ঘরে ঘরে জ্বরের রোগী, বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ
সেবিকা দেবনাথ
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
প্রায় ঘরেই এখন জ্বররে রোগী। এদিকে হাসপাতালে মিলছে সব বয়সী ডেঙ্গু রোগী। একই সঙ্গে হামের রোগীও আসছে সমান তালে। সাধারণ ভাইরাসজনিত জ¦র অনেক সময় হয়ে উঠছে দুশ্চিন্তার কারণ। এর মধ্যে শিশুরা জ্বরর আক্রান্ত হলে দুশ্চিন্তার শেষ নেই অভিভাবকদের।
বছরের শুরু থেকেই হাসপাতালে মিলছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী। আর প্রায় সাড়ে চার মাস ধরে চলতে থাকা হামের প্রকোপে অনেকেই বিভ্রান্তিতে পড়ছেন হাম ও ডেঙ্গুর লক্ষণ নিয়ে। এদিকে তীব্র শরীর ব্যথা, জ্বর নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় শিশু থেকে বৃদ্ধ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্ষার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। গত দুই সপ্তাহে বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি বাড়ার কথা জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু সংক্রমণের ৪/১০ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে উপসর্গ না থাকলেও, কারো হঠাৎ তীব্র জ্বর, অসহ্য মাথাব্যথা, চোখের পিছনে ব্যথা, পেশি ও অস্থিসন্ধিতে যন্ত্রণা, বমি, বমি বমি ভাব এবং ত্বকে র?্যাশ দেখা দেয়।
চলতি বছরে ডেঙ্গুতে হাসপাতাপলে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১৮ হাজার ৬৭৩ জন। আর মৃত্যু হয়েছে ৫৯ জনের। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে রোগী ১ হাজার ৮১ জন ও ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে রোগী ৪০৯ জন ও ২ জনের মৃত্যু; মার্চ ও এপ্রিল মাসে মৃত্যু শূন্য। মার্চে ভর্তি রোগী ছিল ৩৫৩ জন আর এপ্রিলে ৬৪০ জন। মে মাসে ১ জনের মৃত্যু আর ভর্তি রোগী ৭১৪ জন। জুন মাস থেকে হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও মৃতের সংখ্যা উভয়ই বাড়তে থাকে। এই মাসে এক লাফ রোগী পৌঁছে যায় প্রায় ৩ হাজারের কাছাকাছি। জুনে ভর্তি রোগী ছিল ২ হাজার ৯০৭ জন আর ১৩ জনের মৃত্যু হয়। জুলাই মাসে রোগী বেড়ে পৌঁছায় ৯ হাজার ২০৬ জনে। মৃতের সংখ্যা শুধু জুন মাস থেকে নয় গত ৬ মাসের চেয়ে মৃত্যু দ্বিগুণ বেড়ে পৌঁছে ৩৬ জনে। আগস্ট মাসের ৮ দিনে ৫ জনের মৃত্যু আর রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ৩৬৩ জন।
সাধারণত; প্রতিবছর ডেঙ্গুর যেকোনো এক বা দুটি ধরনের ব্যাপকতা দেখা যায়। রোগতত্ত্ববিদেরা জানান, ডেঙ্গুর চারটি ধরন : ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ এবং ডেন-৪। ডেঙ্গুর একটি ধরনে আক্রান্ত হলে সেই নির্দিষ্ট ধরনের প্রতিরোধক্ষমতা শরীরে গড়ে ওঠে, পরবর্তী সময়ে সেই ধরনটিতে মানুষ আর আক্রান্ত হয় না। তবে অন্য ধরনে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। এভাবে মোট ৪ বার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। প্রথমবার আক্রান্ত হওয়ার চেয়ে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলে রোগের তীব্রতা ও জটিলতা দুটিই বাড়ে।
ঢাকা শহরে বা দেশের অন্য জেলাগুলোতে কত মানুষ একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন বা হচ্ছেন, তার তথ্য সঠিকভাবে কারো জানা নেই। অন্যদিকে কোনো রোগীর পক্ষেও জানা সম্ভব হয় না যে অতীতে তিনি কোন ধরনের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত
হয়েছিলেন। তবে রোগতত্ত্ববিদেরা বলেন, এক বছর একটি ধরনের প্রাদুর্ভাব বেশি থাকলে এবং তারপর অন্য একটি ধরনের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা দিলে রোগের জটিলতা বেশি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
