চার শিশুর একজন খর্বাকৃতির
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে ৫ বছরের কম বয়সী প্রায় প্রতি ৪ শিশুর একজন খর্বাকৃতির সমস্যায় ভুগছে। দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি ও শৈশবের শুরুতে দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে বয়স অনুযায়ী তাদের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জুলাইয়ে ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫’ শীর্ষক এক জরিপে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। ইউনিসেফের কারিগরি সহায়তায় করা এই জরিপটি দেশের ২৩ হাজারের বেশি শিশুর শারীরিক পরিমাপের ভিত্তিতে পরিচালনা করা হয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা সবচেয়ে ধনী পরিবারের শিশুদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। ৫ বছরের কম বয়সী ২৪ শতাংশ শিশু মাঝারি বা গুরুতর খর্বাকৃতির সমস্যায় রয়েছে। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মধ্যে খর্বাকৃতির হার ৩২ দশমিক ৩ শতাংশ। ধনী পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ১৬ দশমিক ১ শতাংশ। শহরের তুলনায় গ্রামের শিশুরা এ সমস্যায় বেশি আক্রান্ত। একই সঙ্গে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের মধ্যে খর্বাকৃতির হার কিছুটা বেশি।
গত তিন দশকে দেশে খর্বাকৃতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ১৯৯৭ সালে এই হার ছিল ৫৯ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৪ শতাংশে। তবে উন্নতি হলেও বাংলাদেশ এখনো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘উচ্চ প্রকোপ’ শ্রেণিতে রয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, কোনো দেশে খর্বাকৃতির হার ২০ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে হলে সেটিকে ‘উচ্চ’ এবং ৩০ শতাংশের বেশি হলে ‘অত্যন্ত উচ্চ’ প্রকোপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
২০১৯ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ‘অত্যন্ত উচ্চ’ প্রকোপের শ্রেণি থেকে বেরিয়ে আসে। ওই বছর এমআইসিএসের হিসাবে দেশে খর্বাকৃতির হার ছিল ২৮ শতাংশ। শিশুদের খর্বাকৃতির হারের দিক থেকে বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় এখনো পিছিয়ে বাংলাদেশ।
ইউনিসেফের ১৬৩টি দেশের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, খর্বাকৃতির হারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৯তম। অর্থাৎ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দেশেই এ হার বাংলাদেশের চেয়ে কম। তবে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভালো। আফগানিস্তানে খর্বাকৃতির হার ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ, পাকিস্তানে ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ভারতে ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় এ হার মাত্র ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। ভুটানে ১৭ দশমিক ৯ এবং মালদ্বীপে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ। ফলে এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে।
বয়স অনুযায়ী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ডের তুলনায় কোনো শিশুর উচ্চতা
উল্লেখযোগ্যভাবে কম হওয়াকে খর্বাকৃতি বলে। এটি দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির অন্যতম প্রধান নির্দেশক। বিশেষ করে জীবনের প্রথম এক হাজার দিনে পুষ্টির ঘাটতির প্রভাব এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শিশুর শারীরিক ও মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য এ সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা অনুযায়ী, খর্বাকৃতির শিশুরা অন্য শিশুদের তুলনায় দেরিতে স্কুলে ভর্তি, একই শ্রেণিতে একাধিকবার পড়া এবং কম শিক্ষা বয়সে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে বেশি থাকে।
এমআইসিএস ২০২৫-এর ফলাফলেও শিশুদের শিখন দক্ষতা নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। জরিপ অনুযায়ী, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী ১০ শিশুর মধ্যে ৬ জন বয়স-উপযোগী একটি সহজ গল্পের অন্তত ৯০ শতাংশ শব্দ সঠিকভাবে পড়তে পারে। বিপরীতে প্রাথমিক গণনাগত দক্ষতা দেখাতে পেরেছে মাত্র ৪০ শতাংশ শিশু।
শৈশবের খর্বাকৃতির প্রভাব প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও থেকে যায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে খর্বাকৃতিতে ভোগা ব্যক্তিরা অন্যদের তুলনায় গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ কম আয় করেন। তাদের দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসের সম্ভাবনা প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। দক্ষ কর্মসংস্থান পাওয়ার সম্ভাবনাও তুলনামূলকভাবে কম।
বাংলাদেশে প্রায় অর্ধেক নারী ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ে করেন। প্রতি চারজনের একজন কৈশোরেই অন্তঃসত্ত্বা হন। ফলে মা ও শিশু- উভয়েরই পুষ্টিজনিত ঝুঁকি বেড়ে যায়। এমআইসিএস ২০২৫-এর তথ্য বলছে, এক-তৃতীয়াংশ অন্তঃসত্ত্বা নারী প্রথম তিন মাস পার হওয়ার পর প্রসবপূর্ব স্বাস্থ্যসেবা নেয়া শুরু করেন। আর অর্ধেক নারী সুপারিশ করা ন্যূনতম চারটি স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান না। গর্ভকালীন পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি শিশুর জন্মের পর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জরিপে দেখা গেছে, ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী প্রায় ৩ শিশুর মধ্যে ২ জনই পুষ্টির চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত খাদ্যগোষ্ঠীর খাবার খায় না। অর্ধেকের বেশি শিশুকে প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ানো হয়। প্রতি ৫ শিশুর ১ জন চিনিযুক্ত পানীয় পান করে। আর এক-তৃতীয়াংশ শিশু কোনো ফল বা সবজি পায় না।
