×

প্রথম পাতা

খ্রিস্টান রাষ্ট্র বানানোর চক্রান্ত!

Icon

অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য

প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

খ্রিস্টান রাষ্ট্র বানানোর চক্রান্ত!

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের একটি অংশ নিয়ে পূর্ব তিমুরের মতো খ্রিষ্টান দেশ বানানোর চক্রান্ত প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া অভিযোগে বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। হঠাৎ করেই সরকারপ্রধান কেন এমন অভিযোগ তুললেন - তা নিয়ে জনমনে বেড়েছে কৌতূহল। এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের জের ধরে বাংলাদেশের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের দুদলের গৃহদাহ চরমে উঠেছে। তারা পাল্টাপাল্টি বিবৃতি পর্যন্ত দিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, মিয়ানমারের কিছু অংশ, ভারতের মনিপুর ও মিজোরাম মিলিয়ে একটি দেশ গঠনের পরিকল্পনা ১৯৮০ র দশকের সময় থেকেই শুরু হয়েছিল। বর্তমানে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের কারণে এই প্রক্রিয়া ফের শুরু করেছে একটি মহল। তবে এই প্রক্রিয়ায় একটি খ্রিস্টার রাষ্ট্র বানানোর ধারণা বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করেন তারা।

জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) সাদেক ভোরের কাগজকে বলেন, নিঃসন্দেহে একটি মুভমেন্ট আছে দেখেই প্রধানমন্ত্রী মন্তব্যটি করেছেন। তিনি বলেন, এই মুভমেন্ট আগে থেকেই ছিল। এই চক্রান্তে শুধু বাংলাদেশ নয়; মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের মনিপুর এবং মিজোরামও জুড়ে দেয়ার অপচেষ্টা রয়েছে। সেক্ষেত্রে ভারত কি তার দুই প্রদেশ মনিপুর এবং মিজোরামকে নতুন দেশের জন্য ছেড়ে দেবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুরো সীমান্ত অঞ্চলজুড়েই খ্রিস্টান দেশ গঠনের মুভমেন্ট আছে। তবে নতুন দেশের সীমান্ত কী হবে তা তো এখন বলা যাবে না। এর বেশি কিছু বলা যাবে না। একটি মুভমেন্ট আছে- শুধু এটুকুই জেনে রাখেন।

প্রসঙ্গত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র পূর্ব তিমুর। ইন্দোনেশিয়ার তিমুর দ্বীপের পূর্বাঞ্চলীয় এই অংশটি ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগালের উপনিবেশ ছিল। সে সময় এর নাম ছিল পর্তুগিজ তিমুর। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে তারা স্বাধীনতা ঘোষণা করে। তবে এর ৯ দিনের মধ্যেই ইন্দোনেশিয়া পূর্ব তিমুর দখল করে নেয়। ইন্দোনেশিয়ার ২৭তম প্রদেশ ঘোষণা করা হয় একে। এরপর কয়েক দশক ধরে ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনীর সঙ্গে পূর্ব তিমুরের বিচ্ছিন্নতাবাদী কয়েকটি গ্রুপের লড়াই চলে। ২০০২ সালের ২০ মে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে পূর্ব তিমুর। মূলত জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানেই স্বাধীনতা লাভ করে দেশটি। পূর্ব তিমুরে অবস্থান করছে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী। এশিয়ার দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি পূর্ব তিমুর। বিদেশি সহায়তার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। খরাপ্রবণ দেশটির অবকাঠামো খুব একটা উন্নত নয়। উপকূল থেকে কিছুটা দূরে তেল ও গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়ায় দেখা দিয়েছে নতুন সম্ভাবনা।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের একটি অংশ নিয়ে পূর্ব তিমুরের মতো খ্রিষ্টান দেশ বানানোর চক্রান্ত চলছে বলে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না জানতে চেয়েছেন, কে বা কারা এমন প্রস্তাব দিয়েছে? গত ২৫ মে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক কর্মসূচিতে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, দেশের এবং সরকারের অবস্থা যখন খারাপ তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেন্ট মার্টিনের মতো রাখাইন আর পার্বত্য চট্টগ্রাম মিলিয়ে খ্রিষ্টান রাজ্য বানানোর প্রস্তাব পেয়েছেন বলে নতুন কাহিনী শুরু করেছেন।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী আগেও বেশ কয়েকবার এসব কথা বলেছেন। এবার একটু স্পষ্ট করছেন। তার কাছে নিশ্চয়ই তথ্য আছে, নাহলে তো বলতেন না।