দেশে ডেঙ্গুর বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ২০০০ সালে। তবে ডেঙ্গুর ধরন বিশ্লেষণ শুরু হয় ২০১৩ সালে। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) তথ্য অনুযায়ী ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ডেন-১ ও ডেন-২ বেশি ছিল। দেশের ইতিহাসে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন ২০১৯ সালে। ওই বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন এক লাখের বেশি মানুষ। তখন ৯০ শতাংশ মানুষ ডেন-৩-এ আক্রান্ত হয়েছিলেন। ২০২২ সালে নমুনা বিশ্লেষণে প্রাধান্য ছিল ডেন-৩, ২০২৩ সালে ডেন-২ এবং ২০২৪ সালেও ডেন-২-এর প্রধান্য ছিল। ২০২৫ সালে ডেঙ্গু সেরোটাইপ ২ এবং ৩-এর প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। আর চলতি বছর ডেন-৩ দিয়ে সংক্রমণ বেশি ছড়াচ্ছে। সম্প্রতি আইইডিসিআর ৭১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে দেখেছে, ৬৫ জন বা ৯১ দশমিক ৫৫ শতাংশ রোগী ডিইএনভি-৩-এ আক্রান্ত। বাকি ৬ জন বা ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ আক্রান্ত ছিলেন ডিইএনভি-২-এ।
এদিকে জ¦রসহ ডেঙ্গুর অন্যান্য উপসর্গ থাকার পরও নমুনা পরীক্ষায় নেগেটিভ রিপোর্ট আসার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর অর্থাৎ জ¦র হবার ৩/৪ দিনের মধ্যে এনএস-১ পরীক্ষা করলে পজিটিভ হতে পারে। এরপর অর্থাৎ ৫/৬ দিন পর পরীক্ষা করলে নেগেটিভ আসে। সপ্তম দিনে আইজিএম পরীক্ষা করলে রিপোর্ট পজিটিভ আসবে। এর দুই দিন পর পরীক্ষা করলে নেগেটিভ আসবে। তখন আইজিপি পরীক্ষা করতে হবে। সবার সক্ষমতা এক নয়। তাই শরীরে ভাইরাস ঢুকলেও জ¦র পরে আসে। জ¦রের ৪, ৫ ও ৬ এই দিনগুলোকে বলা হয় ‘উইন্ডো পিরিয়ড’। এই সময়টাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবে রিপোর্ট নেগেটিভ হলেও ডেঙ্গুর লক্ষণ ও উপসর্গ থাকলে অবশ্যই চিকিৎসাসেবা নিতে হবে। উপসর্গ দেখে বাসায় থেকেই চিকিৎসা ব্যবস্থা নেয়া যায়, হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন নেই।
ভুল রিপোর্ট প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, স্বাভাবিকভাবে পরীক্ষায় ডেঙ্গু নেগেটিভ এলেও রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসককে অবশ্যই রোগীর লক্ষণ, রোগের ধরন দেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে হবে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু ভাইরাসের ধরন পাল্টে যাচ্ছে। তবে ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ হওয়ার প্রকৃত কারণ জানতে অবশ্যই গবেষণা করা প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ডেঙ্গুর অধিকাংশ মৃত্যুর জন্য অবহেলা দায়ী। রিপোর্ট নেগেটিভ হলেও ডেঙ্গুর লক্ষণ ও উপসর্গ ঠিকই থাকে। কিন্তু রিপোর্ট নেগেটিভ আসায় চিকিৎসক কিংবা হাসপাতালে যায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় নানা জটিলতা শুরু হয়। রোগীর অবস্থা বেশি খারাপের দিকে গেলে তখন তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে তার শরীরে ডেঙ্গু অনেকটা ক্ষতি করে ফেলে। বিলম্বে আসার কারণে চিকিৎসক শত চেষ্টা করেও অনেক রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। রিপোর্ট যাই আসুক, লক্ষণ ও উপসর্গ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী জানান, ডেঙ্গু রোগীর জ্বর কমলেও বিপদ কাটে না। অধিকাংশ রোগী এক থেকে দু-সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে জ্বর সেরে যাওয়ার পরেও কিছু সতর্ক সংকেত দেখা দিতে পারে। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা, নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত, বমি বা পায়খানায় রক্ত, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে গেলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা জরুরি। কারণ এগুলি গুরুতর ডেঙ্গুর লক্ষণ হতে পারে। এই প্রিভেনটিভ বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, বেশি করে তরল পান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।
