকি ও লেমনগ্রাসভিত্তিক নতুন ধরনের পানীয় নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। যদিও এই খাত এখনো সংগঠিত নয়, তবে ভবিষ্যতে এটি একটি বড় শিল্পে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো স্থানীয় কাঁচামাল ও কৃষিভিত্তিক সম্পদ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহজেই হলুদ, আদা, তেঁতুল, কালোজিরা, ডাব, মধু, আমলকি, লেবু ও বিভিন্ন ভেষজ উপাদান উৎপাদিত হয়। এসব উপাদান শুধু কম খরচে পাওয়া যায় না, বরং মানুষের কাছে ঐতিহ্যগতভাবেও পরিচিত। ফলে বিদেশি ধারণা নকল না করে বাংলাদেশ নিজস্ব সংস্কৃতি ও স্বাদের ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী ফাংশনাল ড্রিংক শিল্প গড়ে তুলতে পারে।

বর্তমানে বাংলাদেশের কার্যকরী পানীয় বাজারের আকার আনুমানিক ১৫০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি থেকে ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। যদিও এই বাজার এখনো ছোট, তবে আগামী কয়েক বছরে এর দ্রুত বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ শহরাঞ্চলে স্বাস্থ্য-সচেতনতা দ্রুত বাড়ছে। তরুণ প্রজন্ম এখন ফিটনেস, ডায়েট ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যের প্রতি আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহী। ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগ বৃদ্ধিও মানুষকে স্বাস্থ্যকর পানীয়ের দিকে আকৃষ্ট করছে।

তবে বাংলাদেশের বাজারে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্য। দেশের অধিকাংশ ভোক্তা এখনো পানীয় কেনার ক্ষেত্রে স্বাদ ও দামকে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে উচ্চমূল্যের বিদেশি স্বাস্থ্যপানীয় সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হওয়া কঠিন। অনেক আমদানিকৃত কার্যকরী পানীয়ের দাম এত বেশি যে, তা কেবল সীমিত উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। বাংলাদেশের মতো মূল্যসংবেদনশীল বাজারে সফল হতে হলে কার্যকরী পানীয়কে অবশ্যই সাশ্রয়ী হতে হবে।

এই সমস্যা সমাধানে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে স্থানীয় উপাদান ব্যবহার করে কম খরচে উৎপাদন। দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করলে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং আমদানিনির্ভরতা হ্রাস পাবে। পাশাপাশি ছোট প্যাকেট ও কম মূল্যের ট্রায়াল সংস্করণ বাজারে আনা যেতে পারে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজে এসব পণ্য ব্যবহার করে দেখতে পারেন। বাংলাদেশের বাজারে ২০ থেকে ৩০ টাকার মধ্যে স্বাস্থ্যসম্মত পানীয় তৈরি করা গেলে তা ব্যাপক জনপ্রিয় হতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাদ। অনেক কার্যকরী পানীয় ‘অতিরিক্ত স্বাস্থ্যকর’ হওয়ার কারণে স্বাদে আকর্ষণ হারায়। কিন্তু বাংলাদেশের ভোক্তারা পরিচিত ও সুস্বাদু স্বাদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট। ফলে আম-হলুদ, লেবু-আদা, তেঁতুল-ইলেকট্রোলাইট, মধু-লেমনগ্রাস কিংবা ডাবভিত্তিক পানীয় বাজারে বেশি সফল হতে পারে। অর্থাৎ কার্যকরী উপকারিতার পাশাপাশি পানীয়কে সুস্বাদু ও সহজে গ্রহণযোগ্য করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভোক্তার আস্থা অর্জনও এই শিল্পের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক মানুষ এখনো স্বাস্থ্য দাবি নিয়ে সন্দিহান। তাই শুধুমাত্র বিজ্ঞাপন নয়, বরং চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ, ফিটনেস বিশেষজ্ঞ ও সচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বাজার তৈরি করতে হবে। অতিরিক্ত বৈজ্ঞানিক ভাষা ব্যবহার না করে প্রাকৃতিক, ঐতিহ্যবাহী ও দৈনন্দিন সুস্থতার বার্তা দিলে সাধারণ মানুষ সহজে তা গ্রহণ করতে পারবেন।

ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যদি গবেষণা, মান নিয়ন্ত্রণ, ব্র্যান্ডিং এবং আধুনিক বিপণনের দিকে গুরুত্ব দেয়, তবে এই খাত আন্তর্জাতিক বাজারেও বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় ঐতিহ্যভিত্তিক পানীয় বিদেশি বাজারে আলাদা পরিচিতি পেতে পারে। বিশ্ববাজারে এখন মানুষ প্রাকৃতিক, হারবাল ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যসম্পন্ন পণ্য খুঁজছে। বাংলাদেশ সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, ফাংশনাল ড্রিংক এখন আর সাময়িক কোনো বৈশ্বিক ট্রেন্ড নয়; এটি ভবিষ্যতের পানীয় শিল্পের অন্যতম প্রধান ধারা। বিশ্বজুড়ে মানুষ এখন স্বাস্থ্য, স্বাদ ও সুবিধাকে একসঙ্গে চাইছে। বাংলাদেশ যদি নিজস্ব ঐতিহ্য, স্থানীয় উপাদান এবং সাশ্রয়ী মূল্যকে গুরুত্ব দিয়ে এই খাতকে এগিয়ে নিতে পারে, তবে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বড় সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা, গবেষণা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কার্যকরী পানীয় উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হতে পারে।

ড. শহীদুল ইসলাম : খাদ্য বিজ্ঞানী, যুক্তরাজ্য।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স খাদে, আহত এক

রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স খাদে, আহত এক

‘দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হবে’

‘দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হবে’

জ্বালানি সংকটে বন্ধ সার কারখানা, ক্ষতি ১৩৫ কোটি টাকা

জ্বালানি সংকটে বন্ধ সার কারখানা, ক্ষতি ১৩৫ কোটি টাকা

মালদ্বীপের সামরিক প্যারেডে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

মালদ্বীপের সামরিক প্যারেডে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App