×

প্রথম পাতা

খোঁড়াখুঁড়িতে নাকাল রাজধানী

Icon

মুহাম্মদ রুহুল আমিন

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

খোঁড়াখুঁড়িতে নাকাল রাজধানী

ভোরের কাগজ

উন্নয়নকাজের জন্য রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক এখন একের পর এক খোঁড়া হচ্ছে। কোথাও ড্রেন নির্মাণ, কোথাও পয়োনিষ্কাশন লাইন, কোথাও পানির পাইপ বসানো, আবার কোথাও চলছে বড় অবকাঠামোর কাজ। এসব কাজের কারণে কোথাও রাস্তার একাংশ বন্ধ, কোথাও সড়ক সরু হয়ে গেছে, কোথাও পড়ে আছে মাটি ও নির্মাণসামগ্রী। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কাজ শেষ করতে দীর্ঘ সময় নেয়া, এক সংস্থার সঙ্গে অন্য সংস্থার সমন্বয় না থাকা এবং খোঁড়া অংশ দ্রুত সংস্কার না করা। ফলে গর্ত, কাদা-পানি, ধুলা ও যানজটে প্রতিদিনই বাড়ছে নগরবাসীর ভোগান্তি। যাতায়াতে সময় বাড়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও ব্যবসায়ীদের ক্ষতিও বাড়ছে।

রাজধানীর নন্দীপাড়া থেকে প্রতিদিন মোটরসাইকেলে গুলশানে অফিসে যান ওই এলাকার বাসিন্দা সাব্বির আহমেদ। তার যাতায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ মাদারটেক ও বাসাবো হয়ে খিলগাঁও বিশ্বরোড। স্বাভাবিক সময়ে নন্দীপাড়া থেকে সেখানে পৌঁছাতে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মতো সময় লাগত। এখন রাস্তার কাজ ও যানজটের কারণে এখন ৪০ থেকে ৫০ মিনিট, এমনকি এক ঘণ্টাও লেগে যায়। ভোরের কাগজের সঙ্গে আলাপকালে সাব্বির বলেন, আমরা যারা এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করি, আমাদের কাছে সময় নষ্টই শুধু সমস্যা নয়। প্রতিদিন রাস্তার গর্ত, মাটি, কাদা ও যানবাহনের চাপের মধ্য দিয়ে পথ চলতে হয়। আমরা যারা মোটরসাইকেল চালিয়ে অফিস যাই, আমাদের ঝুঁকি আরো বেশি। শুকনো অবস্থায় যে গর্ত চোখে পড়ে, বৃষ্টিতে সড়ক ডুবে গেলে সেটি আর দেখা বা বোঝা যায় না। ফলে অনেক ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে হয়। তিনি বলেন, আমরা নিয়মিত যাতায়াত করায় পথ জানা, তাই কিছুটা সতর্ক হয়ে চলি। কিন্তু নতুন কেউ বৃষ্টির পর এই সড়ক দিয়ে গেলে গাড়ির চাকা গর্তে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

ধলপুরের বাসিন্দা শফিকুর রহমান জানান, রাস্তা খুঁড়ে রাখা হয়েছে বেশ কয়েক দিন ধরে। এতে সড়ক সরু হয়ে পড়ছে এবং যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। তিনি বলেন, রাস্তার পাশে নির্মাণসামগ্রী পড়ে থাকায় আমাদের চলাচলেও সমস্যা হচ্ছে। বৃষ্টির সময় পানি জমলে গর্ত ও কাদার কারণে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যায়। কাজ দ্রুত শেষ হলে আমাদের ভোগান্তি কিছুটা কমত।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খোঁড়াখুঁড়ির কারণে আগে অল্প সময়ে যাওয়া যেত এমন পথেও এখন কয়েকগুণ বেশি সময় লাগছে। কোথাও সড়কের এক পাশ বন্ধ থাকায় সীমিত জায়গা দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। কোথাও গর্ত এড়িয়ে চালকদের বারবার লেন পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এতে একটি সড়কের সমস্যা আশপাশের সড়কেও ছড়িয়ে পড়ছে।

