একটি বেডের অপেক্ষায় থেকে নিভছে কত প্রাণ
সেবিকা দেবনাথ
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) বেড সংকটের বিষয়টি নতুন নয়। অসুস্থ স্বজনের জন্য যখন আইসিইউ বেড প্রয়োজন হয়, তখন তা জোগাড় করতে কী পরিমাণ দুর্ভোগ পোহাতে হয়- তা ভুক্তভোগীরাই জানেন। হৃদরোগ, স্ট্রোক, সড়ক দুর্ঘটনা, নিউমোনিয়া, সেপসিস কিংবা জটিল অস্ত্রোপচারের পর অনেক রোগীর বেঁচে থাকার জন্য আইসিইউ অপরিহার্য হয়ে পড়ে। উপজেলা থেকে জেলা, জেলা থেকে রাজধানী, এরপরও এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতাল- স্বজনের জীবন বাঁচাতে সময়ের সঙ্গে চলে এক যুদ্ধ। সময়মতো আইসিইউ বেড পাওয়া মানে সোনার হরিণ পাওয়ার সামিল। যেকোনো মহামারি কিংবা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে সেই সংকট আরো বেশি স্পষ্ট হয়। ২০১৯ সালে ডেঙ্গুর ব্যাপকতা এবং ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সময় আইসিইউ বেডের সংকট কতটা, তা অনেকটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি হামের সংক্রমণ বাড়ায় এই সংকটের চিত্রটি আবারো সামনে আসে। বিশেষ করে রাজশাহীতে আইসিইউ ও ভেন্টিলেশন সেবা না পেয়ে ৩৩টি শিশু মৃত্যুর খবরটি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দৈন্যদশা আবারো প্রকাশ পায়। তবে কোভিডের পর কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হয় আইসিইউ অবকাঠামো। যেগুলোর কয়েকটি এখনো অচল অবস্থায় পড়ে আছে। দক্ষ জনবলের অভাবে তা সচল করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার অন্য দিকে বেড না পেয়ে প্রতিদিনই ঝরছে প্রাণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম বড় বৈষম্য হচ্ছে আইসিইউ সুবিধার ভৌগোলিক অসম বণ্টন। রাজধানী ও কয়েকটি বড় শহরে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সীমিতসংখ্যক আইসিইউ থাকলেও অধিকাংশ জেলা হাসপাতালে এই সুবিধা নেই। ফলে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের অনেক দূরে স্থানান্তর করতে হয়। চিকিৎসকদের মতে, এই স্থানান্তরের সময়ই অনেক রোগীর অবস্থা জটিল হয়ে পড়ে। ‘গোল্ডেন আওয়ার’ নামে পরিচিত চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হওয়ায় মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।
আইসিইউ মানে শুধু একটি বেড
নয় : অনেকের ধারণা, আইসিইউ সংকট মানে কেবল বেডের অভাব। বাস্তবে বিষয়টি আরো জটিল। একটি পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ পরিচালনার জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত ইনটেনসিভ কেয়ার বিশেষজ্ঞ, দক্ষ নার্স, ভেন্টিলেটর, মাল্টিপ্যারামিটার মনিটর, ইনফিউশন পাম্প, নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ, ২৪ ঘণ্টা ল্যাব ও ইমেজিং সুবিধা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল যন্ত্রপাতি কিনলেই আইসিইউ চালু করা যায় না। অনেক হাসপাতালে যন্ত্রপাতি থাকলেও প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে সেগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা যায় না। ফলে অবকাঠামো থাকলেও রোগী কাক্সিক্ষত সেবা পান না। দক্ষ জনবলই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক ক্রিটিক্যাল কেয়ার সোসাইটির গাইডলাইন অনুযায়ী, প্রতিটি আইসিইউ বেডের জন্য দিনে কমপক্ষে একজন করে নার্স থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সেই জনবল হাসপাতালগুলোতে নেই। অপারেশন ও আইসিইউ চালানোর জন্য দরকার কমপক্ষে ১০ হাজার শিক্ষক ও চিকিৎসকের। আছে প্রায় ২ হাজার ১শ জন। অ্যানাস্থেটিস্ট সংকটের কারণে নিয়মিত রুটিন অপারেশন করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। পদ আছে বিশেষজ্ঞ নেই। যার কারণে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে আইসিইউ ও অ্যানেসথেসিয়ার কার্যক্রম।
