বাংলাদেশে ‘নেটওয়ার্ক’ সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে সন্ত্রাসবাদী আল-কায়েদা
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী আল-কায়েদা বাংলাদেশে সক্রিয় সেল গঠনের মাধ্যমে তাদের ‘নেটওয়ার্ক’ সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট বা একিউআইএস’ একটি বিভক্ত গোষ্ঠী থেকে এখন আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠনে পরিণত হচ্ছে। তারা বড় ইউনিটের পরিবর্তে ছোট ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সেলে কাজ করার পাশাপাশি লজিস্টিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। নিরাপত্তা পরিষদের ‘অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিম’ গেল ১০ আগস্ট এই প্রতিবেদ প্রকাশ করেছে। এটি তাদের ৩৮তম প্রতিবেদন। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর আবারো নড়েচড়ে বসেছে বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসন। বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রেজিম পরিবর্তনের পর বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ সব রাজনৈতিক দল ও পুলিশ প্রশাসনের ঊধ্বর্তন কর্মকর্তারা বলতে থাকেন, ‘বাংলাদেশে জঙ্গি বলে কিছুই নেই। ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগ জঙ্গি নাটক সাজিয়েছে।’ অনেক জঙ্গিকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। তারা এখন সারাদেশ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বোমা উদ্ধার করা হয়েছে। জঙ্গি সম্পৃক্ততার প্রমান পাওয়ায় কয়েকজনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে নব্য জেএমবি সক্রিয় রয়েছে। তারা বিভিন্ন স্থানে নাশকতার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ব্যবহারের কথা বলে রাসায়নিক দ্রব্য ও বিস্ফোরক সংগ্রহ করছে নব্য জেএমবি জঙ্গিরা। এসব উপকরণ দিয়ে দূরনিয়ন্ত্রিত বোমা বা আইইডি তৈরি করে। এই সংগঠনটির চারটি গ্রুপ সক্রিয় থাকার তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দূরনিয়ন্ত্রিত বোমা তৈরিতে তারা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। জামিনে বের হয়ে কয়েকজন সদস্য আবার ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে সক্রিয় হয়েছেন।
এসব ঘটনার তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, গত ৯ মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া বোমা ও বিস্ফোরকগুলো ছিল উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন ও সূ²ভাবে তৈরি। এসব বোমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত গ্রুপ নব্য জেএমবির পুরনো ও অভিজ্ঞ দল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে জামিনে বের
হয়ে সংগঠনটির কয়েকজন সদস্য আবার সক্রিয় হয়েছেন। ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে তারা নাশকতা ঘটানোর চেষ্টা করছেন।
পুলিশ জানায়, গত ১১ জুলাই সাভারের হেমায়েতপুরের ট্যানারি এলাকার একটি সড়ক থেকে নব্য জেএমবির সদস্য মো. ইমরান হোসেন আরিফকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। ইমরানের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই রাতেই সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুরের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ১১টি আইইডি, বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক, জিহাদি বই ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে আরো একাধিক অপারেশন চালানো হয়।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আইএসআইএলের কার্যক্রম সম্পর্কে বলা হয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আইএসআইএল এবং এর সঙ্গে যুক্ত আঞ্চলিক নেটওয়ার্কগুলোর কার্যক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। তবে তারা বিক্ষিপ্ত সেল, উগ্রবাদে আগ্রহী ব্যক্তি, অনলাইন নিয়োগ এবং অনুপ্রাণিত নেটওয়ার্কগুলোর মাধ্যমে ঝুঁকি তৈরি করে চলেছে।
বাংলাদেশকে ঘিরে উদ্বেগের জায়গাটিও এখানেই। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, একিউআইএস নিজেদের স্বার্থে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের চেষ্টা করছে। দেশে সেল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের আশঙ্কা রয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশে সংগঠনটির একটি শক্তিশালী বা প্রকাশ্য সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি হয়েছে। বরং উদ্বেগটি সম্ভাব্য নেটওয়ার্ক, যোগাযোগ ও সহায়ক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা নিয়ে।
জাতিসংঘের আগের মূল্যায়নগুলোও আল-কায়েদার জন্য আফগানিস্তানকে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত মনিটরিং টিম-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, আল-কায়েদা আফগানিস্তানের তালেবান কর্তৃপক্ষের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে আসছে। অন্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর জন্য প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেয়ার ক্ষেত্রে ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’ হিসেবে কাজ করছে। একিউআইএস দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তানে সক্রিয়। সংগঠনটির শীর্ষ নেতা ও উপনেতা কাবুলে অবস্থান করছেন বলে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জাতিসংঘের মূল্যায়নেও আফগানিস্তানে আল-কায়েদার উপস্থিতির কথা ধারাবাহিকভাবে উঠে এসেছে। ২০২০ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, একিউআইএস আফগানিস্তানের তালেবান-নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর আওতায় নিমরুজ, হেলমান্দ ও কান্দাহারে সক্রিয় ছিল এবং বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ও পাকিস্তানের সদস্যদের নিয়ে তাদের একটি আঞ্চলিক ভিত্তি রয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর দিল্লির লাল কেল্লার সামনের বোমা বিস্ফোরণের পেছনেও একিউআইএসের হাত ছিল। এ ছাড়া একিউআইএস বাংলাদেশে তাদের সেল প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে দেশটিকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। এমন উদ্বেগও প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে। উভয় সন্ত্রাসী সংগঠনই দীর্ঘ বছর ধরে রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্র তৈরির বিষয়ে গভীর আগ্রহ দেখিয়ে আসছে। তবে এখন পর্যন্ত তারা এ সংক্রান্ত কারিগরি চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করতে পারেনি।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০২৫ সালের শেষ দিকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এক ডাক্তারসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছিল, যারা আইএসআইএলের সঙ্গে জড়িত ছিল। জঙ্গি সংগঠনটির জন্য ‘রাইসিন’ নামে এক ধরনের রাসায়নিক বিষ তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তাদের। এ ছাড়া সিরিয়ায় বাসার আল আসাদ সরকারের রেখে যাওয়া বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য দখলের চেষ্টা করেছিল আইএসআইএল। এতে সহায়তার জন্য তারা একজন রসায়ন প্রকৌশলীকে অপহরণও করে।
দীর্ঘদিন গৃহযুদ্ধ চলার পর ২০২৪ সালে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কাছে পরাজিত হয়ে দেশ ছাড়েন বাসার আল আসাদ। আইএসআইএল গৃহযুদ্ধের সময় সিরিয়ার বিশাল এলাকায় দখল করে নিয়েছিল। গত বছর ১৪ ডিসেম্বর অস্ট্রেলিয়ার বন্ডি বিচে ইহুদিদের হানুক্কা উৎসবে গুলি করে ১৬ জনকে হত্যা করা হয়। সেখানেও তদন্তে দেখা গেছে, সন্দেহভাজনরা আইএসআইএলের মতাদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল এবং সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত অঞ্চলে ভ্রমণ করেছিল।