বৃষ্টির সময় ভোগান্তি আরো বাড়ছে। পানি জমে গেলে খোঁড়া অংশ, গর্ত ও রাস্তার উঁচু-নিচু জায়গা বোঝা যায় না। ফলে মোটরসাইকেল ও রিকশাচালকদের সতর্ক হয়ে চলতে হচ্ছে। অনেক জায়গায় পথচারীদেরও কাদা ও পানি এড়িয়ে মূল সড়কে নেমে হাঁটতে দেখা যায়। এতে যানবাহনের চাপের মধ্যে তাদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

রামপুরার বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সড়ক খোঁড়াখুঁড়িটা আমাদের দেশে সবসময় বর্ষাকালেই বেশি হয়ে থাকে। এ ছাড়া সারা বছর তো এই ভোগান্তি কোনো না কোনো এলাকায় আছেই। একবার ওয়াসা যদি রাস্তা কাটে, আরেকবার তিতাস গ্যাস কাটে। আরেকবার সিটি করপোরেশন রাস্তা কাটে। বছরের কোনো মাসে নিস্তার নেই। কী যে যন্ত্রণার মধ্যে আছি। তা ভাষায় বলা যায় না। তিনি বলেন, বর্ষাকালে ভোগান্তিটা সবচেয়ে বেশি। রামপুরার মতো ব্যস্ত এলাকায় সমস্যা আরো বাড়ে। সড়কের গর্তে পানি জমে গেলে চালকরা বুঝতে পারেন না সামনে কতটা গভীর গর্ত। রিকশাচালকরা গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে অনেক সময় রাস্তার মাঝখানে চলে আসেন। মোটরসাইকেল চালকদের ঝুঁকি থাকে বেশি। আর পথচারীদের অনেক ক্ষেত্রে পানি-কাদা মাড়িয়েই গন্তব্যে যেতে হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর কলাবাগান, মগবাজার, শাহবাগ, ইস্কাটন, আরামবাগ, পল্টন, মতিঝিল, রামপুরা, বাসাবো, গোলাপবাগ, সায়েদাবাদ, গোরান, খিলগাঁও, নন্দীপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় পয়োনিষ্কাশন ও অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। এসব কাজের জন্য বিভিন্ন সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি হচ্ছে। এর ওপর পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় আরো সড়ক কাটার

পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে সামনে আরো এলাকায় ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাজধানীর ব্যস্ত প্রগতি সরণিতেও খোঁড়াখুঁড়ির প্রভাব পড়েছে। জানা গেছে, রামপুরা থেকে কুড়িল পর্যন্ত প্রায় ৯ কিলোমিটার সড়কে স্বাভাবিক সময়ে ২৫ থেকে ৩০ মিনিটে যাওয়া গেলেও কোথাও কোথাও দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগছে। ছয় লেনের সড়কের কোনো কোনো অংশে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে যান চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়েছে। ঢাকা ওয়াসার পাইপলাইন স্থাপন এবং এমআরটি লাইন-১ সংক্রান্ত ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজের প্রভাবও পড়েছে এই সড়কে।

প্রগতি সরণির যানজট শুধু ওই সড়কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিমানবন্দর, কুড়িল, নতুনবাজার, বাড্ডা, রামপুরা ও বসুন্ধরা এলাকার সঙ্গে এই সড়কের যোগাযোগ থাকায় এর প্রভাব আশপাশের সড়কেও পড়ে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী বহনকারী গাড়ি ও পণ্যবাহী যানকে এর প্রভাব বহন করতে হয়।

রাজধানীর সমস্যা শুধু নতুন করে খোঁড়া রাস্তা নিয়েও নয়। অনেক সড়কেই আগে থেকেই ছোট-বড় গর্ত, ভাঙা পিচ, নিচু-উঁচু অংশ ও নষ্ট ম্যানহোল রয়েছে। নতুন করে রাস্তা কাটার পর সেগুলো ঠিকমতো সংস্কার না হলে পুরনো সমস্যার সঙ্গে নতুন সমস্যা যুক্ত হয়। বর্ষায় পানি জমে গেলে কোথায় গর্ত আর কোথায় সমতল, তা বোঝার উপায় থাকে না।

