একাদশে ভর্তি
শিক্ষার মানে বৈষম্যের চিত্র
সেবিকা দেবনাথ
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: ভোরের কাগজ
মাধ্যমিক বা এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল সদ্যই প্রকাশিত হয়েছে। এবার শুরু হতে যাচ্ছে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তির তোড়জোড়। সদ্য মাধ্যমিক পাস করা কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কলেজ নির্বাচনে সন্তানের পছন্দের পাশাপাশি পরিবারের সামর্থ্য ও যাতায়াতের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। কেউ নামি কলেজকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, আবার কেউ বাসার কাছাকাছি ভালো প্রতিষ্ঠান খুঁজছেন। লাখ লাখ শিক্ষার্থী এখন পছন্দের কলেজে জায়গা পাওয়ার অপেক্ষায়। অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা ‘কোন কলেজে আবেদন করব’, ‘কত নম্বর লাগবে’, ‘পছন্দের কলেজে সুযোগ পাব তো’ অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। একাদশ শ্রেণিতে আসন আছে শিক্ষার্থীর চেয়ে অনেক বেশি। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক আসন খালি পড়ে থাকছে। পুরো বিষয়টি দেশের শিক্ষার মানে বিদ্যমান বৈষম্যের চিত্র যেন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
২০২৬ সালের হিসাবটি সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য সামনে এনেছে। এ বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। বিপরীতে সারাদেশে কলেজ ও মাদ্রাসায় একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিযোগ্য আসন রয়েছে প্রায় ২৫ লাখ। অর্থাৎ পাস করা প্রত্যেক শিক্ষার্থী একাদশে ভর্তি হলেও প্রায় ১৩ লাখ ৬১ হাজার আসন খালি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এই মুহূর্তে সামগ্রিকভাবে ‘কলেজে আসন নেই’- এমন সংকট নেই। বরং প্রশ্নটি অন্য জায়গায়: কেন লাখ লাখ আসন খালি থাকলেও নির্দিষ্ট কয়েকটি কলেজে ভর্তি হতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়? ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামানের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছর মোট ভর্তিযোগ্য আসনের ৫৮ দশমিক ৭ শতাংশে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল। অর্থাৎ ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ আসনই খালি ছিল।
গত কয়েক বছরের ফলাফল, একাদশ শ্রেণির আসন, ভর্তি-সংক্রান্ত তথ্য এবং নামি কলেজগুলোর আসনসংখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর পেছনে রয়েছে শিক্ষার্থীদের পছন্দের প্রবণতা, প্রতিষ্ঠানভেদে শিক্ষার মানের পার্থক্য, ফলাফলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, রাজধানীকেন্দ্রিক শিক্ষা-আকাক্সক্ষা এবং বিপুলসংখ্যক কলেজের শিক্ষার্থী ধরে রাখার সক্ষমতার ঘাটতি।
আরও পড়ুন: পরীক্ষা ছাড়াই একাদশে ভর্তি, আবেদন শুরু ১৫ সেপ্টেম্বর
৪ বছরের চিত্র- আসন বাড়ছে, শিক্ষার্থী কমছে : গত কয়েক বছরের তথ্য পাশাপাশি রাখলে চিত্রটি পরিষ্কার হয়। ২০২৩ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ২০ লাখ ৪১ হাজার ৪৫০ জন অংশ নেয়। পাস করে ১৬ লাখ ৪১ হাজার ১৪০ জন। সে বছরও একাদশে ভর্তির জন্য আসন ছিল প্রায় ২৫ লাখ। ফলে কাগজে-কলমে পাস
করা সবাই ভর্তি হলেও বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকার সুযোগ ছিল। ২০২৪ সালে পরিস্থিতি প্রায় একই ছিল। এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ২০ লাখ ২৪ হাজার ১৯২ জন অংশ নেয় এবং পাস করে ১৬ লাখ ৭২ হাজার ১৫৩ জন। একাদশ শ্রেণিতে আসন ছিল প্রায় ২৫ লাখ। ফলে অন্তত ৮ লাখের বেশি আসন খালি থাকার হিসাব সামনে আসে। ২০২৫ সালে বৈপরীত্য আরো বেড়ে যায়। ওই বছর এসএসসি ও সমমানে পাস করে ১৩ লাখ ৩ হাজার ৪২৬ জন। বিপরীতে কলেজ ও মাদ্রাসায় একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিযোগ্য