ব্যয়ও বড় বাধা : সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ বেড সীমিত হওয়ায় অনেক রোগীকে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হয়। সেখানে প্রতিদিনের চিকিৎসা ব্যয় বহু পরিবারের সাধ্যের বাইরে। ওষুধ, পরীক্ষা, ভেন্টিলেশন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্সিং সেবাসহ প্রতিদিনের খরচ দ্রুত বেড়ে যায়। ফলে অনেক পরিবার সঞ্চয় ভেঙে, ঋণ নিয়ে বা সম্পদ বিক্রি করে চিকিৎসা চালাতে বাধ্য হয়।
কোভিড থেকে কী শিক্ষা নিলাম? : ২০২০ সালে দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হলে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার অসংগতিগুলো প্রকট হয়। আইসিইউ, যন্ত্রপাতি ও জনবল না থাকারমতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সামনে আসে। জোড়াতালি দিয়ে করোনার সংক্রমণ সামাল দেয়ার পর সেই বিষয়গুলো আবারো চাপা পড়ে যায়। ২০২০ সালের ২৭ এপ্রিল ভিডিও কনফারেন্সে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি জেলায় একটি ভালো হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) স্থাপন করা হবে বলে জানান। ওই বছরের ২ জুন একনেক সভায় তিনি এ বিষয়ে নির্দেশ দেন। এরপর শুরু হয় তোড়জোড়। ওই বছরই এপ্রিলে বিশ্বব্যাংকের ঋণে ‘কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি)’ শীর্ষক প্রকল্প শুরু হয়। এই প্রকল্পের আওতায় টিকা কেনা, জেলা হাসপাতালগুলোতে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন, ১০ বেডের আইসিইউ ও ২০ বেডের আইসোলেশন ইউনিট স্থাপনের কথা। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ২৩ জেলায় আইসিইউ সেবা চালু হয়েছিল। জনবল সংকটে কিছু জেলায় আইসিইউ সেবা বন্ধ হয়ে যায়।
প্রকল্পের নথিতে দেখা যায়, ২০২০ সালে ৪৮ জেলায় হাসপাতালে ১০ বেডের আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করতে ৫১২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। সে হিসাবে একটি আইসিইউ প্রতিষ্ঠাপনে খরচ হয়েছে গড়ে ১০ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
সংকট এখনো প্রকট : গত ১ জুলাই বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের (বিএসসিসিএম) জাতীয় সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য আইসিইউ বেড রয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৭টি এবং সাধারণ হাসপাতাল বেড রয়েছে মাত্র ৯টি। ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৮টি জেলায় কোনো ধরনের আইসিইউ নেই। সেই জেলাগুলো হলো- গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর ও জয়পুরহাট, মেহেরপুর, নড়াইল, মাগুরা, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও পিরোজপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ী, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, নোয়াখালী, ফেনী, ল²ীপুর, পটুয়াখালী ও বরগুনা। এছাড়া দেশের মোট আইসিইউ বেডের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক।
ওই অনুষ্ঠানে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, আমাদের দেশের ৬৮ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করেন। কিন্তু আইসিইউ সেবাগুলো মূলত বড় শহরের হাসপাতালগুলোতে কেন্দ্রীভূত। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নবজাতক, অন্তঃসত্ত্বা মা, নিউমোনিয়া বা স্ট্রোকে আক্রান্ত বয়োবৃদ্ধ এবং সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তিরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে অকালেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। দেশে শুধু বেডের অভাবই নয়, রয়েছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক (যেমন-অ্যানাস্থেটিস্ট, কার্ডিওলজিস্ট, নিউরোলজিস্ট), দক্ষ নার্স ও বিশেষায়িত সরঞ্জামের তীব্র সংকট। সীমিত সামর্থ্যরে মধ্যেও এ পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য সঠিক পরিকল্পনা ও সংকল্প নেয়ার এবং প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
