×

প্রথম পাতা

সাগরে সলিলসমাধি

স্বপ্নের মৃত্যু পরিবার নিঃস্ব

Icon

হরলাল রায় সাগর

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

স্বপ্নের মৃত্যু পরিবার নিঃস্ব

ফাইল ছবি

পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা আনতে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে তরুণরা পাড়ি জমাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। কিন্তু এক শ্রেণির প্রতারক-দালাল চক্রের খপ্পড়ে পড়ে তাদের কেউ কেউ শুধু সর্বস্ব হারাচ্ছে না, জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিতে হচ্ছে। সাগরে সলিলসমাধি হচ্ছে করুণভাবে। পরিবার হচ্ছে নিঃস্ব। একদিকে ধারদেনা করে জোগান দেয়া টাকা শোধ করতে পারে না পরিবার। অন্যদিকে উপার্জনক্ষম স্বজনকে হারিয়ে সারা জীবন কাটে কান্নায়। সাম্প্রতিক বড় দুটি ঘটনা মানবতাকে নাড়িয়ে দিয়েছে চরমভাবে। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে নৌকা ডুবিতে মৃত্যু ঘটছে। আবার খাবার ও পানির অভাবে নৌকাতেই মারা গেছেন তরুণরা। পরে পচন ধরায় তাদের মৃতদেহ সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছেন সঙ্গীরা। শুধু সমুদ্রে ডুবে নয়, অনেক সময় বিদেশি পাঠানোর পর সন্তানকে খুঁজে পায় না পরিবার। মাদারীপুরের সাগর মিয়াকে ইতালি পাঠানোর পর ১০ মাস ধরে তার কোনো হদিস দিচ্ছে না দালাল। ছেলের শোকে পুরো পরিবার স্তব্ধ। কিন্তু এসব করুণ ঘটনার কোনো প্রতিকার মিলে না। নিঃস্ব পরিবার পায় না কোনো আর্থিক সহায়তা। পায় না দালাল-প্রতারকের বিচার।

নানা প্রলোভনে ফুসলিয়ে প্রতারক দালাল চক্র যুবকদের লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি বা গ্রিসে পাঠায়। অবৈধভাবে ইতালি বা গ্রিসে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রাকে দালালেরা গেম বলে। লিবিয়ার যেসব জায়গায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আটকে রাখা হয় এবং পরে নৌকায় তোলা হয় সেই জায়গাগুলোকে দালাল ও অভিবাসনপ্রত্যাশীরা গেম ঘর বলে। দেশি-বিদেশি এই প্রতারক চক্রের কাছে জীবনের চেয়ে টাকার মূল্যই প্রাধান্য পায়।

এসব স্রেফ দুর্ঘটনা নয়, দীর্ঘদিনের একটি চলমান সংকটের নির্মম প্রতিফলন। লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে অনাহার, পানিশূন্যতা ও ক্লান্তিতে মারা যাচ্ছে। এই ট্র্যাজেডিগুলো আমাদের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে। উন্নত জীবনের আশায় হাজারো মানুষ অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছে। দালাল চক্র তাদের মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে বিপজ্জনক সমুদ্রপথে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের কাছে মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই। লাভের জন্য তারা নির্দ্বিধায় মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।

এ সমস্যার পেছনে দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও কম দায়ী নয়। বেকারত্ব, সীমিত আয় এবং উন্নত জীবনের আকাক্সক্ষা অনেক তরুণকে ঝুঁকি নিতে বাধ্য করছে। বৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ সীমিত এবং জটিল হওয়ায় অনেকেই অবৈধ পথকে সহজ বিকল্প হিসেবে দেখে। ফলে তারা দালালদের ফাঁদে পড়ে। দেশের এক শ্রেণির রিক্রুটিং এজেন্সি স্বপ্ন দেখিয়ে জীবন সর্বনাশ করছে যুবকদের। কিন্তু তারা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

আরও পড়ুন: আমানত ফেরত পাচ্ছেন ৪ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকরা

