যুক্তরাজ্যে ১০ বছরে ৬ প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৭:৫৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
অর্থনৈতিক স্থবিরতা, নীতি নিয়ে জনঅসন্তোষ, পরপর বেশ কয়েকটি উপ-নির্বাচনে দলের ভরাডুবি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তপ্ত সম্পর্কের জেরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক চাপের মুখে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।
সোমবার (২২ জুন) তার এই আকস্মিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে গত ১০ বছরের মধ্যে ষষ্ঠ কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। তার পদত্যাগের কারণে দেশটিকে এই অল্প সময়ের মধ্যে সপ্তম নেতা পাওয়ার দুয়ারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
ঠিক ১০ বছর আগে ২০১৬ সালে জুনে অনুষ্ঠিত ব্রেক্সিট (ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়া) গণভোটের পর থেকে যুক্তরাজ্য নিজের মতো করে পথ চলার চেষ্টা করছে, কিন্তু উচ্চ ঋণ, ধীরগতির অর্থনীতি, ক্রমবর্ধমান কল্যাণমূলক ব্যয় এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ক্রমাগত হিমশিম খেতে হচ্ছে দেশটিকে। এ পরিস্থিতির সর্বশেষ মূল্য দিতে হচ্ছে স্টারমারকে। গত ১০ বছরে ছয় জন প্রধানমন্ত্রীর পদ্যত্যাগের ধরাবাহিক ঘটনা নিচে তুলে ধরা হলো:
ব্রেক্সিট ধাক্কায় ডেভিড ক্যামেরনের পতন
২০১৬ সালের জুনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে ৫২ শতাংশ থেকে ৪৮ শতাংশ ভোটে রায় দেয় দেশটির জনগণ। ৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে থাকা এই ঐতিহাসিক জোটের অবসান এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটের দায় নিয়ে তৎকালীন কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগ করেন। তার বিদায়ের পর দল থেরেসা মে-কে নতুন নেতা নির্বাচিত করে।
২০১০ সালের মে মাসে তিনি প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করেন। পরে ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি আবারও দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ব্রেক্সিট কাণ্ডের পর পর তিনি ২০১৬ সালের ১৩ জুলা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
ব্রেক্সিট স্থবিরতার বলি থেরেসা মে
ক্যামেরনের পদত্যাগের পর যুক্তরাজ্যের ক্ষমতায় আসেন থেরেসা মে। এরপর ব্রেক্সিট আইন সহজে পাস করার জন্য এবং পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বাড়ানোর আশায় ২০১৭ সালের জুনে একটি আগাম নির্বাচন দেন থেরেসা মে। কিন্তু তার সেই পরিকল্পনা উল্টো ফল আনে এবং কনজারভেটিভরা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়।
পরে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির সঙ্গে চুক্তি করে সরকার গঠন করলেও শেষ পর্যন্ত ব্রেক্সিট নিয়ে পার্লামেন্টের অচলাবস্থা ভাঙতে ব্যর্থ হন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালের মে মাসে থেরেসা মে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
কেলেঙ্কারির অভিযোগ ও মন্ত্রীদের বিদ্রোহের শিকার বরিস জনসন
থেরেসা মে ক্ষমতা হারানোর পর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন বরিস জনসন। তিনি ছিলেন ব্রেক্সিট প্রচারণার প্রধান মুখ। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের আগাম নির্বাচনে ‘ব্রেক্সিট সম্পন্ন করো’ স্লোগানে মার্গারেট থ্যাচারের পর দলের সবচেয়ে বড় ভূমিধস জয় এনে দেন তিনি।
২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি তার নেতৃত্বে ব্রিটেন প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে ইইউ ত্যাগ করে। তবে কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ে নিজে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে যাওয়ার মতো সংকট সামাল দিলেও, পরে এক দীর্ঘ কেলেঙ্কারি ও ভুল পদক্ষেপের তালিকায় জর্জরিত হন জনসন। অবশেষে ২০২২ সালের জুলাইয়ে মন্ত্রিসভার বিদ্রোহের মুখে তিনি ক্ষমতা ছাড়েন।
লিজ ট্রাসের ৪৪ দিনের সংক্ষিপ্ত অধ্যায়
