×

প্রথম পাতা

ইরানে নতুন সংকট

রাজপথে খোলা চুলে নারীরা, কট্টরপন্থিদের চাপে সরকার

Icon

মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রাজপথে খোলা চুলে নারীরা, কট্টরপন্থিদের চাপে সরকার

ছবি: সংগৃহীত

ইরান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার অর্থনৈতিক সংকট এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। এই জটিল পরিস্থিতিতে দেশটির অনেক নারী বাধ্যতামূলক হিজাব আইন অমান্য করে প্রকাশ্যে খোলা চুলে চলাফেরা করছেন। এ বিষয়ে কট্টরপন্থিরা কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানালেও, বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এড়াতে বিষয়টি নিয়ে আপাতত কিছুটা সতর্ক ও নমনীয় অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করছে সরকার।

এমন আবহে বাধ্যতামূলকভাবে মানুষের আচরণ পরিবর্তন করা সম্ভব কিনা, সেই প্রশ্ন তুলেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও। নিজের মেয়ের সঙ্গে মতবিরোধের প্রসঙ্গ তুলে তিনি প্রশ্ন করেছেন, এর অর্থ কি তাকে জোর করে পরিবর্তন করতে হবে? ইরানের প্রেসিডেন্টের ভাষ্য, আচরণের পরিবর্তন একটি সাংস্কৃতিক বিষয় এবং এটি বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। শক্তি প্রয়োগ করে মানুষের মনে বিশ্বাস তৈরি করা যায় না।

ইরানের সাবেক সংসদ সদস্য গোলামআলী জাফরজাদেহ ইমানাবাদী বলেন, কর্মকর্তাদের বরং মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার দিকে নজর দেয়া উচিত। যুদ্ধের সময়ে এই যুক্তির গুরুত্ব অনেক বেশি। ইরান একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের অর্থনৈতিক পরিণতি সামলাচ্ছে। অন্যদিকে এই যুদ্ধকে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করছে। নিজ দেশে নারীদের বিরুদ্ধে নতুন আরেকটি ফ্রন্ট খুলে বসার স্পষ্ট ঝুঁকি রয়েছে।

মূলত চলতি বছর যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক চাপে জর্জরিত থাকায় ইরানে হিজাবহীন নারীদের উপস্থিতি ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এখন প্রকাশ্য রাজপথে হিজাব পরার নিয়ম ব্যাপকভাবে উপেক্ষা করছেন দেশটির নারীরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভিডিওতে দেখা যায়, তরুণীরা হেলমেট পরে থাকলেও মাথায় স্কার্ফ ছাড়া স্কুটার চালিয়ে তেহরান ও অন্যান্য শহর পাড়ি দিচ্ছেন।

আরও পড়ুন: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রীরা হিজাব পরতে পারবে না

তেহরানের ষাটোর্ধ্ব এক নারী সিএনএনকে বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ এখনো নারীদের সরাসরি মুখোমুখি হতে দ্বিধাগ্রস্ত বলে মনে হচ্ছে। তারা এখন রাস্তার মানুষকে কিছু বলার সাহস পায় না। তেহরানের মেয়েরা ক্রপ টপ, শটস এবং সব ধরনের পোশাক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর মাথার স্কার্ফ কার্যত অতীত হয়ে গেছে। আমি মনে করি

না তারা এই মেয়েদের দিয়ে আবার মাথায় স্কার্ফ পরাতে পারবে।’ আরেকটি ভিডিওতে জাতীয় পতাকা হাতে এক হিজাবহীন

নারীকে বলতে শোনা যায়, তার স্বামী সেনাবাহিনীতে কর্মরত এবং স্বামীকে নিয়ে গর্বিত তিনি।

ইতিহাস বলছে, ইরানে নারীদের জন্য ইসলামি পোশাকের বিধান চালু হয় ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর। পরবর্তী সময়ে কর্মক্ষেত্র ও সরকারি স্থানে বাধ্যতামূলক হিজাব কার্যকর করা হয়। তখন নির্ধারিত পোশাক না মেনে জনসমক্ষে আসা নারীদের আইনের আওতায় শাস্তির মুখে পড়তে হতো। পরবর্তী সময়ে নারীদের পোশাকের নিয়ম বাস্তবায়নে নীতি পুলিশ বা গাইডেন্স প্যাট্রল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ওই সময় থেকে হিজাব যথাযথভাবে না পরার অভিযোগে নারীদের থামানো ও আটক করা হয়।

