×

প্রথম পাতা

ঘনঘন লোডশেডিংয়ে বাড়ছে ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি

Icon

সেবিকা দেবনাথ

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ঘনঘন লোডশেডিংয়ে বাড়ছে ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি

ছবি: সংগৃহীত

ওষুধ খেয়ে রোগ সারছে না- এমন অভিযোগ নতুন নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়ার পরও উপকার না পেলে রোগী বা স্বজনের প্রথম সন্দেহ থাকে, ওষুধটি আসল তো? ওষুধের মান ঠিক আছে তো? কিন্তু ওষুধের মানের প্রশ্নটি শুধু উৎপাদন কারখানার মান নিয়ন্ত্রণ বা নকল ওষুধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উৎপাদনের পর বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত এবং রোগীর হাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ওষুধ কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, সেটিও কার্যকারিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এই প্রশ্নটি এখন আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তীব্র গরমের মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে সামান্য বিঘœও কোনো কোনো ওষুধের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে তাপমাত্রা-সংবেদনশীল ওষুধ, টিকা ও জৈবিক পণ্যের ক্ষেত্রে নির্ধারিত তাপমাত্রা বজায় রাখা না গেলে পণ্যের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। গতকালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কোথাও কোথাও দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার খবর

পাওয়া গেছে। ১১ আগস্ট মধ্যরাতে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি একপর্যায়ে ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াটে উঠেছিল; ওই সময়ে চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৫২৩ মেগাওয়াট, সরবরাহ ১৩ হাজার ৯৩১ মেগাওয়াট।

বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক নির্দেশনা বলছে, বিষয়টি সরলভাবে ‘বিদ্যুৎ গেলেই ওষুধ নষ্ট’- এভাবে দেখার সুযোগ নেই। তবে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, আলো ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার কারণে নির্ধারিত সংরক্ষণব্যবস্থা ভেঙে পড়লে কিছু ওষুধের স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। দীর্ঘমেয়াদি ও বারবার তাপমাত্রা বিচ্যুতি বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায় যা আছে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) নির্দেশনায় সাধারণ সংরক্ষণে অনেক ওষুধের জন্য ১৫ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা অথবা স্থানীয় জলবায়ুর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রার কথা বলা হয়েছে। আবার কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে নির্দিষ্টভাবে ২ থেকে ৮ ডিগ্রি, ২ থেকে ১৫ ডিগ্রি বা ২ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা থাকে। ‘৩০ ডিগ্রির বেশি নয়’ এবং ‘২৫ ডিগ্রির বেশি নয়’-এ ধরনের লেবেল নির্দেশনাও নির্দিষ্ট তাপমাত্রা সীমা বোঝায়। এখানেই লোডশেডিংয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

ডাব্লিউএইচও’র সময় ও তাপমাত্রা-সংবেদনশীল ওষুধ সংরক্ষণ ও পরিবহনসংক্রান্ত নির্দেশনাতেও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা ও জেনারেটরের অভাবকে ওষুধ সংরক্ষণের অন্যতম সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ের বিচ্যুতি সহনীয় হতে পারে, তবে ধারাবাহিকভাবে ঠাণ্ডা সংরক্ষণ প্রয়োজন এমন পণ্যের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা।

তাই কয়েক ঘণ্টার লোডশেডিং মানেই সব ওষুধ নষ্ট- এমন সিদ্ধান্ত যেমন ভুল, তেমনি ‘বিদ্যুৎ না থাকলেও কোনো সমস্যা নেই’- এমন ধারণাও বিপজ্জনক।

গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকলে কী হয়?

একটি গ্রামাঞ্চলের ছোট ওষুধের দোকানের কথা ধরা যাক। দোকানে ফ্রিজ নেই- এমনটা সব ওষুধের জন্য সমস্যা নয়, কারণ অধিকাংশ ওষুধ ফ্রিজে রাখার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু দোকানের ভেতরের তাপমাত্রা যদি দীর্ঘ সময় ধরে ৩০ ডিগ্রির ওপরে থাকে এবং কোনো কোনো ওষুধের লেবেলে নির্ধারিত তাপমাত্রা তার চেয়েও কম থাকে, তখন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আর যেসব ওষুধের জন্য ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সংরক্ষণ জরুরি, সেখানে ঝুঁকি আরো বেশি। বিদ্যুৎ চলে গেলে সাধারণ ফ্রিজ কিছু সময় ঠাণ্ডা রাখতে পারলেও দীর্ঘ সময় পর তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। ফ্রিজের দরজা বারবার খোলা হলে সেই সময় আরো কমে যায়। বিদ্যুৎ আসার পর আবার ঠাণ্ডা হলেও এর মধ্যে তাপমাত্রা কতক্ষণ কত ডিগ্রিতে ছিল, তা না মাপলে ওষুধটি নিরাপদ সীমার বাইরে গিয়েছিল কিনা বোঝা কঠিন।

মফসসল/গ্রামাঞ্চলেই কেন উদ্বেগ বেশি?