যা বলছে বিশেষজ্ঞরা : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা ভোরের কাগজকে বলেন, আইসিইউ স্থাপনের জন্য যে জনবল দরকার, আমাদের সেই জনবল নেই। টাকা দিয়ে আইসিইউ ইউনিট হয়তো স্থাপন করা হয়েছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল পাওয়া কঠিন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ জানান, আইসিইউ ইউনিট পুরোপুরি কার্যকর করার জন্য ৩টি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান দরকার। ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ বা স্ট্রাকচার তৈরি; প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং এটি পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত জনবলের সংস্থান। সরকার টাকা খরচ করে হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ করলেও নানা সংকটে অনেক বেড পড়ে আছে শুধু জনবল সংকট ও সমন্বয়হীনতার কারণে। আইসিইউ সেবা সচল রাখা গেলে বহু মানুষের জীবন রক্ষা হতো। দুঃখের বিষয়, সচল করা যাচ্ছে না। এতে একদিকে রোগীর ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবায় প্রভাব পড়ছে। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের উদ্যোগ নেয়া দরকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সৈয়দ আব্দুল হামিদ মনে করেন, স্বাস্থ্যসেবা একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম। এখানে শুধু বেড বা যন্ত্রপাতি থাকলেই চলে না; প্রয়োজন দক্ষ জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ, সরবরাহব্যবস্থা ও সমন্বিত প্রস্তুতি। বাংলাদেশে এই সমন্বয় বহুদিন ধরেই দুর্বল। কোভিড-পরবর্তী সময়ে অনেক আইসিইউ স্থাপন হলেও জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলোর বড় অংশ বাস্তবে কার্যকর নয়। ফলে কাগজে আইসিইউ আছে, কিন্তু রোগী সেবা পাচ্ছে না। সরকারি হাসপাতালে সেবা না পেয়ে রোগীরা বাধ্য হয় বেসরকারি খাতে যেতে, যেখানে চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। সংকটের সমাধান শুধু নতুন আইসিইউ বসানো নয়; বরং প্রয়োজন জবাবদিহিমূলক, মানবসম্পদনির্ভর ও বাস্তবভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যব্যবস্থা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান জানান, বর্তমান আইসিইউসংখ্যা দ্বিগুণ করলেও চাহিদা মিটবে না। তবে আইসিইউ সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, বৈশ্বিক সমস্যা। কোভিডের সময় উন্নত দেশেও এই সংকটে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, কোভিডের সময় ইআরপি প্রকল্পের আওতায় চালু হওয়া আইসিইউগুলো এখন সচল নেই। প্রকল্প শেষ হলে সেই জনবলকে সরাসরি স্থায়ী করার আইনি সুযোগ থাকে না। তাই ইউনিটগুলোকে আবার টেকসইভাবে সচল করতে নতুন পরিকল্পনা ও জনবলকাঠামো নিয়ে কাজ চলছে। তার দাবি, সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। এই পরিকল্পনায় যেখানে ভবন আছে সেখানে যন্ত্রপাতি সরবরাহ আর যেখানে যন্ত্রপাতি আছে সেখানে দক্ষ জনবল নিয়োগ- এই দুই দিকেই সমান জোর দেয়া হচ্ছে।
২০ জেলায় নতুন আইসিইউ চালুর পরিকল্পনা : সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, চিকিৎসাসেবার স¤প্রসারণে সরকার কাজ করছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ২০ জেলায় নতুন করে আইসিইউ চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাত গত ৫৬ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজেট পেয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় ২০টি সরকারি হাসপাতালে নতুন আইসিইউ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন ও অ্যানেস্থেসিওলজি পরস্পরের প্রতিযোগী নয়, বরং একে অন্যের পরিপূরক।