নগরবাসীর অভিযোগ, সবচেয়ে বড় সমস্যা বিভিন্ন সেবা সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা। একটি সংস্থা রাস্তা কাটার পর কাজ শেষ করার আগেই অন্য সংস্থা একই সড়কে নতুন কাজ শুরু করছে। এতে একই রাস্তা বারবার কাটতে হচ্ছে। বাড়ছে সময় ও অর্থের অপচয়, সঙ্গে বাড়ছে মানুষের দুর্ভোগও।

নগরবিদ ও আইডিপির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান ভোরের কাগজকে বলেন, ঢাকা শহরের সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি এটা নতুন নয়। বলা যায় বছরজুড়েই এই কাজটি করা হয়। আগে মেয়ররা রাস্তার মেরামত, সংস্কার আর উন্নয়ন কাজের নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতেন। ফলে সেবা সংস্থাগুলোর একটা জবাবদিহিতা ছিল। গত দুই বছর ধরে ঢাকায় কোনো জনপ্রতিনিধি নেই। তাই সেবা সংস্থাগুলোর কোনো দায়বদ্ধতা নেই। তারা ইচ্ছেমতো যখন মনে চায়, তার কাজ করছে। কারো কাছে কোনো জবাবদিহিতা নেই। এভাবে একটা নগরী চলতে পারে না। তিনি বলেন, বর্তমানে দুই সিটি করপোরেশনে যারা প্রশাসক আছেন, তারা রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি। ফলে তারা চাইলেই কিন্তু একটা নিয়মের মধ্যে সবকিছু নিয়ে আসতে পারেন। তাহলে সেবা সংস্থাগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা অনেকাংশে কমে যাবে। নগরীর দ্রুত সমস্যা সমাধানে যত দ্রুত সম্ভব দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন দেয়ার কথাও বলেন এই নগরবিদ।

নগরবাসীর প্রত্যাশা, উন্নয়নকাজ হোক পরিকল্পিতভাবে। রাস্তা কাটার আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা হোক। কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা হোক। নির্মাণসামগ্রী এমনভাবে রাখা হোক, যাতে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলে সমস্যা না হয়। আর কাজ শেষ হওয়ার পর দ্রুত রাস্তা সংস্কার করে যান চলাচলের উপযোগী করা হোক।

রাজধানীর মানুষ উন্নয়নের বিরুদ্ধে নয়। তারা এমন উন্নয়ন চায়, যার সুফল দ্রুত পাওয়া যাবে। একটি রাস্তা ভালো করতে গিয়ে যেন মাসের পর মাস মানুষের সময় নষ্ট না হয়, ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত না হয় কিংবা গর্তে পড়ে কেউ দুর্ঘটনার শিকার না হন। ঢাকার মানুষ উন্নয়ন চায়, কিন্তু দুর্ভোগের বিনিময়ে নয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

‘ওর দেহরক্ষী হয়ে গিয়েছিলাম, খুব চিন্তা হত’

‘ওর দেহরক্ষী হয়ে গিয়েছিলাম, খুব চিন্তা হত’

বি. চৌধুরীর সঙ্গে কেন বনিবনা হয়নি, জানালেন অলি

বি. চৌধুরীর সঙ্গে কেন বনিবনা হয়নি, জানালেন অলি

আসামিদের ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টের কার্যতালিকায়

রামিসা হত্যা মামলা আসামিদের ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টের কার্যতালিকায়

নতুন পে-স্কেলের প্রস্তাব চূড়ান্ত, শিগগিরই মন্ত্রিসভায়

নতুন পে-স্কেলের প্রস্তাব চূড়ান্ত, শিগগিরই মন্ত্রিসভায়

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App