ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ
চুক্তি শেষ, মধ্যপ্রাচ্যে আবারো জ্বলে উঠছে কি ‘যুদ্ধের আগুন’
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) মেয়াদ গত সোমবার শেষ হয়েছে। ইতোমধ্যে চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি না করার কথা বলেছে উভয়পক্ষ। এমন আবহে ইরানের ‘আত্মসমর্পণের সাদা পতাকা’ ওড়ানো উচিত বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর দাঁতভাঙা জবাব হিসেবে আরো কঠোর রণকৌশল হাতে রয়েছে বলে হুমকি দিয়েছে ইরান।
ফলে চলমান সংঘাত ও হরমুজ প্রণালি সংকট বর্তমানে একটি নতুন ও চরম অনিশ্চিত পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্য জ¦লে-পুড়ে ছারখার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এছাড়া জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্ববাজারে। গতকাল মঙ্গলবার অপরিশোধিত তেলের দাম আরো ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
মূলত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন, বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এ কারণে যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ১৭ জুন একটি সমঝোতা স্মারক সই করেন ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
সে সময়ে চুক্তিতে বলা হয়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ‘সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দেবে’। এতে আরো বলা হয়, একটি ‘চূড়ান্ত চুক্তি’ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান নিশ্চিত করবে।
আরও পড়ুন: ট্রাম্পের নতুন কৌশল, কিমের দখলে দক্ষিণ কোরিয়া?
ওই চুক্তি বা সমঝোতা স্মারকে আরো বলা হয়, একটি ‘চূড়ান্ত চুক্তি’ হলে সেটা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন পাবে। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে। তবে উভয় পক্ষের সম্মতিতে সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ বৃদ্ধি করা যেতে পারে। সমঝোতা স্মারকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো পরবর্তী সময়ে আলোচনার জন্য রেখে দেয়া হয়েছিল। চুক্তিতে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধের শর্তও রাখা হয়।
সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ৩০ দিনের মধ্যে ইরানি বন্দর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেয়ার কথা ছিল। আর ‘চূড়ান্ত চুক্তি’ সম্পন্ন হওয়ার পর ইরানের কাছাকাছি অবস্থানরত মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেয়া এবং ইরানের পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য অন্তত
৩০ হাজার কোটি ডলারের একটি প্যাকেজ নিয়ে কাজ শুরু করার কথা ছিল।
ওই সময় ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া এবং তেহরানকে বিদেশে তাদের জব্দ থাকা তহবিলে প্রবেশের সুযোগ দেয়ার বিষয়েও সম্মত হয়েছিল ওয়াশিংটন। অন্যদিকে ইরানের হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণ এবং ৬০ দিনের জন্য জাহাজগুলোকে ‘কোনো ধরনের ফি ছাড়াই’ চলাচলের সুযোগ দেয়ার কথা ছিল।
এছাড়া তেহরান আবারো নিশ্চিত করে বলেছিল, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করবে না এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবে। এসব বিষয়ের বিস্তারিত ‘চূড়ান্ত চুক্তিতে’ নির্ধারণ করা হবে।
তবে চুক্তি সইয়ের কিছুদিন পর থেকে হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে দ্ব›েদ্ব জড়িয়ে পড়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উভয়পক্ষই। বাণিজ্যিক জাহাজকে কেন্দ্র করে হরমুজে লাগাতার হামলার ঘটনা ঘটে। ফের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে দুই দেশই। এ কারণে আলোর মুখ দেখেনি শান্তি আলোচনা। আর এর মধ্য দিয়েই গত সোমবার শেষ হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ।
এ বিষয়ে ইরানি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র তার সব প্রতিশ্রæতি ‘লঙ্ঘন ও স্থগিত’ করেছে। এর জবাবে তেহরানও ‘নিজেদের সব প্রতিশ্রæতি স্থগিত করেছে’।
আরও পড়ুন: মার্কিন-ইরান আলোচনায় বাধা দিলে ওমানে ‘বোমা হামলার’ হুমকি ট্রাম্পের
এমন পরিস্থিতিতে সোমবার ফোনে ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের উচিত আত্মসমর্পণের সাদা পতাকা উত্তোলন করা।’ এদিন হোয়াইট হাউসের ওভাল দপ্তরে ট্রাম্পকে বিবিসি নিউজ জিজ্ঞেস করে, তিনি যুদ্ধবিরতি চুক্তির সময়সীমা বাড়ানোর চেষ্টা করবেন কিনা, উত্তরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘না।’
যদিও তার প্রশাসন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে ব্যাকচ্যানেলে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করছে বলে দাবি করেন ট্রাম্প। এসময় আইআরজিসিকে ‘ভালে পোকার খেলোয়াড়’ যারা ‘মারা যাচ্ছে’ বলে বর্ণনা করেন তিনি।
সংঘাত শেষ করার জন্য কোনো তাড়া নেই জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার কোনো সময়সূচি নেই। আমার কোনো তাড়া নেই।’ ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রæথ সোশ্যালে লেখেন, ‘ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে- এটাই তার প্রশাসনের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য।’