বিশ্লেষণে জানা গেছে, বাংলাদেশের যে অংশ ভেঙে খ্রিস্টান দেশে সংযুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে- মূলত সেখানে খ্রিস্টান জনজাতি প্রায় নেই। মিয়ানমার, ভারতের মিজোরাম ও মনিপুরে খ্রিস্টান জনসংখ্যা বেশি। কিন্তু ভারত কী চাইবে তার প্রদেশদুটো অন্যের হাতে ছেড়ে যেতে। বিশ্লেষকরা বলেছেন, আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠনের নামে মূলত মিয়ানমারে গণ্ডগোল দীর্ঘস্থায়ী করিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন না ঠেকানো অন্যতম একটি কারণ হতে পারে। পাশাপাশি মিয়ানমারে এখন যেসব বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী রয়েছে তারা চীনের স্বার্থে কাজ করছে। তারা মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর সঙ্গে না থেকে চীনের সহায়তায় দেশটিতে ফেডারেল সরকার গঠন করতে চায়। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে থাইল্যান্ডের একটি প্রভাব আছে বলে জানা গেছে। থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনওয়াত্রার সঙ্গে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা একটি বৈঠক করেছেন। পরে থাকসিন সিনওয়াত্রার নেতৃত্বে মালয়েশিয়ায় আরেকটি বৈঠক হয়। যেখানে আসিয়ানের বর্তমান চেয়ারম্যান লাউস, আগামীর চেয়ারম্যান ইন্দোনেশিয়া এবং সঙ্গে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কূটনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, সেই বৈঠকের পরই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে যেটুকু গতি ছিল তাও হারিয়ে যায়। প্রত্যাবাসনের কথা জানতে চাইলে উল্টো বাংলাদেশকে বলা হয়, মিয়ানমার টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে আর তোমরা (বাংলাদেশ) রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কথা বলছ। বিষয়টির ব্যাখা দিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ভারতের মতো প্রাদেশিক সরকারের মাধ্যমে মিয়ানমারের রাষ্ট্র পরিচালনার পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ গণতন্ত্রের মোড়কে ফেডারেল সরকার থাকবে। এই সরকারে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে মিয়ানমারের নেত্রী অং সাং সুচির দলও যুক্ত থাকবে। তিনি বলেন, এই নিয়ে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের ওপরে চীনও চাপ দিচ্ছে। আর্মিকে সরিয়ে সেখানে গণতান্ত্রিক সরকার বসাতে চায় তারা এবং এই সরকারের নাম হবে ফেডারেল সরকার। এই কারণে আরাকানে ভারতীয় প্রজেক্টেরও আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। তবে যারা অস্ত্র উঠিয়েছে তারা মিয়ানমারে স্বাধীনতা চায় না, স্বায়ত্তশাসন চায়।

জানতে চাইলে কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমসের মবিন চৌধুরী ভোরের কাগজকে বলেন, খ্রিস্টান জনজাতি ভারতের মনিপুর ও মিজোরামে বেশি। ভারত কী চাইবে তাদের কোলঘেঁষে আরেকটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র হোক। সব মিলিয়ে কী হবে এবং কী হচ্ছে- গোটা বিষয়েই বাংলাদেশের কড়া নজর রাখা দরকার বলে মনে করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, গত ২৩ মে গণভবনে ১৪ দলের বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে বাংলাদেশের একটা অংশ নিয়ে খ্রিস্টান রাষ্ট্র বানানোর চক্রান্ত চলছে বলে জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিন বলেছিলেন, ফিলিস্তিনের মতো বাংলাদেশের একটা অংশ চট্টগ্রাম, মিয়ানমার নিয়ে খ্রিস্টান স্টেট (রাষ্ট্র) বানাবে। বে অফ বেঙ্গলে (বঙ্গপোসাগরে) একটা ঘাঁটি করবে। তার কারণ হচ্ছে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে প্রাচীন কাল থেকেই ব্যবসা বাণিজ্য চলে, আর এই জায়াগটাতে কোনো কন্ট্রোভার্সি নেই, কারো কোনো দ্ব›দ্ব নেই। বঙ্গোপসাগর ভারত মহাসাগরের ভেতরেই একটি উপসাগর, এটা প্রাচীন কাল থেকেই ব্যবহার হচ্ছে। এই জায়গাটার ওপর অনেকের নজর। এটা আমি হতে দিচ্ছি না, এটাও আমার একটা অপরাধ। যদিও একটা দেশকে দেখানো হয়, কিন্তু আমি তো জানি তারা কোথায় কোথায় হামলা চালাবে, সেটা তো আমি জানি। সে কারণে আমাদের কিছু সমস্যায় পড়তে হচ্ছে, পড়তে হবে জানি, কিন্তু আমি সেটা পাত্তা দেই না। দেশের মানুষ আমার শক্তি, মানুষ যদি ঠিক থাকে তাহলে আমরা আছি। দেশটার যে উন্নতি হচ্ছে সেটাও অনেকের পছন্দ না।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

শিল্পকলা প্রদর্শনী ‘অন্তর্লোকের সন্ধানে’ শুরু হচ্ছে বৃহস্পতিবার

শিল্পকলা প্রদর্শনী ‘অন্তর্লোকের সন্ধানে’ শুরু হচ্ছে বৃহস্পতিবার

বাংলাদেশের কাছে হারের কারণ জানালেন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক

বাংলাদেশের কাছে হারের কারণ জানালেন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক

আবারো কি এস আলমে ফিরতে পারে মালিকানা?

ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতে উত্তাল সংসদ আবারো কি এস আলমে ফিরতে পারে মালিকানা?

উত্তরায় ক্যাসিনো নির্মূলে সাঁড়াশি অভিযানে ডিএমপি

ফলোআপ উত্তরায় ক্যাসিনো নির্মূলে সাঁড়াশি অভিযানে ডিএমপি

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App