উচ্চপর্যায়ের বৈঠক
তিন বিষয়ে নিউজিল্যান্ডের সমর্থন চেয়েছে বাংলাদেশ
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
নিউজিল্যান্ডে দেশটির পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরে গতকাল একটি উচ্চপর্যায়ের নীতি-নির্ধারণী সভায় অংশ নেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান -পিআইডি
বাংলাদেশ ৩টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিউজিল্যান্ডের সমর্থন কামনা করেছে। এইগুলোর মধ্যে রয়েছে- স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অতিরিক্ত ৩ বছর সময় বাড়ানো, চীনের নেতৃত্বাধীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুক্ত বাণিজ্য জোট রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) সদস্যপদ লাভ এবং নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনে সমর্থন।
বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরো গভীর ও বহুমাত্রিক করার লক্ষ্যে নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের (এমএফএটি) সদর দপ্তরে একটি উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী বৈঠকে এই সমর্থন চাওয়া হয়। এতে বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে ফরেন ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) উইংয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ছাড়াও ওয়েলিংটনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সেলর ইশতিয়াক আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। নিউজিল্যান্ডের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির ট্রেড নেগোসিয়েশনস অ্যান্ড পলিসি ডিভিশনের ডিভিশনাল ম্যানেজার সারা মেম্যান্ড ও ইউনিট ম্যানেজার জোনাস হোল্যান্ড।
বাংলাদেশ জানায়, আরসিইপি সদস্য পদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশ্নাবলির বিস্তারিত জবাব ইতোমধ্যে জমা দেয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কাঠামোকে আরসিইপি-এর উচ্চমানের বাণিজ্য শৃঙ্খলার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। এসব সংস্কারের মধ্যে রয়েছে- শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও উচ্চ প্রযুক্তির যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানোর উদ্যোগ, টেলিযোগাযোগ, আর্থিক সেবা ও লজিস্টিকস খাতকে আরো উন্মুক্ত করতে ‘পজিটিভ লিস্ট’ থেকে ‘নেগেটিভ লিস্ট’ পদ্ধতিতে রূপান্তর এবং প্রতিযোগিতা, পেটেন্ট, কপিরাইট ও ডেটা সুরক্ষা বিষয়ে আধুনিক আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন।
বৈঠকে আরসিইপি-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও গুরুত্বপূর্ণ সদস্য নিউজিল্যান্ডের কাছে সংবেদনশীল পণ্য ও শিল্প খাতের সুরক্ষায় আসিয়ানের এলডিসি সদস্যদের মতো ১৫ থেকে ২০ বছর মেয়াদি পর্যায়ক্রমিক শুল্ক নমনীয়তার সুযোগ দেয়ার প্রস্তাবও দেয়া হয়। এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়া ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি উন্নয়নশীল ও উত্তরণপ্রক্রিয়ায় থাকা অর্থনীতিগুলোর ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলনের পর বাংলাদেশের চলমান আর্থ-সামাজিক রূপান্তর, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীলকরণ এবং প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ ও
নিউজিল্যান্ডের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনের বিষয়টিও বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পায়। প্রস্তাবিত এফটিএ বাস্তবায়িত হলে নিউজিল্যান্ডের জন্য বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বিশাল ভোক্তা বাজারে দুগ্ধজাত পণ্য, কৃষি যন্ত্রপাতি ও ধাতব পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এলডিসি উত্তর সময়ে নিউজিল্যান্ডের বাজারে আরো স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদরদপ্তরে গতকাল মঙ্গলবার ও আজ বুধবার অনুষ্ঠেয় ইকোসকের সভায় বাংলাদেশের আবেদন পর্যালোচনা করে প্রস্তুতিকাল কতদিনের জন্য বাড়ানো যায়, তার সুপারিশ করা হবে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ সরকার গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণের আবেদন জানায়। গত ৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক চিঠিতে এ বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের ব্যক্তিগত সহযোগিতা চান। গত জুনে সিডিপি বাংলাদেশের উত্তরণ পেছানোর আবেদনকে সমর্থন জানালেও কতদিনের জন্য সময় বাড়ানো উচিত, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সুপারিশ করেনি। এমন প্রেক্ষাপটে ইকোসকের বৈঠক সামনে রেখে সরকার কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করে। গত শুক্রবার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ইকোসকের সভাপতি ও নেপালের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত লোক বাহাদুর থাপা এবং ইকোসকের সহসভাপতি ও আলজেরিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) প্রণীত কৌশলপত্র তুলে ধরেন। বাংলাদেশের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল সম্প্রতি জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর স্থায়ী মিশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে। এর আগে গত ২ জুলাই ঢাকায় কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এবং ৯ জুলাই নেপালের কাঠমান্ডুতে ইকোসকের সভাপতির সঙ্গে একই বিষয়ে আলোচনা হয়।
এসব বৈঠকে সরকারের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরে দেশি ও বৈশ্বিক নানা অভিঘাতের কারণে অর্থনীতি একাধিক সংকটের মুখে পড়ে। ফলে এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত ৫ বছরের প্রস্তুতিকাল পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘের নীতি হলো- উত্তরণের কারণে কোনো দেশের অর্জিত উন্নয়ন যেন ব্যাহত না হয়। কিন্তু গত ৪ বছরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতিতে উন্নয়ন অগ্রযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত।
সরকার আরো বলেছে, নতুন প্রশাসন একটি নাজুক অর্থনীতি পেয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ, রপ্তানি এবং রাজস্ব আদায়ের ধীরগতি কাটিয়ে উঠতে সময় প্রয়োজন। তাই ৩ বছর সময় বাড়ানোর আবেদন উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা নয়; বরং সুষ্ঠু, সুপরিকল্পিত ও টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই করা হয়েছে।
