সড়কে মৃত্যুদূত মোটরবাইক
দেব দুলাল মিত্র
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা মহামারি আকার ধারণ করেছে। দিন দিন মোটরসাইকেল চালকের সংখ্যা এবং দুর্ঘটনা বেড়েই চলছে। গত ৬ বছরে ১৫ হাজারের বেশি ব্যক্তি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে আবার কিশোর, তরুণ ও যুবকদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বেপরোয়া গতির কারণে গত কয়েক বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়ে এখন মহামারি পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত কয়েক বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার প্রায় ৫৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এসব দুর্ঘটনায় মৃত্যু হার বেড়েছে প্রায় ৫৪ দশমিক ৮১ শতাংশ।
সড়ক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোটরসাইকেলের গতি নিয়ন্ত্রণে সরকার, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সরকারী দপ্তরগুলোকে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যক্তি পর্যায়ে গতি কমানো না গেলেও যান্ত্রিকভাবে এই গতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে উৎপাদনকারী ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে। শুধু বেপরোয়া গতির কারণে অন্যান্য যানবাহনের তুলনায় মোটরসাইকেলের দুর্ঘটনার ঝুঁকি ৩০ গুণ বেশি। এছাড়া আইন না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থা, গতির প্রতিযোগিতা ও সেফটি কিটস ব্যবহার না করা, মৃত্যুহার বেড়ে যাওয়ায় অন্যতম কারণ।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মোটরসাইকেলের চলাচল সুপরিকল্পিতভাবে নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে এই মহামারি ঠেকানো সম্ভব হবে না। যে হারে মোটরসাইকেল বাড়ছে তা এখনই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত মোট মোটরযানের ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) গবেষণায় উঠে এসেছে, বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেলের কারণে সড়কে দুর্ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে সড়কে হতাহতের ঘটনার মধ্যে ৪০ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার কারণে সংঘটিত হচ্ছে।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা প্রতিষ্ঠান এআরআই’র সাবেক পরিচালক ও গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, যুবক ও তরুণদের জন্য মোটরসাইকেল এখন মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয়েছে। অভিভাবকরা সন্তানের শখ মেটাতে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তরুণরা মোটরসাইকেল নিয়ে এখন মহাসড়কে উঠে যাচ্ছে। দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা মহামারি আকার ধারণ করেছে। এখনই মোটরসাইকেলের গতি প্রতিরোধে সরকার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো গতি কমানোর কঠোর ব্যবস্থা না নিলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা আরো বাড়বে। তিনি বলেন, ব্যক্তি পর্যায়ে গতি কমানো না গেলেও যান্ত্রিকভাবে এই গতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে উৎপাদনকারী ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, গত ৬ বছরে ১৫ হাজারের বেশি ব্যক্তি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। মোটরসাইকেল চালকদের ৫৮ শতাংশেরই বয়স ১৪ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। শখ পূরণে অনেক অভিভাবকই কম বয়সী সন্তানদের হাতে আধুনিক মডেলের উচ্চগতির মোটরসাইকেল তুলে দিচ্ছেন। এই কিশোরদের অধিকাংশই সড়কে নেমে কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করায় দুর্ঘটনা বেড়েই চলছে। বেপরোয়া গতির কারণেই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে।
তিনি আরো বলেন, দিন দিন মোটরসাইকেলের সিসি বাড়ছে। ফলে গতিও বাড়ছে। জাপান নিজের দেশে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ করছে। অথচ আমাদের দেশকে বিনিয়োগের ক্ষেত্র বানিয়ে বেশি সিসির মোটরসাইকেল রপ্তানি করছে। পৃথিবীর সব দেশ এখন মোটরসাইকেল কমিয়ে আনছে। আমাদের দেশেও দ্রুত মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, প্রতিবছরই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার বাড়ছে। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে দুর্ঘটনা বেড়েছে দশমিক ৮৯ শতাংশ, প্রাণহানি বেড়েছে ৪ দশমিক ২২ শতাংশ এবং আহত বেড়েছে ৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ। আবার ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে দুর্ঘটনা বেড়েছে ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ, প্রাণহানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং আহত বেড়েছে ১ দশমিক ২০ শতাংশ। দুর্ঘটনার জন্য ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল চালক এককভাবে দায়ী। কিশোর-যুবকদের মধ্যে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা বাড়ছে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের ৫৮ শতাংশ ১৩ থেকে ৩৫ বছর বয়সী। দেশে সাড়ে ছয় বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১২ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ১৪৩ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১৬ হাজার ৬৫টি বাইক দুর্ঘটনায় এসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
দুর্ঘটনা রোধে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সুপারিশে বলা
হয়েছে- মোটরসাইকেলে নিরাপত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার করা, মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা, বিটিআরসির মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিরাপত্তামূলক প্রচারণা চালানো, মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনের ভাষাভঙ্গি পরিবর্তন করা, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ করা এবং সহজ-সাশ্রয়ী যাত্রীবান্ধব গণপরিবহন চালু করা।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বেপরোয়া গতি ও আইন না মানার কারণেই দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েই চলছে। আমরা বিভিন্ন সময় সরকারের কাছে মোটরসাইকেলের ভয়াবহতা তুল ধরে নিয়ন্ত্রণের জন্য নানান সুপারিশ করেছি। কিন্তু কোনো কিছুই বাস্তবায়ন হচ্ছে না। গত ঈদ যাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের প্রায় ২৯ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। এ সময় ১৫৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫৯ জন নিহত ও ১৮০ জন আহত হয়। এই সংখ্যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। দুর্ঘটনায় পড়া যানবাহনের ২৮ দশমিক ৯০ শতাংশ মোটরসাইকেল। অতএব এক ঈদ যাত্রায় শুধু মোটরসাইকেলের কারণে এত মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, সারা বছর কী পরিমাণ মানুষ মারা যায় তা সহজেই অনুমেয়।
