×

খেলা

কাঠমিস্ত্রির ছেলের বিশ্বজয়

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কাঠমিস্ত্রির ছেলের বিশ্বজয়

ছবি: সংগৃহীত

মাত্র ২০০ মানুষের একটি ছোট্ট গ্রাম। নেই কোনো ফুটবল মাঠ, নেই স্কুল। এমনকি নেই ফার্মেসি বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রও। আছে হাতে গোনা কয়েকটি রাস্তা, পাথরের কিছু বাড়ি, একটি গির্জা, একটি কবরস্থান, দুটি বার আর একটি কাঠের কারখানা। সেই কারখানায় কাজ করেছেন পরিবারের কয়েক প্রজন্ম। গ্রীষ্মের ছুটিতে বাবার সঙ্গে সেখানেই কাজ করেছেন এক কিশোর।

সেই কিশোরই আজ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের অন্যতম সেরা ফুটবলার। মাত্র ১৯ বছর বয়সে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেই জিতেছেন আসরের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার। ফাইনালের শেষ মুহূর্তে তার দুর্দান্ত এক ট্যাকল রক্ষা করেছে দলের শিরোপার স্বপ্ন। তিনি স্পেনের সেন্টার-ব্যাক পাউ কুবারসি।

নিউজার্সিতে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ মুহূর্তে মার্কোস সেনেসির নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করে দেন কুবারসি। তার সেই ট্যাকলই হয়ে ওঠে স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। কাতার ২০২২-এর ফাইনালে রানদাল কোলো মুয়ানির শট ঠেকিয়ে এমিলিয়ানো মার্তিনেজ যেমন আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন, তেমনি কুবারসির সেই ট্যাকলও স্পেনের শিরোপাজয়ে সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

কুবারসির গল্প শুধু একটি ট্যাকলের গল্প নয়। এটি একটি ছোট্ট গ্রামের গল্প, কাঠমিস্ত্রি পরিবারের গল্প, আর প্রতিকূলতা পেরিয়ে বিশ্বফুটবলের শীর্ষে উঠে আসা এক তরুণের গল্প।

কুবারসির জন্ম জিরোনা প্রদেশের ছোট্ট গ্রাম এস্তানিওলে। নতুন ক্যাম্প ন্যু থেকে গাড়িতে সেখানে যেতে সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা। গ্রামটিতে বাস করেন ২০০ জনেরও কম মানুষ। প্রায় ১ হাজার ২৫০ মিটার ব্যাসের একটি আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ ঘিরেই গড়ে উঠেছে জনপদটি।

‘ফুস্তেরিয়া কুবারসি’ নামের কারখানাটি ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার প্রপিতামহ। বর্তমানে এটি পরিচালনা করেন কুবারসির বাবা রবার্ত। পেশাদার ফুটবলার হওয়ার আগে গ্রীষ্মের ছুটিতে বাবার সঙ্গে এই কারখানায় কাজও করেছেন তিনি।

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরও নিজের গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রেখেছেন কুবারসি। ভবিষ্যৎ জীবন নিয়েও তার ভাবনা পরিষ্কার। কাতালান দৈনিক লা ভানগুয়ার্দিয়াকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি চাই আমার সন্তানরা ছোট শহর বা গ্রামের পরিবেশেই বড় হোক। কারণ, আমি নিজেও গ্রামের মানুষ, শান্ত জীবনই বেশি পছন্দ করি।’

এস্তানিওলে কোনো স্কুল বা ফুটবল মাঠ না থাকায় পাশের শহরের ক্লাব এফসি ভিলাবলারেইক্সে ফুটবল শুরু করেন কুবারসি। অল্প সময়েই তার প্রতিভা নজরে পড়ে জিরোনার যুব একাডেমির। এরপর ২০১৮ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে তাকে দলে ভেড়ায় বার্সেলোনা।

ঠিকানা হয় লা মাসিয়া- বার্সেলোনার বিখ্যাত যুব একাডেমি। সেখানেই সতীর্থ হিসেবে পান লামিনে ইয়ামালকে। ২০২৩-২৪ মৌসুমে দুজনই বার্সেলোনার প্রথম দলের সঙ্গে যুক্ত হন। তবে অভিষেক আগে হয় কুবারসির। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে, ১৭তম জন্মদিনের কয়েক দিন আগে, কোপা দেল রের ম্যাচে ইউনিয়োনিস্তাস দে সালামাঙ্কার বিপক্ষে বার্সেলোনার জার্সিতে অভিষেক হয় তার।

