মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চিপ শিল্পে স্বনির্ভরতার পথে চীন
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও চীন নিজস্ব প্রযুক্তির বিকাশ, দেশীয় যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং বিশাল রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে চিপ ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে স্বনির্ভরতার পথে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। সূত্র : রয়টার্স।
উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ইমার্শন ডিপ-আল্ট্রাভায়োলেট (ডিইউভি) লিথোগ্রাফি যন্ত্রের গণউৎপাদন শুরু করেছে চীন। মূলত এই প্রযুক্তি বিভিন্ন ধরনের চিপ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। যদিও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে উন্নতমানের এক্সট্রিম আল্ট্রাভায়োলেট লিথোগ্রাফি যন্ত্র কিনতে পারে না চীন। তাই এবার নিজেরাই সেই প্রযুক্তি উৎপাদন করতে যাচ্ছে দেশটি।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। এই পদক্ষেপকে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে বেইজিংয়ের বড় অগ্রগতি হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সূত্রটির দাবি, সাংহাইভিত্তিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সাংহাই আইশেংনা ইলেকট্রনিক টেকনোলজি গ্রুপ এই উৎপাদন কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি চীনের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি লিথোগ্রাফি স্টার্টআপের বিশেষজ্ঞ দলকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সংবেদনশীলতার কারণে সূত্রটি নিজের পরিচয় প্রকাশ করেনি।
এই অগ্রগতি চীনের সেমিকন্ডাক্টর খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের জাতীয় কর্মসূচির একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে ডাচ প্রতিষ্ঠান এএসএমএলের বাণিজ্যিক অবস্থানে তাৎক্ষণিক কোনো বড় প্রভাব পড়বে না।
ডিইউভি লিথোগ্রাফি প্রযুক্তির বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই আধিপত্য ধরে রেখেছে এএসএমএল। প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইনফরমেশন’ গত সোমবার প্রথম জানায়, সাংহাইয়ের একটি রাষ্ট্রীয় সমর্থিত প্রতিষ্ঠান এই যন্ত্রের উৎপাদন শুরু করেছে। চলতি বছরে প্রায় পাঁচটি এবং ২০২৭ সালে প্রায় ২০টি যন্ত্র উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। রয়টার্স প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠানটির পরিচয় প্রকাশ করেছে।
সূত্রটি জানায়, আইশেংনার তৈরি ডিইউভি যন্ত্র এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকে এটি এএসএমএলের সমমানের নয়। তবে ভবিষ্যতে পশ্চিমা দেশগুলো যদি লিথোগ্রাফি যন্ত্র বা রক্ষণাবেক্ষণ সেবার ওপর আরো কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে চীনের চিপ নির্মাতারা বিকল্প উৎস হিসেবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে।
‘দ্য ইনফরমেশন’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরই চীনের শীর্ষ চিপ নির্মাতা সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন, হুয়া হং সেমিকন্ডাক্টর এবং মেমোরি চিপ নির্মাতা চ্যাংসিন মেমোরি টেকনোলজিসের কাছে এই যন্ত্র সরবরাহ করা হবে।
ইমার্শন ডিইউভি প্রযুক্তিতে প্রজেকশন লেন্স ও সিলিকন ওয়েফারের মাঝখানে পানির একটি স্তর ব্যবহার করা হয়, যা প্রচলিত শুষ্ক পদ্ধতির তুলনায় আরো ক্ষুদ্র সার্কিট নকশা তৈরি করতে সক্ষম।
এই প্রযুক্তি বিভিন্ন ধরনের চিপ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। একই স্তরে বারবার আলোক প্রক্ষেপণের মাধ্যমে আরো উন্নতমানের সেমিকন্ডাক্টরও তৈরি করা সম্ভব। এএসএমএল, এসএমআইসি, হুয়া হং এবং চ্যাংসিন মেমোরি টেকনোলজিস এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক সাড়া দেয়নি।
‘দ্য ইনফরমেশন’-এর প্রতিবেদন প্রকাশের পর গত সোমবার এএসএমএলের শেয়ারের দাম ৮ শতাংশ কমে যায়। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৬ মিনিট পর্যন্ত শেয়ারটির দাম আরো ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে। যদিও একই সময়ে ইউরোপের অন্যান্য চিপ খাতের শেয়ারও নি¤œমুখী ছিল, তবু সামগ্রিক ইউরোপীয় শেয়ারবাজার সূচকের তুলনায় এএসএমএলের দরপতন বেশি ছিল।
২০২৩ সালের আগস্টে প্রায় ৭০০ কোটি ইউয়ান নিবন্ধিত মূলধন নিয়ে আইশেংনা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পেছনে রয়েছে দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগকারী সাংহাই ইলেকট্রিক হোল্ডিং এবং সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল ট্রাস্টের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে জনসমক্ষে খুব কম তথ্য রয়েছে। তাদের কোনো ওয়েবসাইট নেই এবং কার্যক্রম সম্পর্কেও কিছু প্রকাশ করা হয়নি। সূত্রটি জানায়, ডিইউভি প্রযুক্তির একটি প্রোটোটাইপ নিয়ে গত বছর পরীক্ষা চালানো ইউলিয়াংশেং এবং সাংহাই মাইক্রো ইলেকট্রনিক্স ইকুইপমেন্টের (এসএমইই) বিশেষজ্ঞদেরও আইশেংনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
এসএমইই এবং ইউলিয়াংশেং দুই প্রতিষ্ঠানই চীনের সেমিকন্ডাক্টর খাতে স্বনির্ভরতা কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইউলিয়াংশেং আবার হুয়াওয়ে-সমর্থিত যন্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সিক্যারিয়ারের সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানগুলোর করপোরেট ও নিয়োগসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, আইশেংনা ও ইউলিয়াংশেং একই ঠিকানা থেকে পরিচালিত হয়। আইশেংনা, এর বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, এসএমইই এবং ইউলিয়াংশেং কোনো পক্ষই রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে চীন এএসএমএলের সবচেয়ে উন্নত এক্সট্রিম আল্ট্রাভায়োলেট লিথোগ্রাফি যন্ত্র কিনতে পারে না। একই সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের ফলে উন্নতমানের কিছু ডিইউভি যন্ত্রের সরবরাহও সীমিত করা হয়েছে।
তবে এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এএসএমএলের জন্য চীন একটি বড় বাজার। চলতি বছরের প্রথমার্ধে প্রতিষ্ঠানটির মোট নিট বিক্রির প্রায় ১৬ শতাংশ এসেছে চীন থেকে। উন্নত ইইউভি যন্ত্র না পেলেও চীনের চিপ নির্মাতারা এখনো তুলনামূলক কম উন্নত ডিইউভি যন্ত্র ব্যাপকভাবে কিনছে।
গত ডিসেম্বরে রয়টার্স জানিয়েছিল, চীন নিজস্ব ইইউভি লিথোগ্রাফি যন্ত্রের একটি প্রোটোটাইপ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে এখনো কয়েক বছর সময় লাগবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আইশেংনার অগ্রগতি তাৎপর্যপূর্ণ হলেও স্বল্পমেয়াদে এএসএমএলের আয় বা বাজার অবস্থানে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে না। জেপি মরগান চেজের বিশ্লেষকেরা এক প্রতিবেদনে বলেন, কয়েকটি ইমার্শন ডিইউভি যন্ত্র তৈরি করা আর হাজার হাজার ওয়েফারে ধারাবাহিকভাবে উচ্চ উৎপাদন সক্ষম, নির্ভুল, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য যন্ত্র তৈরি করা এক বিষয় নয়।