আসন ছিল ২৬ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি। অর্থাৎ সব পাস করা শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ আসন খালি থাকার তখন জানানো হয়েছিল। ২০২৬ সালে আবার প্রায় ২৫ লাখ আসনের বিপরীতে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। সব উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও প্রায় ১৩ লাখ ৬১ হাজার আসন খালি থাকার হিসাব এসেছে। অর্থাৎ চার বছরের প্রবণতা বলছে, জাতীয় পর্যায়ে আসনের ঘাটতি নয়, বরং আসন ও শিক্ষার্থীর মধ্যে ক্রমবর্ধমান ভারসাম্যহীনতাই বড় সমস্যা।
রাজধানীতে আসন ও চাপ দুই-ই বেশি : সারাদেশে প্রায় ২৫ লাখ আসন থাকলেও সব আসন সমান আকর্ষণীয় নয়। রাজধানী ও বিভাগীয় শহরের কিছু পরিচিত কলেজ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে ‘ভালো কলেজ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এসব প্রতিষ্ঠানে আসনসংখ্যা সীমিত। ফলে জাতীয় পর্যায়ে আসন উদ্বৃত্ত থাকলেও নির্দিষ্ট কলেজে চাহিদা থাকে আসনের বহুগুণ। ২০২৪ সালের ভর্তি-সংক্রান্ত তথ্যে বলা হয়েছিল, ঢাকায় মানসম্পন্ন কলেজের সংখ্যা আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০টি। এসব কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিযোগিতা হয়। ওই বছর, রাজধানীর কলেজগুলোতে একাদশ শ্রেণিতে ৫ লাখের বেশি আসন ছিল। জাতীয়ভাবে এটিই বড় একটি আসনভাণ্ডার। কিন্তু সেই আসনগুলোর বড় অংশ শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ নয়। ফলে একই শহরে একদিকে বিপুল আসন খালি থাকে, অন্যদিকে অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে আবেদনকারীর চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বৈপরীত্যের অর্থ হলো- ঢাকায় আসনসংখ্যা বেশি হওয়া মানেই পছন্দের কলেজে আসন পাওয়া সহজ হওয়া নয়। বরং নামি কলেজগুলোর সীমিত আসনই পুরো ভর্তি-প্রক্রিয়াকে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে। ২০২৩ সালের একাদশ ভর্তি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এর আরো স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায়। ঢাকা কলেজে একাদশ শ্রেণিতে আসন ছিল মাত্র ১ হাজার ২০০টি; বিজ্ঞান বিভাগে ৯০০, মানবিকে ১৫০ এবং ব্যবসায় শিক্ষায় ১৫০। অথচ কলেজটিতে প্রতিবছর প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষার্থী আবেদন করে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এই একটি পরিসংখ্যানই জাতীয় আসনসংখ্যা আর বাস্তব ভর্তি-চাহিদার পার্থক্য বোঝাতে যথেষ্ট।
২০২৫ সালের একটি বিশ্লেষণে রাজধানীর প্রায় ৩০টি পছন্দের কলেজে মোট আসন তুলনামূলকভাবে সীমিত বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে নটর ডেম, হলি ক্রস, সেন্ট যোসেফ, ভিকারুননিসা, রেসিডেনসিয়াল মডেল, রাজউক উত্তরা মডেলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সীমিত আসনের বিপরীতে বিপুল চাহিদার কথা উঠে আসে।
‘ভালো কলেজ’ ধারণাই কি সংকট তৈরি করছে? : একদিকে সরকার ও শিক্ষা বোর্ডের হিসাবে দেশের অধিকাংশ কলেজে আসন রয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বড় অংশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছেন। কেন শিক্ষার্থীরা হাতে গোনা কয়েকটি কলেজকে ঘিরে ছুটছেন? এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত- কলেজের ফলাফল অনেক ক্ষেত্রে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ চক্র তৈরি করে। ফল ভালো হলে ভালো শিক্ষার্থী আসে আর ভালো শিক্ষার্থী হলে ফল আবার ভালো হয়। এভাবে একটি চক্র তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত- ওইসব কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার পরিবেশও একটি কারণ। শিক্ষকসংখ্যা, নিয়মিত ক্লাস, বিজ্ঞান ল্যাব, লাইব্রেরি, প্রযুক্তি ও একাডেমিক পরিবেশে প্রতিষ্ঠানভেদে পার্থক্য রয়েছে। অভিভাবকেরা এসব বিষয় বিবেচনা করেন। তৃতীয়ত- কিছু কলেজ শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, একটি ‘ব্র্যান্ড’। সেই প্রতিষ্ঠানের নাম সন্তানের ভবিষ্যৎ পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়। চতুর্থত- এইচএসসি শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির তীব্র প্রতিযোগিতা রয়েছে। তাই অনেক পরিবার মনে করে, নামি কলেজে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতিতে সুবিধা পাওয়া যাবে। