ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত
চাপ বাড়াতে ট্রাম্পের ‘নতুন কৌশল’, ফের বুড়ো আঙুল দেখাবে কি ইরান
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে বাধ্য করতে সামরিক চাপের পাশাপাশি নতুন কৌশল হাতে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই কৌশলের অংশ হিসেবে তেহরানের ওপর আরো নজিরবিহীন অর্থনৈতিক অবরোধ ও কঠোর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি। তবে ইরানের ওপর যে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা হচ্ছে, তা মোকাবিলা করার সক্ষমতা তেহরানের রয়েছে বলে মনে করছেন কিছু ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক। তারা বলছেন, নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করলেই ইরান দ্রুত নতি স্বীকার করবে- এমনটা ধরে নেয়ার কারণ নেই।
উল্টো বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের অর্থনীতি আরো দুর্বল করার যে কৌশল যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছে, তার পেছনে দীর্ঘদিনের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত কমে আসার বিষয়টি ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর নাবিক ও সেনাদের মানসিক স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটেছে। তাদের মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নাবিকদের পরিবার ও সহকর্মীরা।
এনবিসি নিউজের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি সান ডিয়েগোতে ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর নাবিক ও সেনাদের পরিবারের সঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হাং কাওসহ অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে এক উত্তপ্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসময় ক্ষোভ উগরে দিয়ে এই উদ্বেগের কথা সরাসরি মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। সভায় উপস্থিত ছিলেন আনুমানিক ২০০ জন। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন সভায় উপস্থিত দুই নাবিকের স্ত্রী।
সভায় অংশ নেয়া এক নাবিকের স্ত্রীর ভাষ্য, সভার দিনই তিনি তার স্বামীর কাছ থেকে একটি বার্তা পান। অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে তিনি কর্মকর্তাদের জানান, তার স্বামী তাকে লিখেছেন যে ‘তিনি আশা করেন আগামীকাল যেন তার আর ঘুম না ভাঙে।’
ওই নারী আরো জানান, সভায় উপস্থিত নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই সুনির্দিষ্ট বা আবেগঘন বক্তব্যের কোনো সরাসরি জবাব দেননি। তবে জাহাজে থাকা নাবিকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী, চ্যাপলিন (ধর্মীয় শিক্ষক) এবং চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত সুবিধা রয়েছে বলে আশ্বস্ত করেন তারা। একই সঙ্গে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে যুদ্ধজাহাজটিতে আরো বেশি মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ
পাঠানোর কাজ চলছে বলেও জানান নৌবাহিনীর সেই কর্মকর্তারা।
এমন পরিস্থিতিতে এটা স্পষ্ট বার্তা- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রে অবস্থান করায় তীব্র মানসিক চাপ ও মানবিক সংকটের মুখে পড়েছেন মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এর প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও সেনাসদস্য। অস্বাভাবিক ও অত্যন্ত কঠিন এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তারা। মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের অধীন তারা ৪০ দিন ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধাভিযানে অংশ নিয়েছেন। সব মিলিয়ে সমুদ্রে টানা ২৫০ দিন পার করার এক নজিরবিহীন ধকল সামলাচ্ছেন এই নাবিক ও সেনাসদস্যরা।
দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের কারণে জাহাজে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির রেশনিং, নষ্ট টয়লেট এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা। চরম হতাশা ও মানসিক অবসাদের কারণে কিছু নাবিক জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে আত্মহত্যার খবরের বিষয়টি অস্বীকার করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবি করেছে মার্কিন সামরিক নেতৃত্ব ও সেন্ট্রাল কমান্ড।
এছাড়া হরমুজে সরাসরি বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়ে জলপথ পুরোপুরি খুলে দেয়ার চেষ্টা করলে ইরানের পাল্টা হামলা এবং আঞ্চলিক সংঘাত আরো বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব কারণে ওয়াশিংটনের কৌশলে অর্থনৈতিক চাপের গুরুত্ব বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের মাধ্যমে ইরানের তেল আয় কমিয়ে দেয়া গেলে সামরিক সংঘাতে না গিয়েও তেহরানের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানো সম্ভব- এটাই সম্ভবত মার্কিন কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেয়াকে ব্রহ্মাস্ত্র মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র।
এমন আবহে ইরানের বিরুদ্ধে জয়ী হওয়ার বিষয়ে শতভাগ আত্মবিশ্বাসী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত শুক্রবার নিউইয়র্কে এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘ইরানকে খুব বাজেভাবে পরাজিত করা হচ্ছে। ইরানকে পুরোপুরি পরাজিত করার পর শিগগিরই আমি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হিসেবে ঘোষণা করব।’ এরপর তিনি আরো বলেন, ‘এটা সত্য।’
পরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ট্রাম্প মজা করে এ কথা বলেছেন।’ এক প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
অপরদিকে ট্রাম্পের এমন বক্তব্যে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে ইরান। এ বিষয়ে গতকাল শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি লিখেছেন, ‘হরমুজ প্রণালি ইরানের ছিল, ইরানের আছে এবং ইরানেরই থাকবে। ইরানের নির্দেশেই শুধু এ প্রণালি বন্ধ হবে বা খুলবে।’
মূলত বর্তমানে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হরমুজ প্রণালির দখল নিয়ে তীব্র সংঘাত চলছে। ইরান চাইছে এই প্রণালি থেকে টোল আদায় করতে। আর যুক্তরাষ্ট্র চাইছে প্রণালিটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে। ফলে ইরান কার্যত হরমুজ বন্ধ করে রেখেছে। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরান বন্দরকে কেন্দ্র করে অবরোধ জারি করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে সংযোগকারী হরমুজ জলপথ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। বর্তমানে হরমুজে অচলাবস্থার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। এই ভৌগোলিক সুবিধাকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৌশলগত চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান। অন্যদিকে লোহিত সাগরে মিত্র হুতি বিদ্রোহীদের উসকে দিয়েছে ইরান। এর ফলে এই রুটে সৌদি আরবের জাহাজ চলাচলের সময় হামলার শিকার হচ্ছে। এ কারণে এই রুটেও সার্বিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিঘœ ঘটছে।
আল-জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের ন্যাশনাল সিকিউরিটি রিফর্ম প্রোগ্রামের পরিচালক ড্যান গ্রেজিয়ার বলেছেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানের ওপর যে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা হচ্ছে, তা মোকাবিলা করার সক্ষমতা তেহরানের রয়েছে। উল্টো এই প্রণালিতে তেহরান চাপ সৃষ্টি করে রেখেছে।
গ্রেজিয়ার বলেছেন, ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। কয়েক দশক ধরে নানা ধরনের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করার অভিজ্ঞতা দেশটির রয়েছে। ফলে নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করলেই পিছু হটবে ইরান, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই।