শনিবার মাদারীপুর সদর উপজেলার খোঁয়াজপুর ইউনিয়নের পখিরা এলাকার বাসিন্দা বেলাতুননেছা বাড়িতে এক সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি অভিযোগ করেন, মাদারীপুর শহরের সৈদারবালীঠ মানবপাচার চক্রের সদস্য ও স্থানীয় দালাল নামজুল ব্যাপারীর প্রলোভনে পড়ে ইতালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ছেলে সাগর। পরে ২৩ লাখ টাকায় সাগরকে সরাসরি ইতালি পৌঁছে দেয়ার চুক্তি করে চক্রটি। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর তিন ভাগের এক ভাগ টাকা পরিশোধ করেন। একদিন পর ৩ নভেম্বর সাগরকে আকাশপথে সৌদি আরব নেয়া হয়। সেখানে দুদিন রেখে মিশর হয়ে লিবিয়া নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশি দালাল চক্র সাগরকে লিবিয়ার একটি বন্দিশালায় নিয়ে যায়। পরে সাগরের পরিবার থেকে চুক্তির পুরো ২৩ লাখ টাকা আদায় করে। টাকা পেয়ে ১৫ নভেম্বর রাতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পাঠানোর উদ্দেশ্যে সাগরকে লিবিয়ার উপকূল থেকে একটি নৌকায় তুলে দেয়া হয়। লিবিয়ার সন্ত্রাসীদের হাতে আটক হয়েছে দাবি করে তাদের কাছে সাগরের মুক্তির জন্য ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না পাওয়ার সাগরের ওপর চালানো হয় নির্যাতন। পরে বাংলাদেশি আরেক দালাল গোলাম মওলার (৪৮) মাধ্যমে সাগরের মুক্তির জন্য ৯ লাখ টাকা দেয় তার পরিবার। কিন্তু তারপর থেকে সাগরের কোনো সন্ধান দিচ্ছে না দালাল চক্রটি। বেলাতুননেছা বলেন, দালাল খালি আশা দিচ্ছে। ছেলেকে ফিরাইয়া দেয়ার কথা কইয়া দালালে ধাপে ধাপে ৩২ লাখ টাকা নিছে। জমিজমা সব শেষ, ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে পড়েছি। তারা (দালাল) এখনো কয় না আমার ছেলে নাই। কিন্তু আমার ছেলে আর নাই, এটা বুঝতে পারতাছি। বাঁইচা থাকলে ছেলে তো যোগাযোগ করত। তিনি আকুতি জানিয়ে বলেন, আমার বাঁচতে কষ্ট হচ্ছে। আমার ছেলেরে ওরা কী করেছে, সেটা জানতে চাই। আমার সোনারটুকরা বাবার সন্ধান চাই। ওই আমার ভরসা। তিনি বলেন দালালদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। কিন্তু গ্রেপ্তার হয়নি। উল্টো তাদের হুমকি দিচ্ছে দালালরা।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট লিবিয়া থেকে ৪২ জন যাত্রী লিবিয়া থেকে সাগর পথে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেন। তাদের মধ্যে ৩৮ জন বাংলাদেশি এবং চারজন সুদানের নাগরিক ছিলেন। ভূমধ্যসাগরে যাওয়ার পর নৌকাটির ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায় এবং জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। পরে প্রায় ১১ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর ১৩ আগস্ট তারা মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছায়। স্থানীয় লোকজন নৌকাটি দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। পরে প্রায় ২৯ থেকে ৩০ জনকে উদ্ধার করে দুটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উদ্ধার হওয়া অনেকেই তখন অচেতন ছিলেন। তারা বর্তমানে পুলিশের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কিন্তু তার আগেই ৯ বাংরাদেশিসহ ১১ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে। বেঁচে যাওয়া তরুণ আবদুল করিম দূতাবাসকে জানিয়েছেন, নৌকায় খাবার ও পানি না থাকায় এবং প্রচণ্ড গরমের মধ্যে অন্তত ১১ জন মারা যান। তাদের মধ্যে নয়জন বাংলাদেশি ছিলেন। লাশে পচন ধরায় গন্ধে টিকতে পারছিলেন না অন্যরা। পরে মরদেহগুলো সাগরে ফেলে দিতে হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিওতেও করিম জানিয়েছেন, লিবিয়ার তবরুক শহর থেকে প্লাস্টিকের একটি বোটে সর্বোচ্চ ২৫ জন যাত্রী বহনের সক্ষমতা থাকলেও ৪২ জনকে তোলা হয়েছিল। গ্রিসগামী তরুণকে দালালরা গেইম দেয়। নৌকাটিতে ছিল মাত্র একটি ইঞ্জিন। গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছার পর তাদের বোটের ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। অনেক চেষ্টা করেও ইঞ্জিন চালু হচ্ছিল না। একপর্যায়ে পাঁচ মিনিটের দমকা হাওয়া শুরু হয়। এসময় ঝাঁকুনিতে বোটের সকল খাবার-দাবার এবং খাবার পানি সাগরে পড়ে যায়। নষ্ট বোট ভাসতে ভাসতে নয় দিন পর মিশরের সীমানায় এসে ভিড়ে। দীর্ঘ সময় সাগরে থাকার কারণে বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের শারীরিক অবস্থাও গুরুতর বলে জানান করিম। তার ভাষ্য, লবণাক্ত পানিতে দীর্ঘ সময় থাকার কারণে তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশ পচতে শুরু করেছে।

