বিশ্বকাপে ফেরার মিশনে ইতালিসহ ১০ দেশ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
দল বেড়েছে, ম্যাচের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু কপাল খোলেনি তাদের! প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশ নিয়ে বিশ্বকাপের আসর বসেছিল ঠিকই, কিন্তু সেই উৎসবে দর্শক হয়ে থাকতে হয়েছে নিয়মিত বিশ্বকাপে দাপিয়ে বেড়ানো বেশ কিছু দলকে। ইতালি থেকে ক্যামেরুন কিংবা চিলি- বিশ্বকাপের সমৃদ্ধ ইতিহাস থাকা একাধিক সাবেক চ্যাম্পিয়ন ও ফাইনালিস্টকে দেখতে হয়েছে দূর থেকে। এবার ২০৩০ বিশ্বকাপে ফেরার মিশনে নামতে হবে তাদের।
ইতালি : বিশ্বকাপে যৌথভাবে দ্বিতীয় সফল দল ইতালি। অথচ আজ্জুরিরা কাটাচ্ছে দীর্ঘ এক দুঃসময়। টানা তিনবার ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে’ খেলার যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ তারা। প্রথম ২০টি আসরের ১৮টিতে অংশ নেয়া দলটির জন্য এটি একেবারেই নজিরবিহীন এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।
চলতি বছরের বাছাইপর্বে নরওয়ের পেছনে থেকে শেষ করলেও প্লে-অফ পেরিয়ে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিল ইতালি। কিন্তু প্লে-অফের ফাইনালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার কাছে পেনাল্টি শ্যুট-আউটে হেরে আবারো স্বপ্নভঙ্গ হয় জেন্নারো গাত্তুসোর দলের। ১৯৩৪ ও ১৯৯০ সালের আয়োজকরা ২০১৪ সালের পর আর বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারেনি। এবার সেরা তারকাদের নিয়ে নতুন দল গড়ার চ্যালেঞ্জ তাদের। গুঞ্জন আছে, ইতিহাসের অন্যতম সেরা পেপ গার্দিওলাকে দায়িত্ব দেয়ার কথাও ভাবছে ইতালির ফুটবল ফেডারেশন।
ডেনমার্ক : ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপে অভিষেকের পর থেকে নিয়মিত মুখ হয়ে ওঠে ডেনমার্ক। ছয়টি আসরে অংশ নেয়া দলটি ১৯৯৮ সালে উঠেছিল শেষ আটে। এবারো মূল পর্বের খুব কাছাকাছি গিয়েছিল তারা। ‘সি’ গ্রুপের শেষ ম্যাচে স্কটল্যান্ডের কাছে হেরে সরাসরি বিশ্বকাপে ওঠার সুযোগ হারানোর পর প্লে-অফে চেক প্রজাতন্ত্রের কাছে পেনাল্টিতে হেরে বিদায় নিতে হয়। কাতার ২০২২ সালে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর এই ব্যর্থতা ডেনিশদের জন্য আরো বড় ধাক্কা। তবে কোচ ব্রায়ান রিমার যদি তারকা-সমৃদ্ধ দলটি থেকে চাপের মুহূর্তে সেরাটা বের করে আনতে পারেন, তাহলে ২০৩০ বিশ্বকাপে ফেরার পথ সুগম হতে পারে।
পোল্যান্ড : পোল্যান্ড এ পর্যন্ত ৯ বার বিশ্বকাপে খেলেছে। ১৯৭৪ ও ১৯৮২ সালে দুবার তৃতীয় স্থান অর্জন করেছিল তারা। কাতার বিশ্বকাপে ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবার শেষ ১৬-তে উঠলেও এবার নেদারল্যান্ডসের পেছনে থেকে ‘জি’ গ্রুপে দ্বিতীয় হওয়ার পর প্লে-অফ ফাইনালে সুইডেনের কাছে ৩-২ গোলে হেরে যায়।
২০৩০ বিশ্বকাপের আগে নতুন করে দল সাজানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, অন্যতম সেরা তারকা রবার্ট লেভানডফস্কির ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় সামনে। তবে বয়সভিত্তিক দলগুলো থেকে উঠে আসা প্রতিভাবান নতুন প্রজন্ম পোল্যান্ডকে আশাবাদী করছে।
হাঙ্গেরি : বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দল হাঙ্গেরি। ৯টি আসরে অংশ নিয়ে দুবার ফাইনাল খেলেছে তারা। ১৯৩৮ ও ১৯৫৪ সালের রানার্সআপ দলটি সর্বশেষ বিশ্বকাপে খেলেছে ১৯৮৬ সালে। এই তালিকায় থাকা দলগুলোর মধ্যে বিশ্বমঞ্চ থেকে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাসনে আছে তারা। ২০২৬ বাছাইপর্বে প্লে-অফে ওঠার সম্ভাবনা থাকলেও শেষ ম্যাচে ঘরের মাঠে আয়ারল্যান্ডের কাছে নাটকীয় হারে স্বপ্নভঙ্গ হয়। তবে সা¤প্রতিক সময়ে মহাদেশীয় পর্যায়ে হাঙ্গেরির পারফরম্যান্স আশাব্যঞ্জক। ফেরেঙ্ক পুসকাসের দেশটি সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে ২০৩০ বিশ্বকাপে ফেরার স্বপ্ন দেখতেই পারে।
রোমানিয়া : রোমানিয়ার বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় ১৯৯৪। গিওর্গি হাগি, গিওর্গি পোপেস্কু ও ফ্লোরিন রাদুচিউদের সোনালি প্রজন্ম সেবার কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। এরপর অবশ্য বিশ্বকাপে তাদের উপস্থিতি কমেছে। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত পরের আসরের পর আর মাত্র একবার বিশ্বকাপে খেলেছে তারা।