২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তেহরানে হিজাব যথাযথভাবে না পরার অভিযোগে ২২ বছর বয়সী কুর্দি ইরানি নারী মাহসা আমিনিকে আটক করে নীতি পুলিশ। তিন দিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর পুলিশি হেফাজতে তার মৃত্যু হয়। ইরানি কর্তৃপক্ষ তার মৃত্যুকে স্বাভাবিক কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেও জাতিসংঘের তদন্তে বলা হয়, বেআইনি বল প্রয়োগের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। আমিনির মৃত্যুর পর ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে নারী, জীবন, স্বাধীনতা আন্দোলন। বিক্ষোভের সময় বহু নারী মাথার স্কার্ফ খুলে ফেলেন, কেউ কেউ তা পুড়িয়ে দেন এবং চুল কেটে প্রতিবাদ জানান।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির এক প্রতিবেদনে বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনীর অপ্রয়োজনীয় ও প্রাণঘাতী বল প্রয়োগে অন্তত ৬৮ শিশুসহ ৫৫০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হন। এসময় হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়।

২০২৪ সালে হিজাব আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আরো কঠোর শাস্তি ও নজরদারির বিধান রেখে একটি আইন অনুমোদন করা হলেও সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপে সেটির বাস্তবায়ন স্থগিত করা হয়।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ‘প্রকাশ্য নগ্নতার’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছেন রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতা এবং রাজনীতিকরা। একই সঙ্গে পোশাকের নিয়ম মানতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্যাফে ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন: মক্কা চুক্তি কি ইসরাইল ও মার্কিন স্বার্থ রক্ষার নতুন কৌশল?

মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, বাধ্যতামূলক হিজাব আইন না মানায় চলতি বছরের ১৯ জুলাই তেহরানে অন্তত সাতটি ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেয়া হয়। দক্ষিণ খোরসান প্রদেশেও সামাজিক আদর্শ ও বাধ্যতামূলক হিজাব বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ১০টি ক্যাফে বন্ধ করার খবর পাওয়া গেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তীব্র সংঘাতে ব্যস্ত রয়েছে ইরান। এমন জটিল এক সময়ে দেশের অভ্যন্তরে নারীদের হিজাব পরা না পরার দীর্ঘস্থায়ী ও নীরব সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে তেহরান। প্রকাশ্যে অনেক নারী হিজাব ছাড়াই চলাফেরা করলেও বড় ধরনের গণবিক্ষোভ এড়াতে সরাসরি কঠোর দমনপীড়ন থেকে কিছুটা বিরত থেকে এখন ক্যাফে ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে সরকার।

তবে ইরানের কট্টরপন্থিরা বিষয়টিকে আবারো অগ্রাধিকারের তালিকার শীর্ষের কাছাকাছি ফিরিয়ে আনতে চান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতা এবং রাজনীতিকরা ‘প্রকাশ্য নগ্নতার’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে পোশাকের নিয়ম মানতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্যাফে ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে।

সংসদ সদস্য মোহাম্মদ-তাকি নকদালি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আমাদের ধ্বংস করতে পারবে না। কিন্তু যে ক্ষয় আমাদের ধর্মীয় সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরেছে এবং সমাজে যেভাবে বিপর্যয়কর ও ব্যাপকভাবে নগ্নতা ছড়িয়ে দিচ্ছে, তা আমাদের ধ্বংস করে দেবে।’

উল্লেখ্য, ইরানে হিজাব আইন কঠোরভাবে কার্যকর করার বিষয়টি বর্তমানে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মুখে পড়েছে। যুদ্ধঝুঁকি, তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও ব্যাপক গণ-অসন্তোষের আশঙ্কায় দেশটির প্রশাসন ও নীতি পুলিশ সরাসরি রাস্তায় নেমে নারীদের বাধ্য করার ক্ষেত্রে সতর্ক ও কিছুটা পিছু হটা অবস্থান নিয়েছে। তবে ইরানের কট্টরপন্থিরা এ বিষয়টিকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে। তাই আপাতত তেহরান যেন পরখ করে দেখছে- ইরানের নারীদের আবারো রাজপথে না নামিয়ে কতদূর পর্যন্ত বলপ্রয়োগ করা যায়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

নতুন দায়িত্ব পেলেন শাহে আলম

নতুন দায়িত্ব পেলেন শাহে আলম

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে যা বললেন তথ্যমন্ত্রী

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে যা বললেন তথ্যমন্ত্রী

নতুন দায়িত্ব পেলেন ডা. জাহিদ

নতুন দায়িত্ব পেলেন ডা. জাহিদ

ট্রাম্পের ছেলের মাথার দাম ১ কোটি ডলার ঘোষণা করলো ইরান

ট্রাম্পের ছেলের মাথার দাম ১ কোটি ডলার ঘোষণা করলো ইরান

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App