আরও পড়ুন: ৫ ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য বড় সুখবর

এই আবদুল করিমের বাড়ি সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামে। তিনি মিশর দূতাবাসকে এসব তত্যও জানিয়েছেন। যারা জীবিত উদ্ধার হয়েছে তারা মিশরে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

শান্তিগঞ্জ উপজেলার অন্তত পাঁচ যুবকের এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। তারা হলেন- পাগলা শত্রæমর্দান গ্রামের হৃদয় পাল, চিকরকান্দি গ্রামের এনামুল খান, রিপন মিয়া ও মামুন খান এবং রানসি গ্রামের মো. তালহা।

এর চার মাস আগে মার্চ মাসেও ভূমধ্যসাগরে ১৮ বাংলাদেশির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গত ২১ মার্চ লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী তবরুক থেকে ছোট একটি নৌকায় ৩৮ বাংলাদেশিসহ ৪৩ জন অভিবাসীপ্রত্যাশীকে নিয়ে গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। কিন্তু খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাব, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দীর্ঘ সময় সমুদ্রে ভাসতে থাকে। একপর্যায়ে অনাহারে বাংলাদেশি ১৮ জনের মৃত্যু ঘটে। তাদের মধ্যে ১০ জনই সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে জীবিত উদ্ধার হওয়া একজন জানান, একটি ছোট নৌকায় তারা ৪৩ জন ছিলেন, যার মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। তাদের একটি বড় নৌকায় পাঠানোর কথা বলে শেষ মুহূর্তে ছোট নৌকায় তুলে দেয় পাচারকারীরা। যাত্রাপথে তাদের কোনো জিপিএস বা যোগাযোগের ডিভাইস দেয়া হয়নি। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে ভাসতে থাকায় অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরমধ্যে একপর্যায়ে মৃতদের লাশ সাগরে ছুড়ে ফেলা হয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

নতুন দায়িত্ব পেলেন শাহে আলম

নতুন দায়িত্ব পেলেন শাহে আলম

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে যা বললেন তথ্যমন্ত্রী

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে যা বললেন তথ্যমন্ত্রী

নতুন দায়িত্ব পেলেন ডা. জাহিদ

নতুন দায়িত্ব পেলেন ডা. জাহিদ

ট্রাম্পের ছেলের মাথার দাম ১ কোটি ডলার ঘোষণা করলো ইরান

ট্রাম্পের ছেলের মাথার দাম ১ কোটি ডলার ঘোষণা করলো ইরান

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App