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো- রাজধানীকেন্দ্রিকতা। ঢাকায় কোচিং, বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রন্থাগার, প্রযুক্তি ও অন্যান্য শিক্ষা-সুবিধা বেশি- এমন ধারণাও শিক্ষার্থীদের রাজধানীমুখী করে।
আরও পড়ুন: এমপিও হারাতে যাচ্ছে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
মফস্বলের কলেজে খালি আসন, শহরে তীব্র প্রতিযোগিতা : ২০২৫ সালের জেলা-ভিত্তিক চিত্রও এই বৈষম্যকে সামনে এনেছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, শহরের কলেজগুলোর প্রতি আগ্রহ তুলনামূলক বেশি; বিপরীতে মফস্বলের অনেক কলেজে আসন পূরণ নিয়ে উদ্বেগ ছিল। এটি শুধু শিক্ষার্থীর পছন্দের সমস্যা নয়। এটি দীর্ঘদিনের শিক্ষাগত অবকাঠামোগত বৈষম্যের ফল। একটি প্রত্যন্ত কলেজে যদি আধুনিক ল্যাব না থাকে, পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকে, নিয়মিত ক্লাস না হয়, ফলাফল দুর্বল হয়- তাহলে শুধু ‘আসন আছে’ বলেই একজন শিক্ষার্থীকে সেখানে পাঠানো কঠিন। ফলে সরকারি নথিতে একটি আসন এবং বাস্তবে একটি ‘গ্রহণযোগ্য আসন’- দুটি এক বিষয় নয়।
২০২৫ সালের কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চিত্র ছিল আরো করুণ। বোর্ডটির অধীনে ৪৬৮টি কলেজে একাদশ শ্রেণির আসন ছিল ২ লাখ ৫৯ হাজার ২৬০টি। বিপরীতে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল ১ লাখ ৬ হাজার ৫৮১ জন। ফলে শুধু এই বোর্ডেই প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার ৬৭৯টি আসন খালি থাকার হিসাব পাওয়া যায়। বোর্ডের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক কলেজ প্রত্যাশিত সংখ্যক শিক্ষার্থী পাবে না। কোনো কোনো কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও তখন উঠে এসেছিল।
আবেদনই করছে না অনেক শিক্ষার্থী : ২০২৫ সালের ভর্তি প্রক্রিয়ার একটি তথ্য এই সংকটের আরেকটি দিক সামনে আনে। প্রথম ধাপে ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৩৩৬ জন শিক্ষার্থী একাদশে ভর্তির জন্য আবেদন করেছিল। অথচ এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করেছিল ১৩ লাখ ৩ হাজার ৪২৬ জন। কারিগরি শিক্ষায় যাওয়া শিক্ষার্থীদের হিসাব আলাদা করে দেখলে ১ লাখের বেশি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী প্রথম ধাপে কলেজ-মাদ্রাসায় ভর্তির আবেদনই করেনি। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে- সব পাস করা শিক্ষার্থী কি আদৌ সাধারণ কলেজে ভর্তি হতে চায়? এর উত্তরে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্ভবত না। কারণ- কেউ কারিগরি শিক্ষায় যায়, কেউ বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়, কেউ আর্থিক বা পারিবারিক কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না, কেউ মাদ্রাসা বা অন্য ধারায় যায়। আবার কেউ এসএসসি পাস করার পরও একাদশে ভর্তি হয় না।