মফসসল/গ্রামাঞ্চলের অনেক ওষুধের দোকান ছোট, ঘরসংলগ্ন এবং সীমিত অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। সব দোকানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা, তাপমাত্রা মাপার যন্ত্র, ব্যাকআপ বিদ্যুৎ বা ওষুধের জন্য আলাদা মানসম্মত রেফ্রিজারেটর থাকে না। বাংলাদেশের ৪৪০ জন গ্রেড-সি ওষুধ বিক্রেতাকে নিয়ে করা একটি গবেষণায় ২২০ জন প্রশিক্ষিত এবং ২২০ জন অপ্রশিক্ষিত বিক্রেতার জ্ঞান ও বাস্তব চর্চা তুলনা করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, প্রশিক্ষিতদের ৯১ দশমিক ৮ শতাংশ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখলেও অপ্রশিক্ষিতদের মধ্যে এই হার ছিল ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ। ওষুধ সংরক্ষণ সম্পর্কে জ্ঞান ছিল প্রশিক্ষিতদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশের, বিপরীতে অপ্রশিক্ষিতদের ৪০ দশমিক ৫ শতাংশের। আরো উদ্বেগজনক তথ্য এসেছে বাস্তব পর্যবেক্ষণে। মাত্র ৫৬ দশমিক ৮ শতাংশ প্রশিক্ষিত এবং ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ অপ্রশিক্ষিত ওষুধ বিক্রেতার দোকানে ঘরের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণের জন্য রুম থার্মোমিটার ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ অনেক দোকানে তাপমাত্রা কত, সেটি অনুমান করা হয়- মাপা হয় না। এখানে লোডশেডিং একটি বিদ্যমান দুর্বলতাকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ, দোকানে থার্মোমিটারই না থাকলে বিদ্যুৎ যাওয়ার আগে ও পরে তাপমাত্রার পরিবর্তন কতটা হয়েছে, তা জানার কোনো নির্ভরযোগ্য রেকর্ডও থাকে না।

শুধু ফ্রিজ থাকলেই সমাধান নয়

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আরেকটি ভুল ধারণা হলো- ফ্রিজ থাকলেই দায়িত্ব শেষ। বাস্তবে প্রয়োজন সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখা, তা নিয়মিত মাপা এবং রেকর্ড রাখা। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় বাংলাদেশের মডেল ফার্মেসির ব্যবস্থার ওপর করা মূল্যায়নে ৩০০টি মডেল ফার্মেসির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ৯৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং রেফ্রিজারেটর মেন্টেইনেন্সের ক্ষেত্রে ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশ ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলেও টেকনিক্যাল পার্সোনেলের অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ৩১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ অবকাঠামো থাকলেই যথাযথ পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হয় না। ২০২৫ সালের আরেকটি গুণগত গবেষণায় গ্রেড-এ ও গ্রেড-বি ফার্মাসিস্ট এবং সরকারি-বেসরকারি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নিয়ে দেখা যায়, ভালো ফার্মেসি প্যাক্টিস বাস্তবায়নে প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্টের ঘাটতি, তুলনামূলক কম বেতন, অতিরিক্ত দায়িত্ব এবং পর্যবেক্ষণব্যবস্থার দুর্বলতা বড় বাধা। গবেষকদের মতে, প্রশিক্ষিত জনবল ধরে রাখা এবং নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা জরুরি। অর্থাৎ বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জনবল ও ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও।

সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন

প্রখ্যাত ফার্মাকোলজিস্ট ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ জানান, বাংলাদেশে ওষুধ সংরক্ষণ অবকাঠামোর দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। ঔষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের যৌথ জরিপে এক সময় দেখা গিয়েছিল, স্বাস্থ্য বিভাগের স্টোরগুলোর মাত্র ১৮ শতাংশে কার্যকর ফ্রিজ ছিল। ওই জরিপে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, আলো, বিদ্যুৎ, পানি ও স্যানিটেশনসহ সংরক্ষণ অবকাঠামোকে ওষুধের মান রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। যদিও ওই তথ্য পুরনো এবং বর্তমান পরিস্থিতির সরাসরি প্রতিচ্ছবি নয়, তবে এটি একটি বিষয় পরিষ্কার করে ওষুধের সাপ্লাই চেইন ও সংরক্ষণের অবকাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। সেই পুরনো দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং এবং তীব্র গরম।

এদিকে রোগীর জন্যও কিছু সতর্কতার কথা উল্লেখ করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, রোগীরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। ওষুধের প্যাকেট অস্বাভাবিক গরম জায়গায় রাখা হয়েছে কি না, রং বা গন্ধ বদলেছে কিনা, সিরাপ আলাদা হয়ে গেছে বা ছত্রাক ধরেছে কিনা- এসব লক্ষ্য করা উচিত। তবে দৃশ্যমান পরিবর্তন না থাকলেও ওষুধ যে শতভাগ কার্যকর, এমন নিশ্চয়তা দেয়া যায় না।

চলতি বছরের জুলাই মাসে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সারদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সংসদে জানিয়েছেন, নকল, ভেজাল ও নি¤œমানের ওষুধের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে অভিযান, নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার কাজ চলছে। তিনি ঔষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) মাঠপর্যায়ের নজরদারি, জনবল বাড়ানো, ঝুঁকিভিত্তিক সার্ভিলেন্স এবং আধুনিক পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিলেন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

১৫ আগস্ট উপলক্ষে বিএনপির কর্মসূচি ঘোষণা

১৫ আগস্ট উপলক্ষে বিএনপির কর্মসূচি ঘোষণা

‘ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের উত্তরাধিকার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়’

‘ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের উত্তরাধিকার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়’

‘হাসিনাকে ফেরত না দিলে ভারত সফরে যাবেন না তারেক রহমান’

‘হাসিনাকে ফেরত না দিলে ভারত সফরে যাবেন না তারেক রহমান’

জুমার নামাজে এক রাকাত ছুটে গেলে কী করণীয়

জুমার নামাজে এক রাকাত ছুটে গেলে কী করণীয়

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App