বরিস জনসনের বিদায়ের পর ঋষি সুনাককে হারিয়ে ক্ষমতায় আসেন লিজ ট্রাস। তবে দায়িত্ব নিয়ে তহবিলহীন কর কাটার বিতর্কিত ‘মিনি-বাজেট’ পেশ করেন তিনি। এতে আর্থিক বাজারে আতঙ্ক তৈরি হয় এবং দেশের ঋণের খরচ নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। আর্থিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ব্রিটেনের বৈশ্বিক সুনামকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে লিজ ট্রাস মাত্র ৪৪ দিন ক্ষমতায় থাকার পর সেপ্টেম্বর ২০২২-এ পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
টানা কয়েক মাসের বিশৃঙ্খলার পর ২০২২ সালের অক্টোবরে ব্রিটেনের বছরের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন ঋষি সুনাক। অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নসহ পাঁচটি মূল প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকারে স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা করেন তিনি।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইইউ-এর সঙ্গে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বাণিজ্য চুক্তি করে সম্পর্ক উন্নত করলেও জনমত জরিপে লেবার পার্টির চেয়ে ২০ পয়েন্টে পিছিয়ে পড়েন সুনাক। ফলস্বরূপ, ২০২৪ সালের মে মাসে তিনি ৪ জুলাইয়ের জন্য সাধারণ নির্বাচন ডাকেন এবং নির্বাচনে পরাজিত হয়ে বিদায় নেন।
দুই বছরের মাথায় বিদায় নিচ্ছেন কিয়ের স্টারমার
২০২৪ সালের জুলাইয়ে লেবার পার্টিকে ভূমিধস জয় এনে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হন কিয়ের স্টারমার। তবে আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে কম শতাংশ ভোট নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠন করা স্টারমার শুরুতে অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েন এবং দেশের অর্থনীতিকে ‘ব্ল্যাক হোল’ হিসেবে আখ্যা দেন।
২০২৪ সালের অক্টোবরের বাজেটে কর বৃদ্ধির ফলে ব্যবসায়ী মহলে ক্ষোভ তৈরি হয় এবং ২০২৫ সালের শুরুতে নাইজেল ফারাজের দল ‘রিফর্ম ইউকে’ জরিপে লেবার পার্টিকে টপকে যায়। এরপর কল্যাণমূলক বাজেট কাটছাঁট নিয়ে দলে বিদ্রোহ, রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসনের এপস্টাইন কেলেঙ্কারি এবং ২০২৬ সালের মে মাসে স্থানীয় নির্বাচনে দলের ভরাডুবি স্টারমারের অবস্থান নড়বড়ে করে দেয়। অবশেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলির পদত্যাগের পর সোমবার (২২ জুন) স্টারমার নিজেও পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
কিয়ের স্টারমারের এই বিদায়ের পর বর্তমানে ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।
কে এই অ্যান্ডি বার্নহ্যাম
৫৬ বছর বয়সী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম একজন সাধারণ টেলিকম প্রকৌশলীর সন্তান। কেমব্রিজে পড়াশোনা শেষে ২০০১ সালে প্রথম এমপি হন তিনি। টনি ব্লেয়ার ও গর্ডন ব্রাউনের আমলে স্বাস্থ্য সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
এর আগে ২০১০ ও ২০১৫ সালে লেবার পার্টির শীর্ষ পদের লড়াইয়ে দুবার হারলেও, ২০১৭ সালে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হয়ে তিনি নিজের পরিচয় বদলে দেন। মেয়র হিসেবে তিন মেয়াদে আঞ্চলিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ ও গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। বিশেষ করে করোনাকালে উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভাতার দাবিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সঙ্গে সরাসরি লড়াই করে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে ‘কিং অব দ্য নর্থ’ উপাধি পান।
ব্রেক্সিট আন্দোলনের নেতা নাইজেল ফারাজের কট্টর ডানপন্থী দল রিফর্ম ইউকে-কে রুখে দেওয়ার ক্ষেত্রে বার্নহ্যামকে একজন ‘রিফর্ম হন্তারক’ হিসেবে বিবেচনা করছে লেবার পার্টি। লন্ডনের বাইরে ও দেশের উত্তরাঞ্চলের যেসব ভোটার দল থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন, স্যুটের বদলে সাধারণ জিন্স-শার্ট পরা বার্নহ্যাম তাদের আবার ফিরিয়ে আনতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে সমালোচকদের মতে, বার্নহ্যামের বড় বড় আর্থিক প্রতিশ্রুতির বাজেট কোথা থেকে আসবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। আগামী জুলাইয়ে লেবার পার্টির নতুন নেতা নির্বাচনের মনোনয়ন শুরু হবে এবং এখন দেখার বিষয় অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নাকি ভোটের লড়াইয়ের মাধ্যমে ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের হাল ধরেন।
সূত্র: রয়টার্স, সিএনএ, বিবিসি