কেন্দ্রীয় ভর্তি ব্যবস্থা কি সমস্যার সমাধান করছে? : ১০ আগস্ট ফল প্রকাশের দিন শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছিলেন, চলতি শিক্ষাবর্ষেও একাদশ শ্রেণিতে আগের মতোই এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি সম্পন্ন হবে। পুরনো পদ্ধতি অর্থাৎ মার্ক বা জিপিএ পদ্ধতিতে একাদশে ভর্তি হবে। অর্থাৎ আগের মতোই কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইনে আবেদন নেয়া এবং এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর এবং পছন্দক্রমের ভিত্তিতে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পদ্ধতির বড় সুবিধা হলো- একজন শিক্ষার্থী একই সময়ে একাধিক প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে পারেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় তার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত হয়। এতে আলাদা আলাদা কলেজে ভর্তি পরীক্ষা বা দৌড়ঝাঁপ অনেকটাই কমে। কিন্তু এই ব্যবস্থা একটি মৌলিক বৈষম্য দূর করতে পারে না: সব কলেজের শিক্ষাগত সক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদা সমান নয়। কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা আসন বণ্টন করতে পারে; কিন্তু শিক্ষার্থীর পছন্দকে সমানভাবে বণ্টন করতে পারে না।
আসন খালি থাকার দায় কার? : এখানে দায় শুধু শিক্ষার্থীর নয়, কলেজগুলোরও নয়। বরং বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, একদিকে প্রতিবছর নতুন কলেজ, নতুন শাখা বা অতিরিক্ত আসন তৈরি হয়েছে; অন্যদিকে মাধ্যমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিকে শিক্ষার্থী প্রবাহের পরিবর্তন, পাসের হার এবং শিক্ষার্থীদের বিকল্প শিক্ষাধারায় যাওয়ার প্রবণতা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি- এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, আসনসংখ্যা নির্ধারণের সময় শুধু অবকাঠামোগত সক্ষমতা বিবেচনা করলে হবে না। একটি কলেজে ৫০০ আসন অনুমোদিত হলেই প্রতি বছর ৫০০ শিক্ষার্থী সেখানে ভর্তি হবে- এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই প্রয়োজন চাহিদাভিত্তিক আসন পরিকল্পনা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা বোর্ডের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অনেক সময় জিপিএ-৫ পাওয়া অনেক শিক্ষার্থীও একাধিকবার আবেদন করেও কলেজ পায় না। এর কারণ তারা বারবার একটি বা দুটি কলেজ পছন্দ দেয়। কিন্তু ওই কলেজে দেখা যায়, সবই জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী আবেদন করেছে। এমনকি জিপিএ-৫ পাওয়াদের মধ্যে বিষয়ভিত্তিক নম্বরে এগিয়ে থাকারা শেষ পর্যন্ত সেখানে ভর্তির সুযোগ পায়। সেজন্য শিক্ষার্থীদের কমপক্ষে ৫টি এবং সর্বোচ্চ ১০টি কলেজে পছন্দক্রম দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বোর্ডের এ কর্মকর্তা।
সমাধান কী? : এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসন ফাঁকা থাকে কারণ কিছু প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী পায় না; আর কিছু প্রতিষ্ঠানে উপচেপড়া ভিড় থাকে। এক্ষেত্রে শিক্ষক সংকট দূর করা, গ্রামের ও শহরের মধ্যকার শিক্ষাবৈষম্য কমানো এবং যেসব প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও পাস করে না বা শিক্ষার্থী সংকট থাকে, সেগুলোর সঠিক কারণ খুঁজে বের করে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার ওপর জোর দেয়ার পরামর্শ তার।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবছর কলেজভিত্তিক আসন-চাহিদা-ভর্তির পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেস প্রকাশ করার পাশাপাশি কোন কলেজে কত আসন, কত আবেদন, কত শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে এবং কত আসন খালি থেকেছে- এই তথ্য জনসমক্ষে থাকলে সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হবে। শুধু এসএসসি ফল নয়, কলেজের প্রকৃত শিক্ষার মান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, অবকাঠামো, এইচএসসি ফল, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সাফল্য এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে কলেজের মান নির্ধারণ করা দরকার। মফস্বল ও পিছিয়ে থাকা কলেজে শিক্ষক, ল্যাব, লাইব্রেরি, প্রযুক্তি ও পরিবহন সুবিধা বাড়াতে হবে। শুধু রাজধানীর কয়েকটি কলেজকে ঘিরে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার মান নির্ধারণ করলে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় ভারসাম্য আসবে না। যেখানে ধারাবাহিকভাবে আসন খালি থাকে, সেখানে আসন পুনর্বিন্যাস বা বিভাগ পুনর্গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