অপরদিকে গত রবিবার রাতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াদোল্লাহ জাভানি জানান, দেশ রক্ষায় প্রয়োজনীয় যেকোনো পদক্ষেপ নিতে তার বাহিনী প্রস্তুত। তিনি বলেন, ‘শত্রæপক্ষই যুদ্ধ শুরু করেছে। আমাদের কর্মকাণ্ড এত দিন প্রতিরক্ষামূলক ছিল। এখন তা আক্রমণাত্মক রূপও নিতে পারে।’ কী ধরনের আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে, তা বিস্তারিত জানাননি জাভানি। তবে তিনি বলেন, প্রতিপক্ষকে ‘কৌশলগত চমক’-এর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
গত সপ্তাহে আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেছিলেন, ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানি নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন জায়গায় পাল্টা হামলা চালানো হতে পারে।
ইরানের কট্টরপন্থি রাজনীতিক ও সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযান চালালে জবাবে বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনায় স্থল অভিযান চালাতে পারে তেহরান। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ ধরনের অভিযান বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব এবং এর ঝুঁকি কতটা- তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
যদিও ইরানের এই আক্রমণাত্মক কৌশলের ইঙ্গিতের পেছনে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত সপ্তাহে তিনি আইআরজিসির কয়েকজন কর্মকর্তা ও তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও নিরাপত্তা পদে নিয়োগ দেন।
আইআরজিসির নতুন কমান্ডার-ইন-চিফ মেজর জেনারেল আহমাদ ওয়াহিদির দায়িত্ব গ্রহণের সময় খামেনি বলেন, শত্রæর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি শক্তিশালী আক্রমণাত্মক অভিযানের জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে।
ইরানের সঙ্গে ব্যাকচ্যানেলে যোগাযোগ হচ্ছে- ট্রাম্পের এমন দাবির প্রতিক্রিয়ায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহেববি সোমবার বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আইআরজিসির কর্মকর্তাদের কোনো ধরনের আলোচনা চলছে না। আর ট্রাম্পের এই মিথ্যা কেবল সেই বিভ্রম ও দুঃস্বপ্নের ফল, যা তিনি যুদ্ধে পরাজয় ও চরম হতাশার কারণে ভোগ করছেন।’
মোহেববি আরো বলেছেন, ‘ট্রাম্পের কল্পনা তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো সাহায্য করবে না। এসব বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সাময়িকভাবে বৈশ্বিক তেল ও জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। তার সামনে শুধু একটি পথই খোলা রয়েছে আর তা হলো, পরাজয় মেনে নেয়া ও ইরানের নির্ধারিত শর্ত বাস্তবায়ন করা।’
গত শনিবার টেলিগ্রামকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরুর বিষয়ে আমরাও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেইনি।’
এদিকে হরমুজ নিয়ে ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেছেন, ‘ওমান যদি (যুদ্ধ বন্ধের) পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে আমরা তাদের ওপর ব্যাপক বোমা হামলা চালাব।’ এর আগে গত মে মাসে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে অনানুষ্ঠানিকভাবে তিনি হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘সঠিক আচরণ’ না করলে ওমানকে ‘উড়িয়ে দেয়া’ হবে।
ট্রাম্পের এই হুমকি দেয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে ইরান জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে ওমানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে তারা। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, জাহাজ চলাচলের পথের একটি ‘মানচিত্র’ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। এখন বিস্তারিত চূড়ান্ত করার পর যৌথ বিবৃতি দেয়া হবে।
এর আগে গত শুক্রবার এক বক্তৃতায় ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড’ ঘোষণা করার হুমকি দেন। এর তীব্র নিন্দা ও পাল্টা হুমকি দিয়ে ইরান বলেছে, হরমুজ দখলের চেষ্টা করলে ট্রাম্পের ‘পা ভেঙে দেয়া’ হবে।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান আঞ্চলিক সংঘাত নিরসনে চুক্তি হওয়ার সুযোগ ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার ভোর ৬টা ৩ মিনিটের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলে ২৭ সেন্ট বা ০.৩ শতাংশ বেড়ে ৯১.১৪ ডলারে গিয়ে পৌঁছায়। গত অধিবেশনে এই তেলের দাম জুলাইয়ের শেষভাগের পর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে।
অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ব্যারেলে ৪২ সেন্ট বেড়ে বিক্রি হয় ৮৫.০৪ ডলারে। অধিবেশনের শুরুর দিকে এর দাম ১ শতাংশের বেশি বেড়ে সর্বোচ্চ ৮৫.৩৭ ডলারে স্পর্শ করে। আল-জাজিরার প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। এই বৈরী পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এমন স্পষ্ট ও কড়া বার্তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অনড় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিকে আরো স্পর্শকাতর করে তুলতে পারে।