২০২৬ বাছাইপর্বে গ্রুপে তৃতীয় হলেও ইউয়েফা নেশন্স লিগ রুটে প্লে-অফে সুযোগ পেয়েছিল রোমানিয়া। কিন্তু সেমিফাইনালে তুরস্কের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায়। কিংবদন্তি হাগি দ্বিতীয়বারের মতো দায়িত্ব নেয়ায় নতুন আশার আলো দেখছে দেশটি। তার নেতৃত্বে আক্রমণাত্মক শক্তি ও দলের গভীরতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে বিশ্বকাপে ফেরা সম্ভব।
নাইজেরিয়া : ছয়টি বিশ্বকাপের তিনটিতেই- ১৯৯৪, ১৯৯৮ ও ২০১৪ সালে শেষ ১৬-তে উঠেছিল নাইজেরিয়া। তবে শেষ দুটি আসরে অনুপস্থিত ছিল ‘সুপার ইগলরা’। ২০২৬ বাছাইপর্বে ‘সি’ গ্রুপে দক্ষিণ আফ্রিকার পেছনে থেকে রানার্স-আপ হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠে তারা। গ্যাবনকে ৪-১ গোলে হারালেও ভাগ্যনির্ধারণী ম্যাচে কঙ্গো ডিআরের বিপক্ষে ১-১ ড্র করে পেনাল্টি শ্যুট-আউটে হেরে যায়। নাইজেরিয়ার বিশাল প্রতিভার ভাণ্ডার এখনো আশাবাদী করে। তবে ২০৩০ বিশ্বকাপে ফিরতে হলে প্রতিভার পাশাপাশি শক্তিশালী কাঠামো ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্স নিশ্চিত করতে হবে।
ক্যামেরুন : আফ্রিকার অন্যতম অভিজ্ঞ দল ক্যামেরুন আটটি বিশ্বকাপে খেলেছে। ১৯৯০ সালে আফ্রিকার প্রথম দেশ হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়েছিল ‘অদম্য সিংহরা’। তবে এবার বাছাইপর্বে কেপ ভার্দের পেছনে থেকে দ্বিতীয় হয়ে প্লে-অফে ওঠে তারা। সেখানে কঙ্গো ডিআরের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায়।
২০১৮ বিশ্বকাপের ব্যর্থতার পর কাতার ২০২২-এ ফিরে এলেও এবার আবারো হতাশা। প্রতিভার অভাব না থাকলেও ধারাবাহিকতার সংকট কাটিয়ে ২০৩০ সালের শতবর্ষী বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করাই এখন তাদের লক্ষ্য।
চিলি : ১৯৬২ সালে ঘরের মাঠে তৃতীয় হয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে জায়গা করে নেয় চিলি। অ্যালেক্সিস সানচেজ, আরতুরো ভিদাল ও ক্লদিও ব্রাভোর সোনালি প্রজন্ম ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপে টানা শেষ ১৬-তে উঠেছিল। কিন্তু এরপর টানা তিন আসরে অনুপস্থিত তারা। সর্বশেষ কনমেবল বাছাইপর্বে ১৮ ম্যাচে মাত্র দুটি জয় নিয়ে সবার নিচে শেষ করেছে চিলি। ফলে ২০৩০ বিশ্বকাপের লক্ষ্যে তরুণদের সামনে আনার পাশাপাশি নতুন করে দল গড়াই হবে তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
পেরু : পাঁচবার বিশ্বকাপে অংশ নেয়া পেরু দুবার শীর্ষ আটে জায়গা করে নিয়েছিল। ১৯৭০ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল এবং ১৯৭৮ সালে দ্বিতীয় গ্রুপ পর্বে খেলেছিল তারা। ৩৬ বছরের বিরতি শেষে ২০১৮ বিশ্বকাপে ফিরলেও পরের দুই আসরে ব্যর্থ হয়েছে।
সর্বশেষ বাছাইপর্বে ১০ দলের মধ্যে নবম হয়ে মাত্র দুটি জয় ও ছয়টি গোল করতে পেরেছে পেরু। তাই ২০৩০ বিশ্বকাপের আগে আক্রমণভাগে বড় পরিবর্তন আনতে হবে। প্রবীণ তারকাদের বিদায় জানিয়ে নতুনদের সুযোগ দিলেও দলীয় সমন্বয় ও আঁটসাট রক্ষণ ধরে রাখাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
কোস্টারিকা : ১৯৯০ সালে বিশ্বকাপ অভিষেকেই চমক দেখানো কোস্টারিকা ২০১৪ সালে পৌঁছেছিল কোয়ার্টার ফাইনালে। সেবার উরুগুয়ে, ইতালি ও ইংল্যান্ডকে পেছনে ফেলে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর শেষ ১৬-তে গ্রিসকে হারিয়েছিল তারা। নেদারল্যান্ডসের কাছে পেনাল্টিতে হেরে থামে সেই স্বপ্নযাত্রা।
তবে এবার কনকাকাফ বাছাইপর্বে হন্ডুরাসের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে গ্রুপে তৃতীয় হওয়ায় বিশ্বকাপের পাশাপাশি আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফের সুযোগও হারিয়েছে তারা। এখন নতুন প্রজন্মকে সামনে রেখে নিজেদের আঞ্চলিক শক্তির মর্যাদা ধরে রাখাই লক্ষ্য কোস্টারিকার। সর্বশেষ সাত আসরের পাঁচটিতে বিশ্বমঞ্চে থাকা দলটি ২০৩০ সালে ফেরার লড়াইয়ে তাই নতুন করে প্রস্তুতি নেবে।