২০২৪-২৫ মৌসুমে কোচ হান্সি ফ্লিকের অধীনে বার্সেলোনার প্রথম একাদশে নিজের জায়গা পাকা করে নেন কুবারসি। ১.৮৯ মিটার উচ্চতার এই ডান পায়ের সেন্টার-ব্যাক মৌসুমে খেলেন ৫৬টি ম্যাচ। জেতেন স্প্যানিশ সুপার কাপ, কোপা দেল রে ও লা লিগা। একই মৌসুমে আতলেতিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে কোপা দেল রেতে বার্সেলোনার হয়ে নিজের প্রথম গোলও করেন।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বার্সেলোনার সঙ্গে ২০২৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নতুন চুক্তি করেন তিনি। এরপর ক্লাবটির অন্যতম ভরসার খেলোয়াড় হিসেবেই ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলতে যান। ২০২৪ সালে স্পেনের ইউরো জয়ী দলে ছিলেন না কুবারসি। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের সঙ্গে আলোচনা করেই ইউরো না খেলে প্যারিস অলিম্পিকে খেলেন তিনি। সিদ্ধান্তটি সঠিক প্রমাণিত হয়। ফ্রান্সকে ৫-৩ গোলে হারিয়ে স্পেনের অলিম্পিক স্বর্ণজয়ী দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন কুবারসি। এরপর বিশ্বকাপে এসে আরো বড় সাফল্য। মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জয় এবং আসরের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার- দুটিই এখন তার নামের পাশে।

লামিনে ইয়ামালের মতো কুবারসিরও শৈশবের একটি ছবি রয়েছে লিওনেল মেসির সঙ্গে। রোজারিওর এই মহাতারকাকে নিজের অন্যতম আদর্শ মানেন তিনি। কুবারসি বলেন, ‘মেসি অসাধারণ গুণসম্পন্ন একজন ফুটবলার। বার্সেলোনায় খেলার সময় থেকে বহু বছর ধরে তাকে দেখেছি, তাকে অনুসরণ করেছি।’

বিশ্বকাপ ফাইনালের পর মেসির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎও ছিল তার কাছে বিশেষ। কুবারসির ভাষায়, ‘তিনি যখন এসে আমাকে শুভেচ্ছা জানালেন, তখনই যেন বিশ্বাস হলো- হ্যাঁ, আমরা সত্যিই এখানে আছি। তার সঙ্গে একই মাঠে খেলতে পারাটা আমার জন্য বিশাল সৌভাগ্যের।’

কুবারসিকে কাছ থেকে চেনেন এমন মানুষেরা বলেন, বয়সের তুলনায় তার পরিণত চিন্তাভাবনা ও নেতৃত্বের গুণ অসাধারণ। নিয়মিত বই পড়েন তিনি। ভবিষ্যতে ব্যবসায় প্রশাসন নিয়েও পড়াশোনা করতে চান।

দৃঢ় ব্যক্তিত্বের কারণে বার্সেলোনায় অনেকেই তাকে ক্লাব কিংবদন্তি কার্লেস পুয়োলের উত্তরসূরি মনে করেন। দ্রুতগতির পাশাপাশি প্রতিপক্ষের আক্রমণ আগেভাগে বুঝে তা থামিয়ে দেয়ার দক্ষতাও অসাধারণ তার। ২০২৪ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগে মুখে একাধিক সেলাই নিয়েও খেলা চালিয়ে যাওয়ার ঘটনাই তার মানসিক দৃঢ়তার বড় প্রমাণ।

শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে কুবারসির পথচলা কেবল শুরু। ১৯ বছরেই বিশ্বকাপ জয়, অলিম্পিক স্বর্ণ, বার্সেলোনার হয়ে তিন শিরোপা ও বিশ্বকাপের সেরা তরুণের পুরস্কার- সব মিলিয়ে সামনে তার গল্প আরো বড় হওয়ার অপেক্ষায়। কাঠমিস্ত্রির সেই ছেলেটি হয়তো একদিন নিজের ছোট্ট গ্রামে ফিরবেন, তবে তার আগে বিশ্বফুটবলে আরো অনেক সোনালি অধ্যায় লেখার অপেক্ষায় আছেন পাউ কুবারসি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

উত্তরা প্রেসক্লাবের সভাপতি বদরুল, সম্পাদক ফারাহী ও সাংগঠনিক শিপার মাহমুদ

উত্তরা প্রেসক্লাবের সভাপতি বদরুল, সম্পাদক ফারাহী ও সাংগঠনিক শিপার মাহমুদ

মিরসরাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় যুবদল নেতার মৃত্যু

মিরসরাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় যুবদল নেতার মৃত্যু

লন্ডনে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সলিসিটরদের সৌজন্য সাক্ষাৎ

লন্ডনে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সলিসিটরদের সৌজন্য সাক্ষাৎ

বীর মুক্তিযোদ্ধা ইব্রাহীম আর নেই, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন

বীর মুক্তিযোদ্ধা ইব্রাহীম আর নেই, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App