শিক্ষা গবেষক মো. রহমত উল্লাহ্ মনে করেন, ক্রমাগত অপরিকল্পিতভাবে কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের কারণে ফাঁকা আসন বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরেই এমন অপরিকল্পিত কার্যক্রম চলে আসছে। এর পিছনে কোন অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা আবশ্যক। যে করেই হোক দ্রুত বিপুলসংখ্যক ফাঁকা আসন কমিয়ে আনার পক্ষে মত দেন তিনি। এক্ষেত্রে তার কিছু সুপারিশ আছে। সেগুলো হলো- নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনা খাতে অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা; সব বৈষম্য, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি নিরসন; সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ; দুর্বল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি আরো বেশি মনোযোগ দেয়া। কারণ দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য সব শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান উন্নয়ন করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
ভর্তি ফি কত, কোন কলেজগুলোতে খরচ বেশি : সম্প্রতি বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি একাদশে ভর্তি নিয়ে একটি বৈঠক করেছে। সেখানে আগের মতোই এসএসসির ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ভর্তি নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এলাকাভেদে ভর্তি ফি ও অন্যান্য খরচও আগের মতোই থাকতে পারে। ঢাকা বোর্ড সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের একাদশে ভর্তি নীতিমালা অনুযায়ী- এমপিওভুক্ত কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনে ৫ হাজার টাকা, মেট্রোপলিটন (ঢাকা ছাড়া) বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনে ৩ হাজার টাকা, জেলায় ২ হাজার টাকা এবং উপজেলা ও মফস্বলে ১ হাজার ৫০০ টাকা। নন-এমপিওভুক্ত কলেজের ক্ষেত্রে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় বাংলা ভার্সনে ৭ হাজার ৫০০ টাকা, ইংরেজি ভার্সনে ৮ হাজার ৫০০ টাকা, মেট্রোপলিটন (ঢাকা ছাড়া) বাংলা ভার্সনে ৫ হাজার টাকা ও ইংরেজি ভার্সনে ৬ হাজার টাকা। এছাড়া নন-এমপিও জেলায় বাংলা ভার্সনে ৩ হাজার টাকা ও ইংরেজি ভার্সনে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং উপজেলা ও মফস্বলে বাংলা ভার্সনে ২ হাজার ৫০০ টাকা ও ইংরেজি ভার্সনে ৩ হাজার টাকা। শিক্ষা বোর্ড শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ভর্তির প্রাথমিক নিশ্চায়ন করার সময় রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ ১৪২ টাকা, ক্রীড়া ফি বাবদ ৫০ টাকা, রোভার/রেঞ্জার ফি বাবদ ১৫ টাকা, রেড ক্রিসেন্ট ফি ১৬ টাকা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফি ৭ টাকা, বিএনসিসি ফি ৫ টাকা, শিক্ষক কল্যাণ ফি ও অবসর সুবিধা ভাতা ফি ১০০ টাকাসহ মোট ৩৩৫ টাকা নিতে পারবে।
ভর্তি ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে, ক্লাস শুরু শিগগির : আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই এ ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করা হবে বলে জানিয়েছেন আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। তিনি বলেন, একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি ১৫ সেপ্টেম্বর শেষ করা হবে। ভর্তি কার্যক্রম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্লাস শুরু হবে। এখনো ক্লাস শুরুর নোটিস দেয়া হয়নি। শিগগির ক্লাস শুরুর নোটিসও আমরা দিয়ে দেব।
