গোলকধাঁধায় ‘পথভ্রষ্ট’ ট্রাম্প, ইরান যুদ্ধ বন্ধে সমাধান কী?
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
সংঘাতপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে প্রায়ই বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটছে। গতকাল শনিবার সকালেও একটি জাহাজে মিসাইল হামলার ঘটনা ঘটেছে। এদিন সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির (এডিএনওসি) একটি জাহাজ হরমুজ পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করলে ওই হামলার ঘটনা ঘটে। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বেড়েই চলছে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালি নিয়ে চুক্তি সন্নিকটে বলে জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনকি শিগগিরই ইরান যুদ্ধ শেষ হচ্ছে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমার মনে হয় খুব শিগগিরই ইরান যুদ্ধ শেষ হবে। তারা (ইরান) আর খুব বেশি দিন টিকে থাকতে পারবে না। হরমুজ নিয়েও চুক্তি হবে। ’
যদিও ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, কিছু অস্ত্রের মজুত-সংক্রান্ত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।’ বিষয়টি স্বীকার করে ট্রাম্প বলেন, ‘কিছু নির্দিষ্ট ধরনের শক্তিশালী অস্ত্রের সীমাহীন মজুত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আছে। তবে অন্য কিছু অস্ত্রের মজুত তুলনামূলকভাবে কম। এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা খাতের কোম্পানিগুলো নতুন নতুন উৎপাদন কারখানা তৈরি করছে। এর মধ্যে প্যাট্রিয়ট ও টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানাও আছে।’ ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধে কোনো স্পষ্ট কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করতে না পেরে এক জটিল গোলকধাঁধায় পড়েছেন ট্রাম্প। ‘পথভ্রষ্ট’ পথিকের
মতো বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন তিনি। যা রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বা নীতির স্থিতিশীলতার অভাব।
অপরদিকে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইরান ইতিবাচক বার্তা পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী করিম ঘারিবাবাদি। তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে একধরনের বার্তা পাচ্ছেন তারা। বার্তাগুলো ইতিবাচক। তবে এসব বার্তার প্রকৃতি কেমন কিংবা বার্তা কোথা থেকে আসছে- সে বিষয়ে মুখ খোলেননি তিনি।
করিম ঘারিবাবাদি বলেন, ‘ইরানিদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে নিতে হলে তাদের (তেহরান) প্রথমে ওমানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিষয়টি সুরাহা করতে হবে। সেখানে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে এবং হরমুজ প্রণালিতে নতুন সীমানা নির্ধারণ করতে হবে।’
মূলত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে ওমানের সঙ্গে একটি চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে ইরান। গত বৃহস্পতিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘এটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।’ এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি তিনি।
তবে বাঘাই বলেন, ‘ওমানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলেও প্রণালিটি দিয়ে নিরাপদ নৌচলাচলের নিশ্চয়তা মিলবে না। কারণ, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে নিরাপত্তা এখনো বিঘিœত হচ্ছে।’
মার্কিন এই অবরোধের কারণেই ইরানের কেশম দ্বীপের আশপাশে নতুন করে আবারো বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তারা যাদের ‘শত্রæভাবাপন্ন লক্ষ্যবস্তু’ বলছে, তাদের বিরুদ্ধে চালানো অভিযানের অংশ হিসেবেই এই বিস্ফোরণ ঘটেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় অন্যতম প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে জাহাজ চলাচল করত। তবে এখন এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে এবং জাহাজ থেকে ফি আদায় করতে চায় ইরান। এ কারণে বর্তমানে ইরান জাহাজগুলোকে শুধু নিজেদের উপকূলঘেঁষা পথ ব্যবহার করতে দিচ্ছে। যা মানছে না যুক্তরাষ্ট্র। এই দ্ব›েদ্বর কারণেই আলোচনা বন্ধ রেখে ফের সংঘাতে জড়িয়েছে উভয়পক্ষ। এখন নতুন করে হরমুজ নিয়ে চুক্তি করতে চাচ্ছে ওমান-ইরান। এতে আরো সংকট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে বলে মনে করছে ভূরাজনীতি বিশ্লেষকরা।
এমন আবহে শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে হরমুজে এডিএনওসি জাহাজে মিসাইল হামলার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে আমিরাতের বার্তাসংস্থা ডব্লিউএএম। সংস্থাটি জানিয়েছে, হামলার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং জাহাজের নাবিকদের মধ্যে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। গত শুক্রবার আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি জানিয়েছিল, হরমুজে জাহাজ চলাচল বিঘিœত হওয়ায় তাদের তেল রপ্তানির পরিমাণ কমে এসেছে। এরমধ্যেই কোম্পানিটির জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটল। শুধুমাত্র শনিবারই নয়, হরমুজে প্রায়ই হামলার ঘটনা ঘটছে। অপরদিকে ইরানের মিত্র হুতি বিদ্রোহীদের কারণে লোহিত সাগরেও তীব্র উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। হুতিদের হুমকির মুখে বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে গেছে।
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের বেড়াজালে যুক্তরাষ্ট্র আটকা পড়েছে প্রায় ছয় মাস হলো। শুরুর দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একে কয়েকদিনের অভিযান আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে ইরান দ্রুতই নতজানু হবে। কিন্তু হয়েছে তার উল্টো। ফলে এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া নিয়ে খোদ হোয়াইট হাউসেই দেখা দিয়েছে চরম সংশয়। এখন এই সংঘাত থেকে বের হওয়ার উপায় খুঁজছেন ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিনির্ধারকেরা।
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে আসা প্রয়োজন বলে স্পষ্ট করেছেন মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। বিগত কয়েক সপ্তাহ যাবৎ ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ উপদেষ্টাদের গোপন আলোচনায় এই পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র জানিয়েছে, জেনারেল কেইন সতর্ক করে বলেছেন, কেবল বিমান হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্যগুলো অর্জন করা সম্ভব নয়। এছাড়া, সংঘাত বাড়াতে সামরিক বাহিনীর হাতে যে বিকল্পগুলো রয়েছে তা উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পাশাপাশি, বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে কীভাবে দ্রুত বেরিয়ে আসা যায় তা খোঁজা প্রয়োজন- এমন মতামত শুধু জেনারেল কেইনের একার নয়, একই কথা বলেছেন সিআইএ পরিচালক জন র?্যাটক্লিফ, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারাও।
